প্রথম আলো অনলাইনে ম্যাচের শুরু থেকে প্রায় প্রতিটি বলের সরাসরি ধারাভাষ্য দেওয়ার দায়িত্ব ছিল কাঁধে। দায়িত্ব পালনে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাই রূপকথাটার প্রতিটি পর্ব, একেকবার একেক রং গায়ে মাখানো ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তের গল্পের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যাওয়ার সুযোগও হয়েছে। মোস্তাফিজ-শরিফুলদের বোলিংয়ে উইকেটের আনন্দ যেমন মনে ছুঁয়েছে, তামিম-লিটন-মুশফিক-সাকিবদের ব্যাটিংয়ে হতাশাও আঁচড় কেটেছে। কখনো হয়তো-বা এই ম্যাচ নিয়ে মাতামাতির যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন জেগেছে।

default-image

চোখধাঁধানো না হলেও আফিফ হোসেন আর মেহেদী হাসান মিরাজের মনজুড়ানো ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত যখন জিতে গেল, ম্যাচের প্রতিটি অধ্যায়ের মতো আবেগেও নানা বদল দেখা দিনের শেষে এখন মনে হচ্ছে, অভিজ্ঞতাটা মন্দ ছিল না!

ক্রিকইনফো জানাচ্ছিল, চট্টগ্রামের এই মাঠে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে আগে ব্যাটিং করা দলের গড় স্কোর ২৬৩। সে তুলনায় মোস্তাফিজ-শরীফুল-মিরাজরা আফগানিস্তানকে ২১৫ রানে আটকে দেওয়ার পর বাংলাদেশের জয় নিয়ে সংশয় খুব বেশি মানুষের ছিল না। কিন্তু নিঃসংশয় মনগুলো থেকে জয়ের সম্ভাবনাই উধাও হয়ে যেতে লাগল মাত্র পাঁচ ওভার! ফজল হক ফারুকি নামের এক অচেনা তরুণের সামনেই কুপোকাত তামিম-মুশফিকরা।

কিছুক্ষণ পর দলের স্কোর ৪৫ রানে যেতেই যখন মাহমুদউল্লাহ-সাকিবও ফিরে গেলেন, বাংলাদেশ আর জয় শব্দ দুটি তখন একই বাক্যে নেওয়াই মনে হচ্ছিল ‘অপরাধ।’ জয়? বাংলাদেশ ১০০ পার হতে পারবে কি না, সেই তখন বড় প্রশ্ন!

প্রথম আলো অনলাইনে সরাসরি ধারাভাষ্যে আগ্রহী পাঠকের ক্ষয়িষ্ণু সংখ্যা বলে দিচ্ছিল, এই ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের আশা নিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছেন এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরাও। মনে হচ্ছিল, এ ম্যাচে ধারাভাষ্য দেওয়ার আর কোনো অর্থ আছে!

বাংলাদেশের কোনো একটা বড় জুটি হতে হতেই কোনো একটা রানআউটে, একটা ভুলোমনের শটে বা একটুখানি অতিআগ্রাসনের জেরে সব ধুলায় মিশে গেছে...এমন উদাহরণ তো আর কম নেই!

এর মধ্যে দৃশ্যপটে আফিফ এলেন, সহজাত শট খেলতে লাগলেন। মিরাজ এসে তাঁকে সঙ্গ দিলেন। জুটিটা দাঁড়াতে লাগল। কিন্তু জয়ের কথা মুখে নিতে তখনো বাধছিল। কিসের জয়? পরের তিন ‘ব্যাটসম্যান’ শরীফুল, তাসকিন, মোস্তাফিজ মূলত বোলার, মিরাজ-আফিফের কোনো একজন আউট হলেই তো শেষ! বাংলাদেশের স্কোর ১০০ পেরোল, কিছুক্ষণ পর জয়ের সঙ্গে ব্যবধান ১০০-এর নিচে নামল, তবু জয় শব্দটা উচ্চারণ বাধো-বাধো লাগছিল।

লাগবে নাই–বা কেন! বাংলাদেশের কোনো একটা বড় জুটি হতে হতেই কোনো একটা রানআউটে, একটা ভুলোমনের শটে বা একটুখানি অতিআগ্রাসনের জেরে সব ধুলায় মিশে গেছে...এমন উদাহরণ তো আর কম নেই!

