default-image

চার ফাস্ট বোলারের ছবি ছাপা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান পত্রপত্রিকায়। একই ছবি। গত পরশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যে পোজ দিয়েছেন মিচেল জনসন, মিচেল স্টার্ক, জস হ্যাজলউড ও প্যাট কামিন্স। গ্যাবার পেস-স্বর্গে এমন চার ফাস্ট বোলারের বিপক্ষে কেমন করবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানেরা? ‘অগ্নিপরীক্ষা’ কথাটার এর চেয়ে ভালো ব্যবহার আর হয় না।
কাল বেলা ১১টার দিকে সোফিটেল হোটেলের লবিতে মাইকেল ক্লার্ককে একজনের সঙ্গে গভীর আলোচনায় মগ্ন দেখা গেল। মাঝবয়সী ভদ্রলোকের গায়েও অস্ট্রেলিয়ার জার্সি। কিছুক্ষণ পর চেয়ার ছেড়ে উঠে শরীর ঝুঁকিয়ে বল ছোড়ার ভঙ্গি করে দেখানোর সময় তাঁকে চেনা গেল। অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডিং কোচ মাইক ইয়াং। হ্যামস্ট্রিংয়ে অস্ত্রোপচারের পর ফেরার ম্যাচে ক্লার্কের আসল পরীক্ষাটা ফিল্ডিংয়েই। ইয়াং তো ওভারটাইম খাটবেনই।
চার ফাস্ট বোলার বনাম বাংলাদেশ, মাইকেল ক্লার্কের ফেরা—এই ম্যাচে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কথা ছিল এ দুটিই। সঙ্গে অবধারিত একটা প্রশ্ন—কী হবে এই ম্যাচে? সেই প্রশ্নটাই ঘূর্ণি খেতে খেতে বদলে যাচ্ছে—ম্যাচটা আদৌ হবে তো?
ঘূর্ণিঝড় মার্সিয়ায় কুইন্সল্যান্ডের উপকূলীয় অঞ্চল লন্ডভন্ড। টেলিভিশনে ধসে যাওয়া বাড়িঘর দেখাচ্ছে, প্লাবিত রাস্তায় ভেঙে পড়া গাছ। পরিস্থিতি এতই বিপর্যয়কর যে, কাল দুপুরে গ্যাবায় সংবাদ সম্মেলনে মাইকেল ক্লার্ক শুরুতে ক্রিকেটকে দূরেই সরিয়ে রাখলেন, ‘সত্যি বললে আমাদের দলের মূল ভাবনা এখন ভয়াবহ এই ঝড়। কুইন্সল্যান্ডের মানুষেরা সবাই সুস্থ থাকুক, নিরাপদ থাকুক। ক্রিকেটের কথা আমরা কাল ভাবব।’
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবেই দুদিন ধরে ব্রিসবেনে টানা বৃষ্টি। সন্ধ্যার পর সেই বৃষ্টি মাঝেমধ্যে বিরতি দিলেও আবহাওয়ার পূর্বাভাস শনিবার অর্থাৎ আজ সেটির সাড়ম্বরে ফিরে আসার ঘোষণা দিচ্ছে। তার পরও ব্রিসবেনে অতীত অভিজ্ঞতার দিকে তাকিয়ে মাইকেল ক্লার্কের আশায় বসতি, ‘এই গত অ্যাশেজের প্রথম টেস্টেই তো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, খেলা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। অথচ এক ঘণ্টার মধ্যেই তা শুরু হয়ে গেল।’

