২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে, ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচেও রান আউটই হয়েছিলেন ধোনি।
২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে, ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচেও রান আউটই হয়েছিলেন ধোনি।এএফপি

কাল ইনস্টাগ্রামে যখন নিজেকে ‘অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার’ হিসেবে ধরে নিতে বললেন মহেন্দ্র সিং ধোনি, তখন তাঁর কী চট্টগ্রামের সেই দিনটির কথা মনে পড়ছিল! ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফরে চট্টগ্রামে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। সে ম্যাচে ব্যাটিংয়ে নেমে কোনো রান করার আগেই প্যাভিলিয়নে ফিরেছিলেন তিনি। হতাশ, ভগ্ন হৃদয়ে। মোহাম্মদ রফিকের বলে শর্ট স্কয়ার লেগে ঠেলে দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম রানটা তুলে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাপস বৈশ্যর থ্রোয়ে বাংলাদেশের উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ যখন তাঁর স্টাম্প ভেঙে দিলেন, তখন ধোনি নিজের ভবিষ্যৎটা অন্ধকারই দেখছিলেন। সেদিন এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকেরা ভাবতেও পারেননি, যে খেলোয়াড়টির ফিরে যাওয়া তারা উদ্‌যাপন করছেন, তিনিই ক্যারিয়ার শেষ করবেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল ও সেরা হিসেবে।

তাঁর শেষটাও সেই রানআউটের খড়্গেই। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দলের বিপর্যয়ের মুখে ৫০ রানের এক ইনিংস খেললেন ধোনি। সেই ইনিংসে ভারতকে প্রায় ফাইনালে তুলেই দিয়েছিল। কিন্তু রান আউটে সেই আশার সমাধি। ধোনির ১৫ বছরের ক্যারিয়ারেরও হয়তো। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের ৪০০ দিনের মাথায় সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটালেন তিনি ছোট্ট এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে—আমাকে অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার হিসেবে ধরে নিন। রান আউটে শুরু যে দুর্দান্ত ক্যারিয়ারের শুরুটা, রান আউট দিয়েই তাঁর সমাপ্তি। এ যেন বিধাতার তৈরি স্ক্রিপ্ট। যে মানুষটার জীবন নিয়ে বক্স অফিস হিট ছবি হতে পারে, তাঁর ক্ষেত্রে এমনটাই তো স্বাভাবিক।

default-image
বিজ্ঞাপন

কাল ইনস্টাগ্রামে যখন নিজেকে ‘অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার’ হিসেবে ধরে নিতে বললেন মহেন্দ্র সিং ধোনি, তখন তাঁর কী চট্টগ্রামের সেই দিনটির কথা মনে পড়ছিল! ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফরে চট্টগ্রামে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। সে ম্যাচে ব্যাটিংয়ে নেমে কোনো রান করার আগেই প্যাভিলিয়নে ফিরেছিলেন তিনি। হতাশ, ভগ্ন হৃদয়ে। মোহাম্মদ রফিকের বলে শর্ট স্কয়ার লেগে ঠেলে দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম রানটা তুলে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাপস বৈশ্যর থ্রোয়ে বাংলাদেশের উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ যখন তাঁর স্টাম্প ভেঙে দিলেন, তখন ধোনি নিজের ভবিষ্যৎটা অন্ধকারই দেখছিলেন। সেদিন এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকেরা ভাবতেও পারেননি, যে খেলোয়াড়টির ফিরে যাওয়া তারা উদ্‌যাপন করছেন, তিনিই ক্যারিয়ার শেষ করবেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল ও সেরা হিসেবে।


তাঁর শেষটাও সেই রানআউটের খড়্গেই। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দলের বিপর্যয়ের মুখে ৫০ রানের এক ইনিংস খেললেন ধোনি। সেই ইনিংসে ভারতকে প্রায় ফাইনালে তুলেই দিয়েছিল। কিন্তু রান আউটে সেই আশার সমাধি। ধোনির ১৫ বছরের ক্যারিয়ারেরও হয়তো। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের ৪০০ দিনের মাথায় সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটালেন তিনি ছোট্ট এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে—আমাকে অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার হিসেবে ধরে নিন। রান আউটে শুরু যে দুর্দান্ত ক্যারিয়ারের শুরুটা, রান আউট দিয়েই তাঁর সমাপ্তি। এ যেন বিধাতার তৈরি স্ক্রিপ্ট। যে মানুষটার জীবন নিয়ে বক্স অফিস হিট ছবি হতে পারে, তাঁর ক্ষেত্রে এমনটাই তো স্বাভাবিক।

দুই রান আউটের মাঝখানের সময়টা অবশ্য অবিশ্বাস্য। চট্টগ্রামের সেই ম্যাচে রান আউট হয়ে ফেরার সময়ই হয়তো ধোনি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলেন নিজের লক্ষ্যটা। নাহ্, সেটি কেবল আর দশজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের মতো সাধারণ একটা জীবনের নয়, তিনি লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। আর সেটি তিনি করে দেখিয়েছেন। দুই রান আউটের মাঝখানের জীবনটা ইংরেজিতে যাঁকে বলে ‘রোলার কোস্টার রাইড’। নিজেকে প্রমাণ করা থেকে শুরু করে ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করে মহাগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠা। ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা নেতার কাতারে নিজেকে অধিষ্ঠান। নিজের বরফশীতল স্নায়ুকে উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

নিজের অভিষেক ম্যাচে ‘শূন্য’। পরের তিনটি ইনিংসে ১২, অপরাজিত ৭ ও ৩। এর পরপরই ক্রিকেট দুনিয়া চিনল ধোনিকে। বিশাখাপত্তমে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২৩ বলে ১৪৮ রানের এক ইনিংস দিয়েই তিনি হয়ে গেলেন ভারতের ঘরোয়া এক নাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে কাঁপিয়ে দেওয়া সেই সেঞ্চুরিই তাঁকে পথ করে দিল নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। তিন নম্বরে নেমে করা সেই সেঞ্চুরিটি তাঁকে ভারতের মিডল অর্ডারের নির্ভরশীলতায় পরিণত করল। অচিরেই এক ম্যাচ উইনারে পরিণত হলেন। তাঁর নামের পাশে বসে গেল ‘গ্রেট ফিনিশার’ শব্দ যুগল। দলের বিপদের মুখে কিংবা প্রয়োজনে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তিনি সবাইকে বাধ্য করলেন ‘গ্রেট ফিনিশার’ হিসেবে ডাকতে।

বিজ্ঞাপন

অধিনায়ক হিসেবে তাঁর শুরুটাও রূপকথার মতোই। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত খেলতে গেল দলের ত্রিরত্ন শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলী ও রাহুল দ্রাবিড়কে ছাড়াই। ধোনির হাতে তুলে দেওয়া হলো লাগাম। কিন্তু মোটামুটি তারুণ্য নির্ভর একটা দল নিয়ে ধোনি নিজের নেতৃত্বের পরীক্ষায় পেলেন ১০০ তে ১০০-ই। তাঁর হাতে দিয়েই ১৯৮৩ সালের পর ভারত পেল ক্রিকেটে প্রথম বিশ্বজয়ের গৌরব। আজ থেকে ১৩ বছর আগে টি-টোয়েন্টি সংস্করণটা খুব পরিচিত ছিল না ভারতীয় ক্রিকেট দলের কাছে। তখনো আইপিএল বলে কিছু আসেনি। কিন্তু গোটা টুর্নামেন্টে ভারত দেখিয়ে দিল ক্রিকেটের ছোট সংস্করণটা কীভাবে খেলতে হয়। অগ্নিপরীক্ষার মধ্যেও পড়তে হয়েছে, কিন্তু সব পরীক্ষাতেই ধোনির নেতৃত্বে ভারত উতরে গেল। ভারতও পেয়ে গেল তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক নেতাকে। জোহানেসবার্গের ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর সেই মুহূর্তটিই ধোনিকে ‘গ্রেট’ বানিয়ে দিল। সেই মুহূর্ত, যেটিতে মিসবাহ-উল-হকের সামনে শেষ ওভারে তিনি বল তুলে দিলেন অখ্যাত যোগিন্দর শর্মার হাতে। এর পরের ইতিহাসটা তো সবারই জানা, ধোনির অধিনায়কত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস হয়নি কারওরই।

এরপর ধোনি কেবল ওপরেই উঠেছেন। ২০১১ সালে ভারতকে এনে দিলেন ৫০ ওভারের ক্রিকেট বিশ্বকাপের শিরোপা। ক্লাইভ লয়েড, কপিল দেব, ইমরান খান, অ্যালান বোর্ডার, স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিংদের কাতারে তিনি। তাতেও সন্তুষ্ট করা গেল না ধোনিকে। ২০১৩ সালে জিতলেন আরেক বৈশ্বিক ট্রফি দেশের হয়ে—এবার ‘মিনি বিশ্বকাপ’—চ্যাম্পিয়নস ট্রফির। ২০১৫ সালে অধিনায়ক হিসেবে ভারতকে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রূপকথাটা আর লেখা হয়নি।
বিশ্বকাপ নিয়ে রূপকথা লেখা হয়তো হয়নি। কিন্তু ধোনির ক্যারিয়ারটাই রূপকথাতুল্য। তাঁর জীবন ‘এমএস ধোনি’ বায়োপিকের মতোই নাটকীয়। ভাবলেশহীন চেহারা নিয়ে ক্রিকেট মাঠে কীর্তি গড়ে যাওয়া এই মানুষটি ক্যারিয়ারের শেষটাও করলেন নাটকীয়ভাবেই। তিনি যে অন্য আর দশজন গ্রেটের চেয়েও আলাদা, বিদায়বেলায় সেটিই বুঝিয়ে দিলেন ছোট্ট এক ইনস্টা পেস্টে—‘এখন থেকে আমাকে অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার হিসেবে ধরে নিন।’

সেটি ধরে নিয়েও বলতে হচ্ছে ওই কথাটিই—চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়। ধোনির মতো ক্রিকেটারদের যে প্রস্থান নেই। ইতিহাসে তাঁরা নশ্বর, চিরস্থায়ী। তাঁদের আবেদন চিরকালেরই।

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন