সোনা রঙের সুদৃশ্য একটা ট্রফি। এক পাশ ধরে আছেন মুশফিকুর রহিম, আরেক পাশ তিনি। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস নিশ্চয়ই ছবিটি ভোলেননি। এই তো গত মার্চের ঘটনা। শ্রীলঙ্কায় ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচটি জিতেছিল বাংলাদেশ, ড্র হয়েছিল সিরিজ। ওয়ানডেতে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সর্বশেষ লড়াইয়ে জয়ী দল বাংলাদেশ। এবার এই মাঠের লড়াইয়ে আসুন। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামেও বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার সর্বশেষ লড়াইয়ে জয়ীর নাম বাংলাদেশ! সেটি ছিল ২০১২ এশিয়া কাপ। সব মিলিয়ে দুই দলের সর্বশেষ চার লড়াইয়ের দুটিই জিতেছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা একটি (বাকিটি ভেসে গেছে হাম্বানটোটার বৃষ্টিতে)। কে বলবে, এই শ্রীলঙ্কাই একসময় বাংলাদেশের জন্য ছিল প্রবল প্রতিপক্ষ!

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলা আর দুই দলের দ্বৈরথের বয়স প্রায় সমান। বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে খেলেছে ১৯৮৬ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে। দ্বিতীয় ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা। বিশ্ব ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কা তখনো কেবল উঠতি শক্তি। দিলীপ মেন্ডিসের দলের কাছে তবু পাত্তা পায়নি গাজী আশরাফ হোসেনের বাংলাদেশ। ১৩১ রান করে ম্যাচ হেরেছিল ৭ উইকেটে। পরের ২০ বছর ধরেই একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা লড়াই মানেই ফলটা আগেই জানা। বাংলাদেশের লক্ষ্যই থাকত লড়াই করা আর সম্মানজনক পরাজয়। সেই সম্মানও খুব বেশি জোটেনি। এই সময়ে দলটির বিপক্ষে টানা ১৫টি ওয়ানডে হেরেছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে ‘সম্মানজনক’ হারটিও ছিল রানের হিসেবে ৫৮ রানে, উইকেটের হিসেবে ৫ উইকেটে। জয় বহুদূর, সেই সম্ভাবনাও বাংলাদেশ জাগাতে পারেনি কখনো।

সেই ঊষর মরুতে স্বস্তির জলফোঁটা হয়ে এল বগুড়া। লঙ্কা-বাংলা লড়াইয়ের একতরফা ধারায় ছেদ পড়ল উত্তরাঞ্চলের শহরটিতে। শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে প্রথমবার হারানোর স্বাদ পেল বাংলাদেশ। ‘দশে মিলি করি কাজ’-এর আদর্শ উদাহরণ ছিল বাংলাদেশের সেই জয়। ছয় বোলারের সবাই উইকেট নিয়ে শ্রীলঙ্কাকে বেঁধে রেখেছিলেন ২১২ রানে—মোহাম্মদ রফিক, সৈয়দ রাসেল ও অলক কাপালি দুটি করে, একটি করে মাশরাফি, নাজমুল ও আফতাব। পরে রান তাড়ায় ওপেনিংয়ে জাভেদ ওমর করেছিলেন ৪০, চারে নেমে আশরাফুলের ব্যাট থেকে এসেছিল ইনিংসের একমাত্র ফিফটি (৫১), অধিনায়ক হাবিবুল বাশার পাঁচে নেমে ৩৩ আর ২১ বলে অপরাজিত ৩২ করে তুলির শেষ আঁচড় দিয়েছিলেন আফতাব। ৪ উইকেটে জিতেছিল বাংলাদেশ।

তবে ওই জয়টি ব্যতিক্রম হয়েই ছিল। পরের ম্যাচ থেকেই আবার পুরোনো চিত্র, চট্টগ্রামে ৭৮ রানে জিতে সিরিজ জিতে নিল শ্রীলঙ্কা। হারতে হলো আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে, ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতকে হারানোর পরের ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার কাছে হার ১৯৮ রানে! আবার টানা আট ম্যাচে একতরফা হার। এবারের জয়খরা কাটল বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হওয়ার পথে থাকা বাংলাদেশের এক তরুণের অসাধারণ ব্যাটিংয়ে। অভিষিক্ত রুবেল হোসেনের ৪ আর মাশরাফির ৩ উইকেটে ৩১ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে শ্রীলঙ্কা গুটিয়ে গিয়েছিল ১৪৭ রানে। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল খেলতে ২৫ ওভারে জিততে হতো বাংলাদেশকে। সাকিব আল হাসানের ৬৯ বলে অপরাজিত ৯২ রানে বাংলাদেশ জিতে গিয়েছিল ২৩.৫ ওভারে।
পরের ম্যাচ থেকেই আবার শ্রীলঙ্কার টানা জয়, তবে এবার আরও কমে এল ধারা। টানা চার হারের পর ২০১২ এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কাকে অনায়াসেই হারাল বাংলাদেশ। গত বছর ধরা দিল শ্রীলঙ্কার মাটিতে প্রথম জয়ও। মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসটি এখনো একতরফা, ৩৩ ম্যাচের ২৮টিই জিতেছে শ্রীলঙ্কা। তবু কাল সংবাদ সম্মেলনে ওয়ানডের বাংলাদেশকে নিয়ে লঙ্কান অধিনায়কের কণ্ঠে দারুণ সমীহ। কারণ ম্যাথুস জানেন, বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা দ্বৈরথে একতরফা লড়াই এখন শুধুই অতীত। ম্যাথুস জানেন, গায়ের পোশাকটা রঙিন হলেই এখন পাল্টে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ভাষা!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন