দক্ষতার পাশাপাশি তখন মনেরও বড় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক ও দক্ষতায় সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিয়ে শিরোপা জিতে গেলাম আমরা। আর তাতেই লেখা হলো নতুন ইতিহাস।
default-image

২০২০ যুব বিশ্বকাপের প্রস্তুতি আমরা শুরু করেছিলাম ২০১৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, দেশের মাঠে হওয়া এশিয়া কাপ সামনে রেখে। এশিয়া কাপের পর শ্রীলঙ্কায় সফর করলাম। আমাদের মূল প্রস্তুতির শুরু আসলে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে, ইংল্যান্ড যখন আমাদের দেশে এল। এই হোম সিরিজটা দিয়েই নিজেদের সম্পর্কে খুব ভালো জানতে পারলাম। আমাদের কোথায় ঘাটতি, কোথায় উন্নতি করতে হবে, কোথায় শক্তির জায়গা—এসব বুঝতে পারলাম তখন।

২০১৯ সালে আমরা টানা বিদেশ সফর করেছি, যা অনেক কাজে দিয়েছিল দল হিসেবে গড়ে উঠতে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ খেলতে হবে বলে ক্রিকেট বোর্ড চেষ্টা করেছে যত বেশি বাইরের কন্ডিশনে আমাদের খেলানো যায়। নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ডে অনুশীলন ম্যাচসহ ১৬-১৭টি ম্যাচ খেলেছিলাম। এটাও অনেক সহায়তা করে আমাদের।

বিজ্ঞাপন

গত জানুয়ারিতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে বলেছিলাম, আমরা ফাইনাল খেলতে চাই। এটা শুধু বলার জন্য বলা নয়, আমরা ধারাবাহিক ভালো খেলছিলাম। ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কায় ২০১৯ যুব এশিয়া কাপে আমরা ভালো করেছিলাম। বিশ্বাস ছিল, যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারি, টুর্নামেন্টে আমরা যেকোনো দলকেই হারাতে পারব। দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়েরই বিশ্বাস ছিল, আমরা ফাইনাল খেলতে পারি।

যখন আমরা বিশ্বকাপে যাই, শুরুতে মনোযোগ ছিল শুধুই গ্রুপ পর্বের ম্যাচ নিয়ে। ওই তিনটা ম্যাচ নিয়েই আমরা সব পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম। গ্রুপ পর্ব পেরোনোর আগে সেমিফাইনাল-ফাইনাল নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। শুরুতে তাই তিন প্রতিপক্ষ পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে ও স্কটল্যান্ডকে নিয়েই ভেবেছি।

কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আগে পাঁচ দিনের এক বিরতি পেয়েছিলাম। তখন আমরা শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ভেবেছি। সেমিফাইনালের আগে আবার পাঁচ দিনের সময় পেলাম, তখন প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে পরিকল্পনা করেছি। এভাবে আমরা একেকটি প্রতিপক্ষ ধরে ধরে এগিয়েছি। ফাইনালের আগে ভারতকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে সময় পেয়েছি দুই দিন।

default-image

নিশ্চয়ই জানেন, বর্তমান সময়ে ভারতের বিপক্ষে খেলার আগে মনস্তাত্ত্বিক কিছু বিষয় এমনি চলে আসে। জাতীয় দল, এমনকি বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের অনেক ম্যাচে তাদের বিপক্ষে আমরা খুব কাছে গিয়ে হেরেছি। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমাদের দলের কেউ ভারতকে নিয়ে ফাইনালের আগে একটা কথাও বলেনি! আমরা যে ভারতের কাছে আগে হেরেছি, সেই হারের ম্যাচগুলোর কথা একবারও আসেনি। অন্য ম্যাচের আগে যে প্রস্তুতি নিয়ে থাকি, ফাইনালের আগে একই প্রস্তুতি, একই ভাবনায় এগিয়েছি। অন্য ম্যাচের সঙ্গে এই ম্যাচের কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি। এ কারণে ফাইনালটা বাড়তি চাপ হয়ে আসেনি আমাদের কাছে।

এটা ঠিক, যতই বলি, ফাইনালে একটা চাপ থাকবেই। চাপটা কীভাবে নিতে হবে, এটি একেকজনের কাছে একেক রকম। সবাই এটা নিয়ে কোচের সঙ্গে আলাদা কাজ করেছে, কথা বলেছে। প্রত্যেকে নিজের মতো করে ফাইনালের চাপটা সামলেছে। ১৭০ রান তাড়া করতে নেমে ৮৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বেশ চাপে পড়তে হয় আমাদের। একটা ভালো দিক ছিল যে আমাদের আস্কিং রেট কম ছিল। বিশ্বাস ছিল, শেষ পর্যন্ত যদি একজন ব্যাটসম্যানও থাকে, জিতব। তখন নিশ্চয়ই খেয়াল করেছিলেন, মাঠে অনেক কথা হচ্ছিল। যতক্ষণ উইকেটে ছিলাম, সঙ্গী ব্যাটসম্যানদের বলছিলাম, প্রতিপক্ষের ফিল্ডারদের কথায় মনোযোগ যেন না হারাই। ওদের স্লেজিং হেসে উড়িয়ে দিতে বলছিলাম, যা ইচ্ছা ওরা বলুক। ওদের দিকে তাকিয়ে তাই হাসছিলাম। দক্ষতার পাশাপাশি তখন মনেরও বড় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক ও দক্ষতায় সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিয়ে শিরোপা জিতে গেলাম আমরা। আর তাতেই লেখা হলো নতুন ইতিহাস।

শিরোপা জেতার পর রাতে একটু উদ্​যাপন করেছি। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকতেই কিছুটা বুঝেছিলাম, দেশে ফেরার পর আমাদের নিয়ে হইচই হতে পারে। কিন্তু এত মাতামাতি হবে, এ আমাদের কল্পনায়ও ছিল না! যখন ঢাকায় বিমানবন্দরে নামলাম, তখন যা হয়েছিল, যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এটা অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা ছিল।

বিজ্ঞাপন
আমার লক্ষ্যটা হচ্ছে, যেখানেই খেলি, ভালো খেলতে হবে। সামনে যে খেলা থাকে, সেটা নিয়েই শুধু ভাবি। সব খেলোয়াড়ের মতো অবশ্যই আমারও স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলা।
default-image

আমাদের আগেও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো অনূর্ধ্ব-১৯ দল পেয়েছে। তবে সেসব দল আমি দেখিনি, তুলনা করাটা তাই ঠিক হবে না। আমরা কীভাবে ভালো করেছি, সেটিই শুধু বলতে পারি। প্রতিটি ম্যাচ আমরা একটা দল হিসেবে খেলেছি। দলের সবাই নিজের ভূমিকা নিয়ে পরিষ্কার ছিল। আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা বুঝিয়ে দিয়েছিল কোচিং স্টাফরা। খেলোয়াড়েরা সবাই শুধু নিজের কাজটাই ঠিকমতো করে গেছে। আরেকটি বিষয় অনেক সহায়তা করেছে। আমাদের দলের অনেকেই সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে ২০১৯ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ খেলেছিল। তাঁদের সঙ্গে খেলার এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কাজে দিয়েছিল।

শিরোপা জেতার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের নিয়ে সবার প্রত্যাশা বেড়েছে। দলের বাকিদের লক্ষ্য-স্বপ্ন কী, বলতে পারব না। তবে আমার লক্ষ্যটা হচ্ছে, যেখানেই খেলি, ভালো খেলতে হবে। সামনে যে খেলা থাকে, সেটা নিয়েই শুধু ভাবি। সব খেলোয়াড়ের মতো অবশ্যই আমারও স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলা। আশা করছি, আমাদের চ্যাম্পিয়ন দল থেকে বেশির ভাগ ক্রিকেটার একে একে সুযোগ পাবে জাতীয় দলে।

আকবর আলী: ২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক।

মন্তব্য পড়ুন 0