default-image

মিসবাহ-উল-হকও কি এখন বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, কিছু ইতিহাস বদলানোর নয়!
অ্যাডিলেডে মহারণের আগের দিন পাকিস্তান অধিনায়ক ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর ছবিটা দেখাতে চেয়েছিলেন সবাইকে। ‘বলুন তো, পৃথিবীতে কোন ইতিহাসটা আছে যেটি বদলায়নি? বদলাবে, এটাও বদলাবে।’
বদলাল তো না-ই, বরং রহস্যটা আরও ঘনীভূত হলো। ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে যা এখন খেলাধুলার ইতিহাসেই সবচেয়ে বড় রহস্যে পরিণত হওয়ার পথে। বিশ্বকাপে ভারতকে হারাতে পারে না পাকিস্তান।
এই ম্যাচের আগে ওয়ানডেতে জয়-পরাজয়ের হিসাবে পাকিস্তান ৭২-৫০ ম্যাচে এগিয়ে। কিন্তু বিশ্বকাপেই পাকিস্তানি আধিপত্যের ছবিটা কীভাবে যেন ভোজবাজির মতো পাল্টে যায়। বিশ্বকাপও হতে হয় না, টুর্নামেন্টের নামে ‘ওয়ার্ল্ড’ শব্দটা থাকলেই হয়। আইসিসির আরেক টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে জয় আছে পাকিস্তানের। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতেও দুদলের চার ম্যাচের চারটিতেই জয়ী দলের নাম ভারত। এ এক বিস্ময়! মহাবিস্ময়! যেটিকে পাকিস্তানিরাও যেন নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে।
পাকিস্তান ইনিংসের প্রায় পুরোটাই প্রেসবক্সে বসে দেখলেন মঈন খান। সাবেক উইকেটকিপার এখন পাকিস্তান ক্রিকেটের প্রধান নির্বাচক। ইনিংসের মাঝামাঝি পাশের কমেন্ট্রি বক্স থেকে বেরিয়ে মঈনের পাশে এসে বসলেন ওয়াসিম আকরাম। মাঠে কারও চোখ নেই। অ্যাডিলেডের সানডে মেইল পত্রিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে কী নিয়ে যেন দুজনের তুমুল হাসাহাসি। বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তানের গল্পটা বদলাচ্ছে না, এটি যে ততক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
২৩ বছর আগে এই অস্ট্রেলিয়াতেই রহস্যটার শুরু। ওয়াসিম আকরাম ও মঈন খান দুজনই ছিলেন সিডনির ওই ম্যাচে। সিডনি থেকে বেঙ্গালুরু, ম্যানচেস্টার, সেঞ্চুরিয়ন, মোহালি ঘুরে অ্যাডিলেডে এসেও ইতিহাসের এই পাতাটায় একই কথা লেখা থাকল। আগের ৫টি ম্যাচেই শচীন টেন্ডুলকার ছিলেন, ৩টিতে ম্যান অব দ্য ম্যাচ। এই প্রথম বিশ্বকাপে টেন্ডুলকারবিহীন ভারত-পাকিস্তান। বদল বলতে টেন্ডুলকারের পরিবর্তে এবার ম্যাচের সেরা তাঁর উত্তরসূরি বিরাট কোহলি।
আকরাম-মঈন যে সানডে মেইল দেখছিলেন, সেটির প্রথম পাতায় ২০১১ বিশ্বকাপজয়ী ভারতের ছবি। ওপরে হিন্দিতে লেখা ‘স্বাগত’। পেছনের পাতায় ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের পর ইমরান-ইনজামাম-আকরামের ছবি। ওপরে ওই ‘স্বাগত’ কথাটাই উর্দুতে লেখা। অ্যাডিলেডের রাস্তায় রাস্তায় গির্জা। এই শহরের আরেক নাম তাই ‘সিটি অব চার্চেস’। নিরিবিলি শান্ত এই ছোট্ট শহর কাল সকাল থেকেই ‘জিতেগা’ ‘জিতেগা’ চিৎকারে সরগরম। ঝাঁক বেঁধে দুই দলের সমর্থকেরা ভিড় জমিয়েছে অ্যাডিলেডে। ম্যাচের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির অনেক আগেই ‘জিতেগা ভাই জিতেগা, ইন্ডিয়া জিতেগা’ কোরাস ‘জিত গিয়া ভাই জিত গিয়া ইন্ডিয়া জিত গিয়া’তে রূপান্তরিত। যে ম্যাচকে ঘিরে আকাশ-মর্ত্য-পাতাল এমন আলোড়িত, সেটিই হলো কি না এমন একতরফা!
টেলএন্ডারদের সঙ্গে নিয়ে মিসবাহ-উল-হক যখন সংগ্রাম করছেন, অ্যাডিলেডে যেন ফিরে এল মোহালি। যেন রিপ্লে হচ্ছে। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ৫৬ রান করতে ৭৬ বল লাগিয়ে ফেলায় মিসবাহকে দাঁড়াতে হয়েছিল কাঠগড়ায়। কাল ৮৪ বলে ৭৬ রান করে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়া মিসবাহকে কেউ দোষী করছেন না। ৯ বলে ১ রান যোগ করতে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরই এই ম্যাচ একরকম শেষ হয়ে গিয়েছিল। অলৌকিক কিছুর আশা নিয়ে তার পরও চিৎকার করে যাচ্ছিল পাকিস্তানি সমর্থকেরা। উইকেটে যে মিসবাহর সঙ্গে তখনো আছেন শহীদ আফ্রিদি।
আস্কিং রেট তরতর করে বাড়ছে। শহীদ আফ্রিদিকে তাই চালাতেই হতো। শামির বলে চালাতে গিয়ে যে ক্যাচটা তুললেন, সেটি হাতে জমিয়ে বিরাট কোহলি রণহুংকার দিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই মাঠেই জোড়া সেঞ্চুরি করেছেন এই কদিন আগে। সে মাঠেই কোহলির আরেকটি সেঞ্চুরিতে ভাগ্যের ছোঁয়া থাকল। আফ্রিদির বলে ডিপ মিড উইকেটে দেওয়া ক্যাচটা সহজ ছিল না। তবে এমন ক্যাচ যে নেওয়াই যায় না, তা নয়। ইয়াসির শাহ নিতে পারলেন না। কোহলি তখন মাত্র ৩ রানে। কোহলিকে তৃতীয় ইনিংসটা খেলার সুযোগ দিলেন উমর আকমল। বাঁহাতি স্পিনার হারিস সোহেলের বলে উইকেটের পেছনে আকমলের ক্যাচ ছাড়ার সময় অবশ্য ৭৬ হয়ে গেছে কোহলির।
প্রথমে ধাওয়ান ও পরে রায়নার সঙ্গে কোহলির বড় দুটি জুটি ভারতের স্কোরকে তিন শ পেরিয়েও আরও অনেক দূরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। সেটি ঠিক তিন শ রানেই থেমে যাওয়ার মূলে সোহেল খান। ৫৫ রানে তাঁর ৫ উইকেট। এর মধ্যে শেষ ওভারের প্রথম দুই বলে দুটি। আগের ওভারের শেষ বলেও উইকেট পড়ায় আসলে পর পর তিন বলে ভারতের তিন ব্যাটসম্যানের ড্রেসিংরুমে ফেরা।
অ্যাডিলেড ওভাল বরাবরই ব্যাটসম্যানদের বন্ধু। তিন শ রান তাড়া করা এখানে তাই অসম্ভব কিছু নয়। ২৪তম ওভারে পাকিস্তান যখন ২ উইকেটে ১০২, নাটকীয় একটা শেষ তখন হাতছানি দিচ্ছিলই। তখনই পাকিস্তানের মিডল অর্ডারের ভেঙে পড়া। উমেশ যাদব ১ ওভারে ২ উইকেট নিলেন, অন্যটি জাদেজা। তবে এঁরা দুজনই নিমিত্তমাত্র। এটা বিশ্বকাপ, ওই ধসটা না নামলেও পাকিস্তান হারার একটা পথ ঠিকই করে নিত!
আজকের খেলা
ওয়েস্ট ইন্ডিজ-আয়ারল্যান্ড
(ভোর ৪টা, নেলসন)

আগামীকালের খেলা
নিউজিল্যান্ড-স্কটল্যান্ড
(ভোর ৪টা, ডানেডিন)

গতকালের ফল
ভারত: ৫০ ওভারে ৩০০/৭
পাকিস্তান: ৪৭ ওভারে ২২৪
ফল: ভারত ৭৬ রানে জয়ী

দ. আফ্রিকা: ৫০ ওভারে ৩৩৯/৪
জিম্বাবুয়ে: ৪৮.২ ওভারে ২৭৭
ফল: দ. আফ্রিকা ৬২ রানে জয়ী

বিজ্ঞাপন
খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন