default-image

অনূর্ধ্ব-১৭ ক্যাম্প করতে আমি সবে ঢাকায় এসেছি। অন্যদিকে মোহাম্মদ আশরাফুল-মোহাম্মদ শরীফরা তখনই ওই পর্যায়ে সুপারস্টার। আশরাফুলকে প্রথম দেখে সালাম দিয়ে বলেছিলাম, ‘ভাই, কেমন আছেন?’ তবে সম্পর্কটা এরপর থেকেই বন্ধুত্বে গড়াল, যে বন্ধুত্ব আজও অটুট। আপনি থেকে ‘তুই’-এ আসতেও সময় লাগেনি আমাদের।
বিদেশ সফরে গিয়ে এমনও হয়েছে যে আমি ব্যাগ নিয়ে আমার রুমে উঠিনি। আশরাফুলের রুমে আশরাফুলের সঙ্গে থেকেছি। আশরাফুলেরও তাতে সমস্যা হয়নি কখনো। আজ যখন সেই আশরাফুলের এই অবস্থা, যখন আশরাফুলের মুখ থেকে শুনি ‘আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন’, আমার বুক ফেটে যায়। টেলিভিশনের পর্দায় তাকে কাঁদতে দেখে চোখ ভিজে যায় আমারও।
তবে একটা কথা বলি, আমি পাপকে ঘৃণা করি, পাপীকে নয়। অন্যায়ের শাস্তি সে নিশ্চয়ই পাবে, কিন্তু মানুষ আশরাফুলকে কী করে ফেলে দেব? আশরাফুল ভালো মানুষ। তাকে মানুষের উপকারে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি কতবার। যেভাবেই হোক হয়তো সে একটা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শাস্তিও হয়তো পাবে। কিন্তু ব্যক্তি আশরাফুল এবং খেলোয়াড় আশরাফুল আমার চোখে আগের সেই সম্মানের জায়গাতেই আছে। থাকবেও।

আমি যখন জাতীয় দলে আসি, বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই সিনিয়র। বয়সের মিল থাকায় আশরাফুল আর শরীফের সঙ্গে মেলামেশা বেশি ছিল। এত ভালো বন্ধুত্ব, অথচ আশরাফুলের সঙ্গে আমার চরিত্রের কোনো মিলই নেই। তার সঙ্গে ঝামেলা লেগে থাকত সব সময়। তার পরও ঘুরেফিরে দুজন একসঙ্গে থাকতাম। আশরাফুলের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে খেলোয়াড়দের সভার দিন। সেদিনও সে খুনসুটি করেছে আমার সঙ্গে। আমার ভুঁড়ি নিয়ে দুষ্টুমি করে বলছিল, ‘কী রে! তোর পেট তো আমার মতো হয়ে গেছে!’

শুধু আমি কেন, মানুষ আশরাফুলকে মনে হয় না কেউই খারাপ বলবে। জানি না এই অন্যায় সে কেন করেছে। শুধু এই অংশটা বাদ দিলে আশরাফুল মানেই বাংলাদেশের ভালো কিছু। একটা সময়ে তো আশরাফুল ভালো খেললেই জিতত বাংলাদেশ। আমি প্রকাশ্যেই বলছি, আজকে সাকিব-তামিম অনেক বড় খেলোয়াড় হয়েছে ঠিক আছে, আশরাফুলের জায়গায় আশরাফুল ঠিকই আছে। আমি-আপনি ভুল বলতে পারি, কিন্তু সুনীল গাভাস্কারের মতো লোকও যখন আশরাফুলকে প্রতিভাবান বলে স্বীকৃতি দেন, তখন সেটা মানতেই হয়।

প্রতিভার পুরোটা হয়তো মেলে ধরতে পারেনি সে, তার পরও যতটুকু করেছে সেটা সারা বিশ্বই জানে। সবাই জানে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল একা আশরাফুল। ভারতের বিপক্ষে আশরাফুল কী সেঞ্চুরিটাই না করল! মুত্তিয়া মুরালিধরনের মতো স্পিনারও খুব ভালো করে জানেন, আশরাফুলকে আউট করা কত কঠিন। একটা মাত্র বিতর্কে জড়িয়ে আজ তাকে অনেক কিছু শুনতে হচ্ছে। এটা বাদ দিলে ‘আশরাফুল ইজ দ্য টপ’।

আশরাফুলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আইসিসি ও বিসিবির ওপর। আইসিসির নির্দেশনা অনুসরণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিসিবি এখন খুবই কঠোর। আগেও আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। এদিক দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে সুনাম কুড়িয়েছে আমাদের ক্রিকেট বোর্ড। আশরাফুল দোষী প্রমাণিত হলে তারও কঠোর শাস্তি হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি সব সময়ই ব্যক্তি আশরাফুলের মঙ্গল চাই। বন্ধু হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে তার জন্য থাকবে আমার শুভকামনা।

আমার বিশ্বাস—সে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। মাঠে ফেরার সুযোগ পেলে এমনভাবে ফিরবে, পত্রিকার পাতা ভরে তোলা সব সমালোচনার জবাব শুধু রান করেই দিয়ে দেবে। সেই সামর্থ্য আছে আশরাফুলের। আশরাফুল যেভাবে সেঞ্চুরি করে, বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়ই সেভাবে সেঞ্চুরি করতে পারে না। তাঁর প্রতিটা এক শই এর একেকটা জ্বলন্ত উদাহরণ। বিপিএলে খুলনার বিপক্ষে যে সেঞ্চুরিটা করল, এ রকম সেঞ্চুরি আপনি খুব কমই দেখবেন।

আশরাফুলের ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটা বড় ক্ষতি। জাতীয় দলের অধিনায়ক থাকার সময়ও বলতাম, দলে আশরাফুল না থাকা মানে বিরাট ক্ষতি। আশরাফুল সত্যি সত্যি বহিষ্কৃত হলে আমরা আসলেই অনেক বড় একজন খেলোয়াড়কে মিস করব। তার ঘাটতি পূরণ করতে পারে শুধু সে-ই।

এত ওঠানামা, মিডিয়ার সমালোচনা, পারফরম্যান্স নিয়ে লড়াই—সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে অনেক চাপ নিয়েছে সে। এখনকার চাপটাও মনে হয় সামলে নেবে। ফিরে এসে এক-দুইটা ভালো ইনিংস খেলে দিলেই সব সহজ হয়ে যাবে। আশরাফুল যদি এত বড় অন্যায় স্বীকার করার মতো সাহস দেখাতে পারে, তাহলে আমার বিশ্বাস, ফিরে আসার চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সাহসও তার আছে। নিজেকে বাঁচাতে মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে সেটার প্রমাণ এর মধ্যেই দিয়েছে আশরাফুল। সব স্বীকার করার আগে আশরাফুলও জানত এর শাস্তি কী, তার পরও তো স্বীকার করেছে!

আমার মনে হয় সঠিক পথে আসার জন্যই সে এটা করেছে। কোনো মানুষ সঠিক পথে আসতে চাইলে সব ধর্মেই তাকে সে সুযোগ দেওয়ার কথা বলা আছে। আশরাফুলকেও যেন আমরা সে সুযোগ দিই, তাকে যেন ঘৃণা না করি। তার স্বীকারোক্তি তরুণ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের ক্রিকেট শিক্ষায় একটা অধ্যায় হতে পারে। প্রত্যেক মানুষই আমাদের আশরাফুলের কাছ থেকে এই বার্তাটা নিতে পারেন যে অন্যায় কাজ করলে তা স্বীকার করার সাহসও থাকা চাই। সবারই উচিত তার পাশে দাঁড়ানো, তাকে সাহায্য করা। ভুল শুধরে সঠিক পথে আসতে চাইলে তাকে সঠিক পথে আসতে দিতে হবে।

শেষ করার আগে কয়েকটা কথা আশরাফুলের উদ্দেশে। আশরাফুল, তুই হয়তো ভুল করেছিস, কিন্তু আমরা জানি মানুষ হিসেবে তুই কেমন। জীবনটা এখানেই শেষ নয়। হয়তো তুই আর ক্রিকেটে না-ও ফিরতে পারিস, হয়তো ফিরবি। যেটাই হোক, জীবনের চাকা থেমে থাকবে না। সেই জীবনে আমরা তোর পাশে আছি, আশরাফুল। �F& tP� � ansi-font-size:13.0pt;font-family:SolaimanLipi;mso-ascii-font-family: "Sulekha Sundar";mso-hansi-font-family:"Sulekha Sundar";mso-bidi-language:BN'>নিরাশার ঘোরেও আশা হাতড়াচ্ছেন মাহবুব হামিদ, ‘আশরাফুল নিজেই স্বীকার করেছে। তার পরও মনে মনে কেবলই দোয়া করছি আকসুর রিপোর্টে যদি তেমন কিছু না থাকত! আশরাফুল বেঁচে যেত, বাংলাদেশ ক্রিকেটও কলঙ্কিত হতো না।’

মুশফিকের বাবা মনে করিয়ে দিলেন ‘হোপ অ্যাগেনস্ট দ্য হোপ’ কথাটি। আশরাফুলের কোটি ভক্তও নিশ্চয়ই এমন আশার খড়কুটো আঁকড়ে ধরছেন। কিন্তু বাস্তবতা যে বড্ড কঠিন!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0