উদাহরণগুলোর অন্য পাশে আফিফ-মিরাজের জুটি এগোচ্ছিল। জুটিতে ১০০ হলো, দুজনের অর্ধশতক হলো। এর আগে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ৫১ রান করা মিরাজ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় রানের ইনিংস খেললেন, অষ্টম ম্যাচে গড়ানো ক্যারিয়ারে প্রথম অর্ধশতক পেলেন আফিফ। মনে আশার সঞ্চার হচ্ছিল, কিন্তু সেটির প্রকাশ ধারাভাষ্যেও করা যাচ্ছিল না। আশার উল্টো পিঠে যে শঙ্কাও ছিল। একটা বল আর একটা উইকেটেরই তো ব্যাপার! আশার কিছু বললে পরে না তা বুমেরাং হয়ে যায়!

ইনিংস ৪০ ওভারের দিকে যাচ্ছে। অবচেতনে কিংবা সচেতনে মন তখন শুধু হিসাব করে চলছে, রশিদের আর তিন ওভার আছে, ফারুকিরও তিনটি, মুজিবের দুই ওভার বাকি। নাহ, এখনো শঙ্কা আর সম্ভাবনা সমানে সমান। তবে হ্যাঁ, এখন সম্ভাবনার কথা একটু-আধটু বলা যায়। তবে শঙ্কাটা মনে রেখেই!  

default-image

প্রথম আলোর সরাসরি ধারাভাষ্যে পাঠকের সংখ্যাও তখন বাড়ছে। জয়ের ঘ্রাণ যে নাকে লাগতে শুরু করেছে!

এর মধ্যেও আফিফ আর মিরাজ যেভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আগ্রাসনের দায়িত্বটা নিচ্ছিলেন, নজর কেড়েছে সেটি। এর আগে আগ্রাসনের দায়িত্বটা পালন করে আসা আফিফ নিজের অর্ধশতকের পর মিরাজের হাতে ব্যাটনটা দিয়ে দিলেন। হয়তো শক্তি বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনাই ছিল। হতে পারে বোলারভিত্তিক রণপরিকল্পনাও। ৪০তম ওভারের আগে-পরের সময়টাতে মিরাজই যত বাউন্ডারি হাঁকালেন, আফিফ তখন এক-দুইয়ে খেলছেন। ৪৩-৪৪ ওভারের দিক থেকে আবার ব্যাটন আফিফের হাতে।

বাংলাদেশের ইনিংসে ২০০ রান পেরোনোর পরই বলতে গেলে বিশ্বাসটা পোক্ত হয়েছে যে নাহ, এখন বাংলাদেশের জয় নিয়ে জোর গলায় কথা বলা যায়। মিরাজ-আফিফের একজন আউট হয়ে গেলেও মোস্তাফিজ-তাসকিনদের নিয়ে অন্য একজন কাজটা শেষ করে দিয়ে আসতে পারবেন—এই বিশ্বাস তখন জোর পেয়েছে। জয় যে তখন ১৬ রান দূরে!

default-image

মোস্তাফিজদের নামারই দরকার হলো না। ৪৫ রানে ৬ উইকেট হারানো বাংলাদেশের ম্যাচ শেষেও উইকেটের ঘরে ৬-ই লেখা। রানের ঘরে ২১৬ দরকার ছিল, আফিফের চারে যখন ২১৯ হয়ে গেল, তখনো ৭ বল বাকি।

হয়তো ৪৫ রানে ৬ উইকেট পড়াতেই বাংলাদেশের জন্য ভালো হয়েছে। নাহ, ব্যাটিং নিয়ে প্রশ্ন যায়নি। তবে সেসবের উত্তর খোঁজার জন্য কোচরা আছেন, এখন তো জেমি সিডন্সও ফিরেছেন। তবে ৪৫ রানে ৬ উইকেট পড়েছে বলেই হয়তো আফগানিস্তানের বিপক্ষে এভাবে জয়টা মহাকাব্যের মর্যাদা পাচ্ছে।

না হলে ভাবুন তো, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২১৫ রান তাড়া করেই যদি বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জিতত, কিন্তু ৬ উইকেট পড়ত ১৭০-১৯০ রানে, কে এই জয় নিয়ে মাথা ঘামাত! বরং কেউ না কেউ অবশ্যই বলে বসতেন, আফগানিস্তানকে হারাতেও এত ঘাম ঝরাতে হয়!

‘পেনাল্টি’ বলে কথা!

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন