default-image

হেলমেট খোলা আর ব্যাট উঁঁচিয়ে ধরার প্রথাগত ধাপগুলো সারলেন ছোট্ট করে। এরপর উইকেটে সঙ্গীর দিকে এগিয়ে স্মিত হাসিতে হাত বাড়িয়ে দেওয়া। চমকে উঠতে হলো হাসিটা দেখেই। কী অদ্ভুত মিল সেদিনের সেই হাসির সঙ্গে!
এই তো গত রোববার, ড্রেসিং রুম থেকে মাঠে নেমে আসা সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। মিরপুর টেস্টে উইকেট ছুড়ে এসেছেন ৭৫ রান করে। তার আগে আরব আমিরাতে পাকিস্তান সিরিজে চারবার আউট হয়েছেন দুই অঙ্কে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সাতটি টেস্ট সিরিজে এই প্রথম সেঞ্চুরি পাননি। উইকেট থিতু হলেই যিনি অন্তহীন যাত্রার পথিক, সেই তিনি বারবার থমকে যাচ্ছিলেন খানিক পথ পাড়ি দিয়েই। পুনরাবৃত্তি বারবার হলে সেটি আর ব্যতিক্রম থাকে না। চট্টগ্রামেই কি তবে দেখা যাবে আরেকটি লম্বা ভ্রমণ? স্মিথ এক হাসিতে বলেছিলেন, ‘হোপফুলি...ওয়েট অ্যান্ড সি...।’
অপেক্ষার অবসান টানা সেঞ্চুরির পর কাল ঠিক সেই হাসিটাই ফুটিয়ে তুললেন ঠোঁটে। সেদিন কালো চশমার আড়ালে চোখের ভাষা পড়া যায়নি। কাল টিভি পর্দায় পরিষ্কার বোঝা গেল সেটিও। ভীষণ প্রাণবন্ত দুটি চোখে খেলা করছিল তৃপ্তি আর স্বস্তি। না, তিন অঙ্ক ছোঁয়ার স্বস্তি নয়, সেঞ্চুরিটাকে ডাল-ভাত বানিয়ে ফেলেছেন সেই কবে। বাংলাদেশের বিপক্ষে রান করাও বানিয়ে ফেলেছেন নিয়ম। কুমার সাঙ্গাকারার চোখে-মুখে ছিল আপন ভুবনে ফেরার তৃপ্তি। যেন বলতে চাইছিলেন, ‘অপেক্ষা করতে বলেছিলাম, দেখলে তো!’
বরপুত্রদের একজনের জন্য ক্রিকেট বিধাতার উপহারটাও দেখুন। সেঞ্চুরিটা ছোঁয়ার সময় উইকেট সঙ্গী কিনা মাহেলা জয়াবর্ধনে! প্রিয় বন্ধু আর অনেক লড়াইয়ের সহযোদ্ধা বলেই শুধু নয়, জয়াবর্ধনে কালকের ছবিটা দেখে ফেলেছিলেন তো সপ্তাহ খানেক আগেই। মিরপুরে সাঙ্গাকারার ৩৩ টেস্ট সেঞ্চুরি ছুঁয়েই বলেছিলেন, ‘সাঙ্গা আমাকে ছাড়িয়ে যাবে নিশ্চিতভাবেই, হয়তো পরের টেস্টেই।’ মাঠের ভেতরে-বাইরে এত দিনের সম্পর্ক দুজনের, গভীরভাবে জানেন পরস্পরকে, জয়াবর্ধনের বিশ্বাস কি আর ভুল হতে পারে! সাঙ্গাকারার পাশে কাল তাই ৩৪ টেস্ট সেঞ্চুরি।
এই সেঞ্চুরিটাকে আলাদা করে মনে রাখার কারণ আরও অনেক। ৩৪ সেঞ্চুরির ৩৩টিই করলেন ওয়ান ডাউনে। তিন নম্বরে বেশি সেঞ্চুরিতে সাঙ্গাকারা কাল ছাড়িয়ে গেলেন রিকি পন্টিংকে (৩২টি)। এটি যদি হয় অনুমিত প্রাপ্তি, তবে অবাক করা তথ্যও আছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরিতে (৬টি) ছাড়িয়ে গেছেন কাল জয়াবর্ধনে ও শচীন টেন্ডুলকারকে। তবে বিস্ময়কর হলো, বাংলাদেশের মাটিতে সেঞ্চুরি কালকেই প্রথম! আগের ৫ টেস্টে সর্বোচ্চ ছিল মিরপুরের ৭৫, এই সফরের আগে ৬৯! চক্রপূরণ হতে বাকি আর শুধু এক, সেঞ্চুরি করা হয়নি এখনো ক্যারিবিয়ানে।
বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটি সাঙ্গাকারাকে পৌঁছে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত আরেকটি মাইলফলকে। ছুঁয়েছেন আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির ফিফটি! মিরপুরেই প্রথম লঙ্কান ব্যাটসম্যান হিসেবে পঞ্চাশটি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি ছুঁয়েছিলেন জয়াবর্ধনে। ব্রায়ান লারা (৫৩) ও জ্যাক ক্যালিস (৬২) এখন দুই লঙ্কান মহিরুহের দৃষ্টিসীমাতেই। রিকি পন্টিংকে (৭১) ছোঁয়া হয়তো হবে না। শচীন টেন্ডুলকার (১০০) তো আপাত সবার ধরাছোঁয়ার বাইরেই।
তবে এখনো যেমন তীব্র রানক্ষুধা, ৩৬ ছাড়িয়েও যেভাবে নবীনের মতো নিজেকে ঝালিয়ে নেন প্রতিটি অনুশীলন সেশনে, চলতি পথে আরও অনেক মাইলফলকই ঢুকবে দুজনের অর্জনের ঝুলিতে। সহ-অধিনায়ক দিনেশ চান্ডিমাল যেমন কাল দিন শেষে বলছিলেন, ‘ওরা দুজন এখনো অনুশীলনে ঘাম ঝরায় অনেক, মাঠের ভেতরে-বাইরে সব সময়ই কথা বলে ক্রিকেট নিয়ে। ওদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখি আমরা।’
এভাবেই তরুণদের আদর্শ হয়ে নিজেদের প্রতিদিন নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন দুজন। আর দুজনের লড়াইয়ে প্রিয় বন্ধুকে পেছনে ফেলছেন সাঙ্গাকারা। ৩৪ সেঞ্চুরিতে কাল ছুঁয়েছেন ব্রায়ান লারা ও সুনীল গাভাস্কারকে। শচীন টেন্ডুলকারও গাভাস্কারের ৩৪ সেঞ্চুরি ছুঁয়েছিলেন এই বাংলাদেশের মাটিতেই। সেই ইনিংসে করেছিলেন ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ অপরাজিত ২৪৮। বাংলাদেশের জন্য ভীতিকর তথ্য—সাঙ্গাকারার ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ এখন ২৮৭!

বিজ্ঞাপন
খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন