default-image

ভাঙার জন্যই তো রেকর্ডের জন্ম! বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেই চলে নিত্য রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলা। তবে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকস কোথাও কোথাও একটু ব্যতিক্রমই। একই রেকর্ড এখানে অনেক সময় টিকে থাকে যুগের পর যুগ।

২০১৯ সালে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ১০.২ সেকেন্ড সময় নিয়ে রেকর্ড গড়েন মোহাম্মদ ইসমাইল। সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ গেমসে ২০০ মিটারে রেকর্ড করেছেন শিরিন আক্তার। দুটি রেকর্ডই হাতঘড়িতে। আর হাতঘড়িতে রেকর্ড গড়ে অনেক সময় অ্যাথলেটরাও পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারেন না।

অবশ্য বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসে এখন হাতঘড়ির টাইমিংয়েও রেকর্ড খুব বেশি হয় না। সে জন্য কিছু রেকর্ড ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এমনকি তিন যুগেও নতুন রেকর্ড হয়নি অনেক খেলায়। মেয়েদের ৮০০ মিটার দৌড়ে শর্মিলা রায়ের রেকর্ডটির কথাই ধরুন। ২ মিনিট ১৩.৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১৯৮৫ সালে ঢাকা সাফ গেমসে এই রেকর্ড গড়েছিলেন রাঙামাটির তরুণী। বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসের সবচেয়ে পুরোনো সেই রেকর্ড আজও অক্ষত। ৩৬ বছর ধরে রেকর্ডের পাতায় নিজেকে দেখে কেমন লাগে? টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে হেসে শর্মিলা বললেন, ‘ভালোই লাগে। এত দিনেও আমার রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেনি।’ সঙ্গে জুড়ে দেন একটা আফসোসও, ‘নতুন কেউ না এলে কী আর করা!’

সাবেক অ্যাথলেট মিলজার হোসেনও চান তাঁর ৩৫ বছরের পুরোনো রেকর্ডটি কেউ ভেঙে দিক। ১৯৮৬ সিউল এশিয়ান গেমসে ৪০০ ও ৮০০ মিটার দৌড়ে নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়েন মিলজার। ৪০০ মিটারে সময় নেন ৪৭.৫৫ সেকেন্ড ও ৮০০ মিটারে ১ মিনিট ৫৫.১৬ সেকেন্ড। ১৯৯১ সালে ঢাকায় ৪০০ মিটারে মেহেদী হাসান হাতঘড়িতে (৪৭.২ সেকেন্ড) নতুন রেকর্ড করেন। অবশ্য ২০১৯ সালে ইলেকট্রনিক বোর্ডে জহির রায়হান সময় নেন ৪৬.৮৬ সেকেন্ড।

বিজ্ঞাপন
default-image

মিলজারের ৪০০ মিটারের রেকর্ডটি ভেঙে গেলেও ৮০০ মিটারে এখনো তাঁর নামই জ্বলজ্বল করছে রেকর্ড বইয়ে। সেই দৌড়ে এশিয়াডে পঞ্চম হয়েছিলেন মিলজার, যা এখন পর্যন্ত এশিয়াডে বাংলাদেশের কোনো অ্যাথলেটের সেরা সাফল্য। পেছন ফিরে তাকালে ভালোই লাগে মিলজারের। তবে দেশে ভালো মানের খেলোয়াড়ের অভাব তাঁকে ব্যথিতও করে। চট্টগ্রামের নিজ কর্মস্থল থেকে মুঠোফোনে মিলজার বলছিলেন, ‘নতুন খেলোয়াড়দের হয়তো সেই সামর্থ্য নেই। ভালো অনুশীলনেরও ঘাটতি আছে।’ রেকর্ডটি আরও অনেক বছর টিকে থাকলে তাঁর ভালোই লাগবে। তবে বাড়বে একটা আক্ষেপও, ‘আমি, শাহজালাল মবিন, শাহ আলমরা ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে যেমন খেলেছি, ওই পর্যায়ের অ্যাথলেট এখন আমাদের দেশে তৈরি হচ্ছে না।’

দুটি রিলেতেও ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ে রেকর্ড আছে মিলজারের। ১৯৮৯ ইসলামাবাদ সাফ গেমসে ১০০ মিটার রিলেতে সেটি গড়েছিলেন শাহ আলম, শাহজালাল মবিন ও শাহান উদ্দিনের সঙ্গে (৪০.৬ সেকেন্ড)। ১৯৯৩ ঢাকা সাফে ৪০০ মিটার রিলেতে গড়া রেকর্ডে (৩ মিনিট ১২.৪১ সেকেন্ড) মিলজারের সঙ্গী ছিলেন গিয়াস উদ্দিন, ফরিদ খান চৌধুরী ও আবদুর রহিম নাঈম।

১৯৮৭ সালে কলকাতা সাফ গেমসে ১৫০০ মিটার দৌড়ে রেকর্ড গড়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মোস্তাক আহমেদ (৩ মিনিট ৫০.৪৬ সেকেন্ড)। সেই রেকর্ড আজও অটুট। ‘ভালো অ্যাথলেট উঠে না আসারই ফল দীর্ঘদিন রেকর্ডটির থেকে যাওয়া,’ বলে যেন একটু আফসোসই করলেন মোস্তাক।

১১০ ও ৪০০ মিটার হার্ডলসের জাতীয় রেকর্ড টিকে আছে ২৮ বছর যাবৎ। ১৯৯৩ সালে ম্যানিলায় ১১০ মিটার হার্ডলসে ১৪.৬৭ সেকেন্ড সময় নেন সোলায়মান মজুমদার। একই বছর ঢাকা সাফ গেমসে ৪০০ মিটার হার্ডলসে আবদুর রহিম নাঈম সময় নেন ৪১.৮৭ সেকেন্ড। ১১০ মিটার হার্ডলসে হাতঘড়িতে রেকর্ড এখনো আবদুল খালেকের, ১৯৮৮ সালে ঢাকায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ১৪.১ সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন তিনি।

দেশে ট্রিপল জাম্পের রেকর্ডের বয়সও ৩০ বছর হয়ে গেছে। ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীর অ্যাথলেট এ বি এম আফজাল হোসেন (১৫.৫৫ মিটার) গড়েছিলেন এই রেকর্ড। ‘এখনকার খেলোয়াড়দের আসলে ট্রিপল জাম্প সম্পর্কে ধারণা কম। অনুশীলনও কম হয়। রেকর্ডটা তাই রয়ে গেছে,’ কুষ্টিয়ার নিজ বাড়ি থেকে মুঠোফোনে বলছিলেন আফজাল।

১৯৯২ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৬.৫৪ মিটার ছুড়ে হ্যামার থ্রোতে রেকর্ড গড়েন মমিনুল হক। ১৯৯৫ মাদ্রাজ সাফ গেমস স্মরণীয় হয়ে আছে ইলিয়াস উদ্দিনের কাছে। এক দিন আগে-পরে ৫০০০ ও ১০০০০ মিটার দৌড়ে জোড়া জাতীয় রেকর্ড গড়েছিলেন এই দূরপাল্লার দৌড়বিদ। দুটি রেকর্ডই আজও অটুট।

ওই মাদ্রাজ সাফেই ২০০ মিটার স্প্রিন্টে ইলেকট্রনিক রেকর্ড করেন প্রয়াত মাহবুব আলম (২১.১৫ সেকেন্ড)। অবশ্য ১৯৯২ সালে লাহোরে হাতঘড়িতে ২০০ মিটারে ২১ সেকেন্ড সময় নেন গোলাম আম্বিয়া। ১৯৯২ সালেই ঢাকায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ১২.১৪ মিটার ছুড়ে শটপুটে নেলী জেসমিনের গড়া রেকর্ডটিও আজও কেউ নতুন করে লিখতে পারেনি। ১৯৯৩ সালে ৪২.৯০ মিটার ছুড়ে ডিসকাসে সর্বশেষ রেকর্ড করেছিলেন জ্যোৎস্না আফরোজ। ১৯৯৬ সালে ১৫০০ মিটার দৌড়ে রহিমা খানম যূথী পাকিস্তানে ইসলামিক গেমসে রেকর্ড টাইমিং করেন ৪ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে। বর্শা নিক্ষেপে ১৯৯৭ সালে ৪৫.১৪ মিটার ছুড়ে রেকর্ড গড়া আখেরুন নেছা পেছন ফিরে বলছিলেন, ‘এখন খেলোয়াড় আছে, কিন্তু ভালো প্রশিক্ষণের অভাব। ফলে নতুন রেকর্ড হচ্ছে না।’

বিজ্ঞাপন
খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন