default-image

ফ্লিন্ডার্স স্ট্রিট স্টেশনটা যেখানে, সেটিকে বলতে পারেন মেলবোর্ন শহরের হৃৎপিণ্ড। পাশেই ইয়ারা নদীর ওপর ফুট ওভারব্রিজটা পেরিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই ল্যাংহাম হোটেল। কাল দুপুরে সেটির সামনে টেলিভিশন ক্যামেরার সারি। বুকে বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ঝোলানো আলোকচিত্রীদের ছোটাছুটি। সাংবাদিকদের জটলা।
দৃশ্যটায় কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। আগের রাতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে যেভাবে উড়িয়ে দিয়েছে ভারত, তাতে পরের দিন টিম হোটেলের সামনে ভারতীয় সাংবাদিকদের এমন ভিড় তো থাকবেই। এ আর নতুন কোনো ঘটনা নাকি! কিন্তু ভারতীয় দল যে বেলা সাড়ে ১১টায়ই হোটেল ছেড়ে গেছে। তাহলে ল্যাংহামের সামনে যাঁদের কথা বলা হলো, তাঁরা বাংলাদেশের সাংবাদিককুল।
বিশ্বকাপে দলগুলোর মিডিয়া ম্যানেজাররা আগামী কয়েক দিনের সূচি মেইল করে জানিয়ে দেন সাংবাদিকদের। কখন অনুশীলন, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কেউ কথা বলবেন কি না ইত্যাদি। এদিন বাংলাদেশের কোনো অনুশীলন নেই, সাংবাদিকদের সঙ্গে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথাও বলবেন না—এটাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার পরও সকাল থেকেই টিম হোটেলের সামনে সাংবাদিকদের ভিড়। আল আমিনকে বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে আগের দিন। কখন ফিরে যাবেন, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। এই দিনে বসে থাকলে চলে!
ছুটির দিন পেয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কেউ হোটেল থেকে বেরোচ্ছেন, কেউ ঢুকছেন। সবকিছুই মহাতৎপরতায় ক্যামেরাবন্দী হচ্ছে। যাঁর ছবি বা ফুটেজটা এদিন বেশি প্রার্থিত, সেই আল আমিনও একসময় বেরিয়ে এলেন তামিম ইকবাল ও রুবেল হোসেনের সঙ্গে। মেলবোর্নের এই এলাকাটা পর্যটকদের চারণভূমি। ইয়ারা নদীর তীর ধরে সারি সারি রেস্তোরাঁ। তারই কোনো একটাতে লাঞ্চ করতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ দলে তারকাখ্যাতির বিচারে আল আমিনের নামটা সেভাবে আসেই না। কিন্তু এদিন তাঁর দিকেই সব ক্যামেরা।
এর পর তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষা। সাংবাদিকদের পীড়াপীড়িতে সকালে অনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনমতো করতে হয়েছে ম্যানেজার খালেদ মাহমুদকে। তাতে অনুমিত কথাই বলেছেন। দুই দিন ধরে বহুল উচ্চারিত ‘টিম রুলস’ কথাটাই বারবার এল। যে প্রশ্নগুলো মাথা কুটে মরছে, সেসবের উত্তর পাওয়া গেল কই?

default-image

‘টিম কারফিউ’ ক্রিকেটে অনেক পুরোনো প্রথা, সেটি ভাঙাটাও নতুন কিছু নয়। সে জন্য কাউকে একেবারে বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে হবে? এর মধ্যে অন্য কিছু নেই তো? ক্যানবেরায় আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের (আকসু) কর্মকর্তারা আল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, ব্রিসবেনে ‘টিম রুলস’ ভেঙে রাতে হোটেলের বাইরে থাকার ঘটনাও ম্যানেজারকে তাঁরাই জানিয়েছেন। আকসু বা আইসিসির পরোক্ষ কোনো চাপ কি ছিল? আইসিসি কি এ ব্যাপারে কোনো বিবৃতি-টিবৃতি দেবে না?
প্রশ্নটা শুনে আইসিসির এক মুখপাত্র আকাশ থেকে পড়লেন, ‘প্রশ্নটাই তো অবান্তর। এটা বাংলাদেশ দল ও বোর্ডের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এখানে আইসিসির কোনো ভূমিকা নেই।’ আল আমিনকে আকসুর জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্পর্কে বললেন, ‘এটা তো আকসু যেকোনো খেলোয়াড়কেই করতে পারে। কিন্তু ওর বিরুদ্ধে কি কোনো অভিযোগ আনা হয়েছে? তেমন কিছু থাকলে তো ওকে আইসিসিই সাসপেন্ড করত।’
নানা সূত্রে জানা গেল, আকসুর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো জানাশোনা আছে, বাংলাদেশের এমন দু-একজন খেলোয়াড় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আল আমিনের ব্যাপারটা জানতে চেয়েছিলেন। আকসুর কর্মকর্তারা নাকি তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন, আল আমিনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। এটা জানার পর আল আমিনকে দেশে ফেরত না পাঠানোর জন্য বিসিবি পরিচালকদের আরও বেশি করে অনুনয়-বিনয় করেছেন দলের সিনিয়র খেলোয়াড়েরা। তা পুরো দলের প্রতিনিধি হয়েই। দলের সব খেলোয়াড়ই প্রয়োজনে বড় অঙ্কের জরিমানা করে আল আমিনকে আরেকটি সুযোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন।
খেলোয়াড়দের সেই চাওয়াকে বোর্ডের মূল্য না দেওয়ার পেছনে নানা কারণের কথা শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি তো অবশ্যই শৃঙ্খলাভঙ্গের ব্যাপারে যে কোনো ছাড় নেই, দলের অন্য খেলোয়াড়দের তা বুঝিয়ে দেওয়া। আবার কারও কারও ধারণা, ব্রিসবেনে এক দিন পরই ম্যাচ ছিল বলে আকসুর কর্মকর্তারা ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে আল আমিনের বাইরে যাওয়া নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। মেলবোর্নে অবশ্যই তা করত। তাতে দলে একটা অস্বস্তি তৈরি হতো। এ কারণে আল আমিনকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো।
আল আমিনের ঘটনার পর মনের কথা খুলে বলতে খেলোয়াড়েরা আরও ভয় পাবেন স্বাভাবিক। সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলেও প্রসঙ্গটা তাই তাঁরা এড়িয়েই যাচ্ছেন। তবে নানা সূত্রে দলের ভেতরের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে খেলোয়াড়েরা সবাই খুব ক্ষুব্ধ। তাঁদের মতে, আল আমিনকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেওয়া হয়েছে। আকসুর সঙ্গে কথা বলে আসলে ঘটনা কী, পরিচালকেরা তা জানতে চেয়েছেন কি না এই প্রশ্নও উঠছে। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার মনেও যদি সেই প্রশ্ন থাকে, খুবই স্বাভাবিক যে, প্রকাশ্যে তা বলবেন না। তবে ‘বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে সম্মান করতেই হবে। আমি যেমন সেটি সম্মান করি, আল আমিনেরও তা-ই করা উচিত। শৃঙ্খলা সবার আগে’—বলার পরও এতে যে দলে একটা অস্বস্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, সেটি তাঁকে স্বীকার করতেই হলো। ‘প্রথম দুই ম্যাচেই ৩ পয়েন্ট পেয়ে দলটা খুব ভালো একটা অবস্থায় ছিল। এমন একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর সেটি একটু বদলে যাওয়াই স্বাভাবিক’—বলে মাশরাফি সান্ত্বনা খুঁজছেন, ‘তাও ভালো যে, পরের ম্যাচটার আগে আমরা একটু সময় পেয়েছি।’
আল আমিনকে দলে নেওয়ায় মাশরাফির বড় ভূমিকা ছিল বলে শোনা যায়। তাঁর পরিকল্পনাতেও আল আমিন খুব ভালোভাবেই ছিলেন, ‘শ্রীলঙ্কা আর ইংল্যান্ড দলে অনেক বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। আল আমিন বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে খুব ভালো বোলিং করে। এই দুই ম্যাচে আল আমিনকে আমি একটা বড় অস্ত্র ধরে রেখেছিলাম।’
সেই ‘অস্ত্র’ হারিয়ে মাশরাফিকে তাই নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সুখের বাতাস বইতে থাকা দলে হঠাৎই হানা দেওয়া অশান্তি দূর করা।

আরও খবর: বিশ্বকাপ শেষ আল আমিনের

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0