বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তেমনি ক্রীড়াঙ্গনে ২০২১ সালও স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলা কঠিন। করোনাভাইরাস মহামারিতে খেলাধুলার আদল পাল্টে যাওয়ার জন্যই শুধু এ বছরটা স্মৃতির পাতায় টিকে যেতে পারে। এর বাইরে লিওনেল মেসির ‘ঘর’ ছেড়ে প্যারিস-যাত্রা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ‘ঘরে’ ফেরা, আর্জেন্টিনার খরামোচন; ফুটবলের এসব ঘটনা লোকে মনে রাখবে। ফর্মুলা ওয়ানে শিরোপা নিষ্পত্তি করতে এবারের চেয়ে রোমাঞ্চকর বছর কবে দেখা গেছে, তা বের করতে গেলেও ঘেমে নেয়ে যেতে হবে। ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার হাতে প্রথম ‘বিশের বাঁশি’ও (বিশ্বকাপ ট্রফি) স্মরণীয়। কিংবা টম ব্রাডির ‘সুপারবোল’ জয়, ইউরো, কোভিড আক্রান্ত টোকিও অলিম্পিক, টেনিসে ‘জোকার’–এর দাপট…। সত্যিই, ২০২১ ভুলে যাওয়া কঠিন। বিদায়ের আগে স্মরণ করা যাক তার খণ্ড খণ্ড চুম্বকাংশ—

মেসি ‘ঘর’ ছেড়ে প্যারিসের মায়াপুরীতে

গত ৫ সেপ্টেম্বর চোখের জল মুছতে মুছতে লিওনেল মেসি যখন জানিয়ে দিলেন, ‘বার্সেলোনায় আর নয়’, তখনো অনেকের বিশ্বাস হয়নি। ২১ বছরের সম্পর্ক! মেসির কৈশোর, যৌবন…শ্রেষ্ঠত্বের আসন—সবই এই বার্সার হয়ে। তাই শুধু মেসির বার্সেলোনা ছাড়ার জন্যই ২০২১ সাল আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে। ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় এসে ৩৪ বছর বয়সে তাঁর প্রস্থানের পেছনে বার্সার আর্থিক হিসাব মেলাতে না পারার ব্যর্থতাই দায়ী। লা লিগার বেঁধে দেওয়া বেতনসীমার মধ্যে থেকে মেসিকে ধরে রাখতে পারেনি কাতালান ক্লাবটি। অথচ তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার কিছুদিন আগপর্যন্তও নতুন চুক্তির গুঞ্জন ছিল। শেষ পর্যন্ত বার্সার ইতিহাসে সেরা তো বটেই, ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা এ খেলোয়াড়কে বিদায় নিতে হয় চোখের জলে।

default-image

রোনালদো ফিরলেন ঘরে

রিয়াল মাদ্রিদে ক্যারিয়ারের সোনালি সময় কাটাতে পারেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কিন্তু মাদ্রিদের ক্লাবটি কখনোই তাঁর ‘ঘর’ ছিল না। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে পর্তুগিজ তারকার ঘর বলে যদি কিছু থেকে থাকে, সেটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—রোনালদোর বিশ্বসেরাদের কাতারে উঠে আসার পথে প্রথম ক্লাব। ইংলিশ ক্লাবটির প্রতি নিজের ভালোবাসা বহুবারই প্রকাশ করেছেন রোনালদো। জুভেন্টাস ছেড়ে গত সেপ্টেম্বরে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের ক্লাবটিতে ফেরেন তিনি। ৩৬ বছর বয়সী এই তারকার ক্যারিয়ারে ইউনাইটেডে প্রত্যবর্তনের এই গল্পের তাৎপর্যই আলাদা। যে ক্লাবের হয়ে বিশ্বসেরাদের কাতারে উঠে আসা, ক্যারিয়ার–সায়াহ্নে সেই ক্লাবে ফিরতে পারেন কজন? ফেরার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জার্সি বিক্রির অতীত রেকর্ড ভেঙে ফেলাও বলে দেয়, রোনালদো এখনো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এর বাইরে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে (ইউরো) এবং ছেলেদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েও বছরটা স্মরণীয় করে রাখেন রোনালদো।

default-image

ফর্মুলা ‘খ্যাপাটে’ ওয়ান

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। আবুধাবিতে বছরের শেষ গ্রাঁ প্রিটা জিতলেই ইতিহাস গড়তেন লুইস হ্যামিল্টন। মাইকেল শুমাখারকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার রেকর্ড গড়তেন ব্রিটিশ তারকা। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাকই যদি হবে, তবে ফর্মুলা ওয়ানকে এ বছর মানুষ আলাদা করে মনে রাখবে কেন! এক রেসার দুর্ঘটনায় পড়ায় সার্কিটে ঢুকে যায় সেফটি কার। এই সুযোগে নতুন চাকা বসে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী মাক্স ভেরস্টাপেনের গাড়িতে। সেফটি কার ঢোকার আগে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা হ্যামিল্টন শেষ ল্যাপের আগেও এগিয়ে ছিলেন ভেরস্টাপেনের চেয়ে। এরপর স্রেফ পাগলামি! নতুন চাকা ও নিয়মের ফাঁক গলে গতির ঝড় তুললেন ডাচ তারকা মাক্স ভেরস্টাপেন। অবিশ্বাস্যভাবে হ্যামিল্টনকে টপকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপও জিতে নেন তিনি। এরপর থেকেই লোকে বলাবলি করছে, হ্যামিল্টন এই হারে এতটাই মুষড়ে পড়েছেন যে ফর্মুলা ওয়ানের ট্র্যাকে তাঁকে আর কখনো না-ও দেখা যেতে পারে! সে যা-ই হোক, ফর্মুলা ওয়ানে শেষ কবে এমন রোমাঞ্চকর লড়াই দেখা গিয়েছিল, তা গবেষণার বিষয়। আর সে কারণেই ফর্মুলা ওয়ানে এ বছরটি খ্যাপাটে হয়েই থাকবে।

default-image

আটাশে এসে আর্জেন্টিনা

আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপা–খরা মোচনের গল্পটা শিরোনামেই পরিষ্কার। ১৯৯৩ সালে কোপা আমেরিকায় জয়ের পর মাঝেরই ২৮ বছরে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের তিন প্রজন্ম পার হয়েছে। ম্যারাডোনা-বাতিস্তুতা থেকে আইমার-স্যাভিওলা ও মাচেরানো-হিগুয়েনদের প্রজন্ম—কোনো প্রজন্মের হাত ধরেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাফল্য পায়নি আর্জেন্টিনা। হিগুয়েনদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন লিওনেল মেসিও। তাঁর নিজের জন্যও শাপমোচনের বছর হয়ে থাকবে ২০২১। জুলাইয়ে ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনাকে কোপা জিতিয়ে দেশের হয়ে শিরোপা জয়ের খরামোচন করেন মেসি, আর্জেন্টিনারও শিরোপা–খরার অবসান ঘটে। ২০২১ সালকে তাই আলাদা করেই মনে রাখবেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মাটিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদেরই ফাইনালে হারিয়ে শিরোপা ছিনিয়ে আনার আনন্দের কোনো তুলনা চলে!

‘জোকার’–এর হাসি

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও ফ্রেঞ্চ ওপেনের পর উইম্বলডন—বছরের প্রথম তিনটি গ্র্যান্ড স্লাম জিতেই রেকর্ডের পাতায় নাম লেখান নোভাক জোকোভিচ। উইম্বলডন জিতে সার্বিয়ান তারকা পেয়ে যান ২০তম গ্র্যান্ড স্লাম একক শিরোপা। তাতে গ্র্যান্ড স্লাম জয়ে রজার ফেদেরার ও রাফায়েল নাদালের মতো দুই কিংবদন্তির পাশেও বসেন জোকোভিচ। ‘জোকার’ নামে খ্যাত এই তারকার সামনে ছিল ক্যালেন্ডার গ্র্যান্ড স্লাম ও অলিম্পিকে সোনাসহ গোল্ডেন স্লাম জয়ের হাতছানি। কিন্তু সবকিছু তো আর চিত্রনাট্য মেনে হয় না। অলিম্পিক সেমিফাইনালে জার্মানির আলেক্সান্দার জভেরেভের কাছে হারে ভেঙে যায় গোল্ডেন স্লামের স্বপ্ন। সবচেয়ে বেশি গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের রেকর্ডও হয়নি। ইউএস ওপেনের ফাইনালে রাশিয়ার দানিল মেদভেদেভের কাছে হেরে অপেক্ষা আরও বেড়েছে তাঁর। জোকোভিচের দাপটের এ বছরে নাওমি ওসাকা ও এমা রাদুকানুও আলোচনায় উঠে আসেন। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ের চেয়েও ওসাকা বেশি আলোচনায় ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে না চেয়ে ও মানসিক অবসাদের কারণে সরে দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে রূপকথা লিখে ইউএস ওপেন জিতে নেন বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসা ১৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ খেলোয়াড় রাদুকানু।

default-image

করোনায় আক্রান্ত অলিম্পিক

এক বছর পিছিয়ে এ বছর শুরু হওয়া টোকিও অলিম্পিকে করোনার থাবা কাউকে চমকে না দিলেও বিস্ময় জাগিয়েছেন মার্চেল ইয়াকবস। অখ্যাত এই ইতালিয়ান স্প্রিন্টার জিতে নেন উসাইন বোল্টের ফেলে যাওয়া দ্রুততম মানবের খেতাব। মেয়েদের ১০০ মিটারের ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা সময়ে জিতে প্রয়াত ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ-জয়নারকেও মনে করিয়ে দেন টম্পসন-হেরা। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের অলিম্পিকে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দেন সিমোন বাইলস। যুক্তরাষ্ট্রের নারী জিমন্যাস্ট বড় কীর্তি গড়তে গিয়েছিলেন টোকিওতে। কিন্তু ‘টুইস্টিস’ নামে মানসিক সমস্যায় ভুগে শেষ মুহূর্তে বেশ কটি ইভেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন বাইলস।

ইউরোর রং ‘নীল’

ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও করোনায় এক বছর পিছিয়ে এ বছর জুনে শুরু হয়। তবে শুরুতেই ভর করেছিল বিষাদের নীল রং। ফিনল্যান্ড–ডেনমার্ক ম্যাচে মাঠেই হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন ডেনিশ তারকা ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন। অধিনায়ক সিমোন কায়ের এবং মেডিকেল দল তৎক্ষণাৎ মাঠে ঢুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছিলেন বলে রক্ষা! এরিকসেন পরে সুস্থ হলেও এখনো মাঠে ফিরতে পারেননি। তবে বিষাদের এই নীল রংকেই শেষে উৎসবে পরিণত করে ইতালি। ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ৫৩ বছর পর ইউরো শিরোপার সন্ধান পায় ‘আজ্জুরি’রা। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ৫৫ বছরের অপেক্ষা আরও বেড়েছে।

default-image

অস্ট্রেলিয়ার বিশের বাঁশি

ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন চলে না। দল যেমনই হোক, অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে ভাবতে হবেই প্রতিপক্ষকে। অথচ এই অস্ট্রেলিয়াই আগের ছয়টি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাত্তা পায়নি। জেতা হয়নি শিরোপা। এবার সেই খরা কেটেছে। দুবাইয়ের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতে অস্ট্রেলিয়া। শুধু এ কারণেই ২০২১–কে আলাদা করে মনে রাখতে পারেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সমর্থকেরা।

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন