মেসিকে নিয়ে এসব আলোচনার কথা বলতে গিয়ে অনেকেরই হয়তো মনে পড়ে যাবে কবি পার্সি বিশি শেলির একটি কবিতার কয়েকটা পঙ্‌ক্তি, ‘আমাদের নিখাদ আনন্দের গল্পও ব্যথায় পরিপূর্ণ, আমাদের সবচেয়ে মধুর সংগীতও বেদনার সুরে গাঁথা’—শেলির লিখে যাওয়া এ চরণযুগলের সঙ্গে মেসিকে নিয়ে বর্তমান আলোচনার মিল কোথায়? এত এত প্রাপ্তির মাঝেও যে মেসির ক্যারিয়ারে একটা অপূর্ণতা আছে—আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর অর্জনের পাত্রটা একেবারেই সুধাহীন। মেসির মধুর গীতিকায় এটাই বেদনার সুর!

দায়টা কার? সময় এসেছে হিসেব মেলানোর। সেই হিসেব মেলাতে গিয়ে মেসি যদি বলে ফেলেন—আমি তো ফুটবলকে অনেক দিয়েছি। হে ফুটবল, কী দিলে আমায় তুমি? সত্যিই তো, সময়ের চাকায় ঘুরে মেসির ক্যারিয়ারটা একটু ঘুরে এলে কত শত জাদুকরি মুহূর্ত ভেসে উঠবে। ন্যু ক্যাম্প থেকে বার্লিন অথবা রোমের অলিম্পিক স্টেডিয়াম থেকে লন্ডনের ওয়েম্বলি—মাঠের সবুজ ক্যানভাসে পা নামের তুলির আঁচড়ে কত যে রঙিন ছবি এঁকেছেন মেসি! তার মধ্যে কিছু তো মনের পর্দায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তই করে নিয়েছে! ২০০৭ সালে লা লিগার এক ম্যাচে গেতাফের বিপক্ষে মাত্র ১৯ বছর বয়সে অনিন্দ্যসুন্দর এক গোলে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। ২০০৯ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে নেওয়া সেই হেডের কথাও কি কেউ ভুলতে পারবে! ফুটবল রোমান্টিকদের চোখে ফুটবলের মায়াঞ্জন এঁকে দেওয়া মেসির ক্যারিয়ারের উল্টো পিঠ মানে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর ছবিগুলো আবার হতাশার চাদরে মোড়া। বেশি তো দূরে নয়, ২০১৪ বিশ্বকাপের পর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল—ম্যাচ শেষের দৃশ্য তিনটি একটু মনে করে দেখুন। নতমস্তকের মেসিকে দেখে মনে হয়—সব হারিয়ে রিক্ত এক বীর যোদ্ধা পা টেনে টেনে হারিয়ে যাচ্ছেন অকূল অন্ধকারে!

২০১৪ বিশ্বকাপ শেষের ছবিটা তো যে কারও হৃদয় বিদীর্ণ করে দেওয়ার মতো। টুর্নামেন্ট সেরা ট্রফি হাতে মেসি দাঁড়িয়ে আছেন পাথরের মতো। দৃষ্টিটা ট্রফির দিকে নয়, কোন সুদূরে যেন হারিয়ে গেছে! হয়তো ভাবছিলেন—শ্বেতপাথরের রাজপ্রাসাদে থেকে আর কী হবে, জীবনে তোমায় যদি পেলাম না! মেসির কাছে এ ‘তোমায়’ যে কী, তা এখন সবার জানা—আর্জেন্টিনার হয়ে একটি সোনালি ট্রফি। যে ট্রফির ঝিলিকে আলোকিত হবে তাঁর মুখ। কিন্তু সেই সোনালি ঝিলিক তাঁকে মুখে মাখতে দিল কই ফুটবল দেবতা! এমন নয় যে এটা মেসির সঙ্গেই প্রথম হয়েছে। ইয়োহান ক্রুইফ, ফেরেঙ্ক পুসকাস, ইউসেবিওর মতো মহাতারকারাও তো ফুটবলকে অনেক দিয়েছেন। বিনিময়ে ফুটবল দেবতা তাঁদের না দিয়েছে বিশ্বকাপ, না মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। জর্জ বেস্টের মতো ফুটবলার তো বিশ্বকাপ বা ইউরোর কোনোটাই খেলতে পারেননি। কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্তেফানো তো দেশ বদলেও বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি। ফুটবল দেবতার আবার অনেক মহান ফুটবলারের দেনা শোধের গল্প আছে। সর্বশেষ উদাহরণটা তো খুব দূরের নয়। ২০১৬ ইউরোতেই তো ফুটবল দেবতা শুধেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দেনা, তাঁর মাথায় পরিয়েছে ইউরোপসেরার মুকুট। তারও আগে ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদোকে উপহার দিয়েছে তাঁর প্রাপ্য পুরস্কার। ১৯৯৮ সালে তীরে গিয়েও তরি ডুবেছিল তাঁর। সেই অভাব ফুটবল দেবতা মিটিয়েছে ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে। চার বছর আগে হয়তো রোনালদোকে বঞ্চিত করা হয়েছিল জিনেদিন জিদানের দেনা শোধের জন্য!

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির বিশ্বজয়ের স্বপ্নপূরণের অভিযান আসতে এখনো অনেক সময় বাকি। আপাতত আর্জেন্টিনার হয়ে একটি শিরোপা জয়ের হাতছানি তাঁর সামনে। ২০০৫ থেকে ২০২১—আর্জেন্টিনার হয়ে কিছু না জেতার ১৬ বছরের আক্ষেপ এবার ঘুচবে মেসির? সুযোগটা মেসির একার নয়। সুযোগটা ফুটবল দেবতারও, মেসির কাছে তার দেনা শোধ করার।