যুক্ত হচ্ছে নতুন স্মারক

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারিতে সংরক্ষিত রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিজড়িত বিভিন্ন স্মারক। ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বীর গাড়ি আগেই সংরক্ষিত ছিল, নতুন যুক্ত হয়েছে তাঁর পোশাক, স্টেথোস্কোপ, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র। গত শনিবার দুপুরেছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বী যে গাড়িতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বহন করতেন, সেটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আগে থেকেই সংরক্ষিত ছিল। ফজলে রাব্বীর পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর ব্যবহৃত রক্তচাপ মাপার যন্ত্র স্টেথোস্কোপ, পোশাক, আলোকচিত্রসহ অন্যান্য স্মৃতিচিহ্নও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেগুলো স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’ গ্যালারিতে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গত এক বছরে তিনজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর ব্যবহৃত সামগ্রীসহ বেশ কিছু নতুন স্মারক যুক্ত হয়েছে। তবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি সংরক্ষণ যতটা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন ডা. ফজলে রাব্বী। তিনি ও তাঁর স্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিতেন। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর আলবদর সদস্যরা তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। রায়েরবাজারে আরও বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে নৃশংসভাবে ফজলে রাব্বীকে হত্যা করা হয়।

ফজলে রাব্বী তাঁর ‘ঢাকা গ-৩২২০’ নম্বরপ্লেটের গাড়িটি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা এবং ওষুধ সরবরাহে ব্যবহার করতেন। গাড়িটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরের পর ফজলে রাব্বীর বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন এই জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন তাঁর মেয়ে অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী শল্যচিকিৎসক আজহারুল হক গোপনে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন। আলবদর সদস্যরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর নটর ডেম কলেজের কাছে কালভার্টের নিচে আজহারুল হকের হাত, পা, চোখবাঁধা বিকৃত মরদেহ পাওয়া যায়। আজহারুল হকের পোশাক, তাঁর ব্যবহৃত মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য স্মারক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী সৈয়দা সালমা হক।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে স্থায়ী গ্যালারি চারটি। ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’, ‘আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ’, ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’, ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’—প্রতিটি গ্যালারির রয়েছে নিজস্ব চরিত্র।

নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল আগারগাঁওয়ে নতুন ভবনে যাত্রা শুরু হয় জাদুঘরের। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সেগুনবাগিচায় থাকতেও আজহারুল হকের কিছু স্মারক দিয়েছিলেন সালমা হক।

সালমা হক প্রথম আলোকে বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিগুলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকাই ভালো। যত দিন পৃথিবী থাকবে, তত দিন স্মৃতি থাকবে। তিনি বললেন, আজহারুল হকের আরও বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন তাঁর কাছে রয়েছে, সেগুলোও জাদুঘরে দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন ড. আমিনউদ্দিন। মুক্তিবাহিনীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমিনউদ্দিনের ব্যবহৃত হাতঘড়ি, পোশাক এবং অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া আমিন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারিতে সংরক্ষিত রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিজড়িত বিভিন্ন স্মারক। শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আমিন উদ্দিনের কিছু স্মারক আগেই সংরক্ষিত ছিল। তার পরিবারের পক্ষ থেকে আরও কিছু স্মারক জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত শনিবার দুপুরে
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে স্থায়ী গ্যালারি চারটি। ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’, ‘আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ’, ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’, ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’—প্রতিটি গ্যালারির রয়েছে নিজস্ব চরিত্র। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানাল, বাছাই করা নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ঘটনা ফুটে ওঠে। অন্যগুলো সংরক্ষিত থাকছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আর্কাইভে। করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ২৩ মার্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দর্শনার্থী প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। একই কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার স্মারক সংগ্রহ কম হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপক (কর্মসূচি) রফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁদের সংগ্রহে ২৫ হাজারের বেশি স্মারক রয়েছে। এর মধ্যে গ্যালারিতে প্রদর্শিত রয়েছে দেড় হাজারের বেশি। আর বাকি স্মারকগুলো জাদুঘরের আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম-৭১–এর সভাপতির দায়িত্বে আছেন শহীদ মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর। এখনই উদ্যোগ না নিলে অনেক শহীদের স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন আসিফ মুনীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করা হলে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।

গত এক বছরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আরও যেসব স্মারক সংগ্রহ করেছে, এর মধ্যে রয়েছে শহীদ শওকত আলীর আলোকচিত্র, নৌ কমান্ডার আবিয়ুর রহমানের মুভমেন্ট অর্ডার, লিম্পেট মাইন ও ফিনস জমা দেওয়ার রসিদ, অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে দায়িত্বরত হিসেবে মাসুদুর রহমান (ছদ্মনাম) নামে ইস্যুকৃত কমান্ডার আবুল হাসান মাসুদের পরিচয়পত্র, শেরপুরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল ইসলাম বুলবুলের ব্যবহৃত শার্ট।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী প্রথম আলোকে বলেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু স্মারক পাওয়া যায়, আবার জাদুঘরের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়েও স্মারক সংগ্রহ করা হয়। সারা বছরই শহীদদের স্মারক সংগ্রহের উদ্যোগ থাকে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মারকগুলো তাঁদের পরিবারের সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দিয়েছিলেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মারক সংগ্রহে আনুষ্ঠানিকভাবেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।