default-image

গ্যাবার আধুনিকতম নিষ্কাশনব্যবস্থায় ক্লার্কের আস্থার কোনো মূল্যই থাকছে না কিউরেটরের কথায়। কেভিন মিচেল পরিষ্কার বলে দিচ্ছেন, ‘আমি খেলা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই দেখছি না। আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস পাচ্ছি, তাতে আগামীকাল (শনিবার) মাঝরাতের আগে বৃষ্টি থামবে বলে মনে হচ্ছে না।’
তা-ই যদি সত্যি হয়, মাইকেল ক্লার্কের হতাশাটা অনুমান করাই যায়। এই ম্যাচ থেকে তো ২ পয়েন্ট ধরেই রেখেছিল অস্ট্রেলিয়া। ক্লার্ক অবশ্য এ ধরনের চিন্তা দল থেকে ঝেঁটিয়ে দূর করে দিতে চাইছেন, ‘আমি এর আগে বাংলাদেশের কাছে হেরেছি। জিম্বাবুয়ের কাছেও হেরেছি। ম্যাচটাকে আমরা তাই একদমই হালকাভাবে নিচ্ছি না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আমাদের যে মানসিকতা ছিল, এই ম্যাচের আগেও ঠিক তা-ই। বাংলাদেশ দলে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে। আর বিশ্বকাপ এমন একটা টুর্নামেন্ট, প্রতিপক্ষ দলের প্রতিভাবান কেউ একাই ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে।’
অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে সর্বশেষ খেলেছে চার বছর আগে। আগের দিনের টিম মিটিংয়ে তাই বাংলাদেশের সব ক্রিকেটারের ফুটেজ নিয়ে বিস্তর গবেষণার কথাও জানালেন ক্লার্ক। পুরোনো ফুটেজ আর ভিডিও অ্যানালিস্টের সাহায্য নিয়ে গবেষণা এখন সব দলই করে। অস্ট্রেলিয়ানদের নিয়ে বাংলাদেশও করেছে। কিন্তু সবই হয়তো আজ ব্রিসবেন নদীতে ফেলে দিতে হবে।
শহরের নাম ব্রিসবেন। শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীর নামও ব্রিসবেন। নদীর নামে শহর নাকি শহরের নামে নদী—ব্রিসবেনে এলে মনে এই প্রশ্ন জাগতে বাধ্য। ঘূর্ণিঝড়ে কখনো কখনো সেই ব্রিসবেন নদী ফুলেফেঁপে উঠে পুরো শহরকেই প্লাবিত করে। এবারও একটু-আধটু তা হয়েছে। কালই যেমন গ্যাবা থেকে সাত-আট কিলোমিটার দূরের আলবিয়ন ইনডোর স্পোর্টস সেন্টারে অস্ট্রেলিয়ার টিম বাসকে বিকল্প পথে ঢুকতে হয়েছে। মূল প্রবেশপথে যে এক হাঁটু জল।
ম্যাচ নিয়ে এত অনিশ্চয়তা থাকলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা খুব কঠিন। ৫০ ওভারের ম্যাচ হলে এক রকম, ওভার কমে গেলে আরেক রকম। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে দুই দলই তাই একাদশ চূড়ান্ত করার কাজটা ম্যাচের দিনের জন্য তুলে রেখেছে।
আগেভাগেই একাদশ জানাতে না চাইলে অধিনায়কেরা নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নেন। এটা যে তেমন কিছু নয়, সাংবাদিকদের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে না হওয়ার কোনোই কারণ নেই। তবে ম্যাচটা বৃষ্টিতে ভেসে গেলে বাংলাদেশ দলও খুব হতাশ হবে, মাশরাফি বিন মুর্তজার এই কথা অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকদের কাছে মোটেই তা হলো না। কুরিয়ার মেইলের অনলাইন সংস্করণে তো মাশরাফির এই দাবি নিয়ে টীকাটিপ্পনীও কাটা হয়েছে।
মাশরাফি যে মনের কথাই বলছেন, সেটি তাদের কে বোঝাবে! গত দুদিন এক হোটেলে থেকে বাংলাদেশ দলের মনোভাব যা বোঝা গেল, তাতে ১ পয়েন্টের প্রাপ্তির চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গ্যাবায় খেলার সুযোগ পেয়েও তা হারানোর ক্ষতিটাকেই বড় মনে করছে তারা। মাশরাফিও বারবারই তাঁর চাওয়ার কথা বললেন, ম্যাচটা হোক এবং পুরো ওভারের ম্যাচই। মাশরাফি প্রাপ্তির হিসাব করছেন ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘এই ম্যাচে আমাদের হারানোর কিছু নেই। বরং ভালো খেললে তা পরের ম্যাচগুলোতে কাজে লাগবে।’
ব্রিসবেনপ্রবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলী দম্পতি কাল রাতে প্রার্থনার সুরে বলছিলেন, ম্যাচটা যেন অবশ্যই হয়। দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে যাওয়ার কত আয়োজন যে করে রেখেছেন! মাশরাফির খেলতে চাওয়ার এটাও একটা কারণ, ‘জানতাম, দেশে ১৬ কোটি মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকেও যে এমন সমর্থন পাব, এখানে আসার আগে তা ভাবতে পারিনি। তাদের জন্যই আমরা খেলতে চাই, জিততে চাই।’
শেষ চাওয়াটা অবাস্তব শোনাতে পারে। তবে কে জানে! অন্য একটা প্রশ্নের ঝাঁজালো জবাবেই তো মাশরাফি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর চোখে অস্ট্রেলিয়া মানেই অজেয় নয়। আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, আমিরাত এমন ছোট দলগুলোর ভালো পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্নে ‘ছোট দল’ কথাটাই খুব লাগল তাঁর মনে। চোখেমুখে কাঠিন্য ফুটিয়ে বললেন, ‘কে ছোট কে বড় বলা কঠিন। যাদের ছোট বলা হয়, বলা হয় তো আমাদেরও। সেই ছোটরাও তাদের দিনে যে কাউকে হারিয়ে দিতে পারে।’
আজ মাঠে তা প্রমাণ করতে পারলে কার্ডিফকেও ছাড়িয়ে যাবে ব্রিসবেন। কিন্তু কোটি টাকার প্রশ্নটার উত্তরটা যে ব্রিসবেনের আকাশই জানে!
মাঠে নামার সুযোগ আদৌ মিলবে তো?

বিজ্ঞাপন
খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন