default-image

পরদিন অভিষেক টেস্ট খেলতে নামবেন। রাতে এমনিতেই ভালো ঘুম হওয়ার কথা নয়। জাভেদ ওমরেরও সে রাতে ঘুম হচ্ছিল না। কিন্তু সেটি যতটা না নিজের প্রথম টেস্ট খেলতে নামার রোমাঞ্চে, তার চেয়ে বেশি অ্যাংকেলের ব্যথায়। অনুশীলনে জাভেদ এমনভাবেই চোটটা পেয়েছিলেন যে মাঠ থেকে ড্রেসিংরুমে যেতে হয়েছিল সতীর্থদের কোলে চড়ে।

সে রাতটার কথা এখনো মনে পড়ে জাতীয় দলের সাবেক ওপেনারের, ‘মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। পরদিন খেলা, অথচ রাত ১২টা পর্যন্ত আমি শুধু পায়ে বরফই দিয়েছি। ব্যথানাশক ওষুধ খেয়েছি।’ টেস্টের আগের রাতটা যদিও ব্যথার কারণেই মনে থেকে গেছে, ব্যথা নিয়ে খেলা ওই টেস্টটাই আবার জাভেদের জীবনে রয়ে গেছে সোনালি ফ্রেমে বাঁধাই এক স্মৃতি হয়ে।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বুলাওয়েতে প্রথম ইনিংসে ৬২ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ওপেনিংয়ে নেমে জাভেদ অপরাজিত ছিলেন ৮৫ রানে। টেস্টে ওপেনিংয়ে নেমে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়ার নজির তাঁর আগে-পরে আছে আরও ৫৫টি। তবু জাভেদ একটি জায়গায় বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের চেয়ে আলাদা। অভিষেক টেস্টে এমন কীর্তি তাঁর আগে ছিল মাত্র দুজনের—জন ব্যারেট ও পেলহাম ওয়ার্নার। জাভেদ আদ্যন্ত ব্যাটিংয়ের বিশ্ব রেকর্ডটা ছুঁয়েছিলেন ২০০১ সালের আজকের দিনেই (২২ এপ্রিল), গত ২০ বছরেও যে কীর্তিতে তাঁর পাশে বসতে পারেননি নতুন কেউ।

বিজ্ঞাপন

তবে এমন কীর্তি গড়েও একটা আক্ষেপ রয়েই গেছে তাঁর, ‘দ্বিতীয় ইনিংসে মনেই হয়নি আমি আউট হব। শেষ ব্যাটসম্যান মঞ্জু (পেসার মঞ্জুরুল ইসলাম) যদি আরেকটু টিকে থাকত, হয়তো সেঞ্চুরি করতে পারতাম। ৪০টি টেস্টে মাত্র একটি সেঞ্চুরি একজন ওপেনারের জন্য যথেষ্ট নয়। অভিষেক টেস্টে ১০০ করতে পারলে অনেক বড় ব্যাপার হতো। বিশ্ব রেকর্ডের চেয়েও বড়।’ চোটে পড়ায় দ্বিতীয় ইনিংসে খালেদ মাসুদের ব্যাট করতে না পারাটাও জাভেদের তিন অঙ্ক না ছোঁয়ার একটি কারণ। জাভেদ অবশ্য তাঁর ইনিংসের শেষ ১৫-২০ রান আগেই ‘লিখে’ দিয়েছিলেন মাসুদের নামে, ‘দ্বিতীয় ইনিংসের আগে ওয়ার্ম আপের সময় পাইলটের (খালেদ মাসুদ) পা ভেঙে যায়। মনে মনে বললাম, আমি যা রান করব, তার চেয়ে পাইলটের জন্য হলেও আরও ১৫-২০ রান বেশি করব।’

১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার জুড়েই একটা ‘অপবাদ’ সঙ্গী ছিল জাভেদের—তিনি ব্যাটিংটা করেন ধীরলয়ে। জাভেদের কাছে আবার সেটির অনুবাদ ‘টেস্টের ব্যাটিং’। ২০০০ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্কোয়াডে থেকেও একাদশে সুযোগ না পাওয়ার হতাশা তাই ভুলতে পারেননি এখনো, ‘আমার নামের সঙ্গে সব সময় টেস্ট খেলোয়াড় তকমা ছিল। অথচ আমিই বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের একাদশে সুযোগ পাইনি! বাংলাদেশের টেস্ট খেলোয়াড়দের তালিকায় যেখানে আমার নামটা দুই নম্বরে থাকতে পারত, সেখানে এখন ১২ নম্বরে। আমি ছিলাম দ্বাদশ খেলোয়াড়।’

অবশ্য সে হতাশাই জিম্বাবুয়ের পরের টেস্টে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে জাভেদকে, ‘অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশ ৪০০ রান করেছে একটা ঘোরের মধ্যে থেকে। বুলবুল ভাই (আমিনুল ইসলাম) অসাধারণ সেঞ্চুরি করেছেন, সেটিও ঘোরের মধ্যে থেকে। জিম্বাবুয়ে যাওয়ার আগে সবার ঘোর কেটে যায়। আমাদের প্রস্তুতি তখন খুব ভালো হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমিও ভালো প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। অভিষেক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাইনি। মনে হচ্ছিল, জিম্বাবুয়েতে সুযোগ পেলে ভালো করতে হবে।’

প্রথম ইনিংসে ৬২ রান করার পরই বেড়ে যায় আত্মবিশ্বাস। বুলাওয়ের উইকেটে অনেক ঘাস ছিল। জাভেদের ভাষায়, ‘কোনটা মাঠ, কোনটা উইকেট বোঝা যাচ্ছিল না।’ তাতে অবশ্য তাঁর সুবিধাই হয়ে যায়, ‘ওদের পেসাররা শর্ট বল করছিল। আমি যেহেতু পুল খেলতাম না, বল ছাড়তে পারতাম ভালো; শর্ট বলগুলো ছেড়ে দিচ্ছিলাম। শটও কম খেলছিলাম। আমার সাধ্যের মধ্যে থাকা শটগুলোই খেলেছি। ড্রাইভ, স্কয়ার কাটের বাইরে কিছু খেলিনি।’

ঘরোয়া ক্রিকেটেও ‘ধরে খেলা’ ব্যাটসম্যান ছিলেন জাভেদ। ক্লাব ক্রিকেটে সব সময় উপলব্ধি করেছেন, তাঁর ধরে খেলাটার ওপর নির্ভর করে দল। সে জন্য দলীয় অনুশীলনের বাইরেও চেষ্টা করতেন নিজেকে প্রস্তুত রাখতে, ‘অনুশীলনের জন্য নিজে সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে সিমেন্টের উইকেট বানিয়েছি। বাসায় টেবিলের ওপর থেকে ছোড়া বলে ব্যাটিং অনুশীলন করেছি। বল কীভাবে ছাড়তে হবে, সেটাও শিখতাম।’ বিসিবির অনুশীলন সুবিধা তখন এত বেশি না থাকায় জাভেদ বেছে নিয়েছিলেন বাড়ির পাশের দুটি মাঠকে, ‘আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ বুয়েট মাঠ ও ফজলে রাব্বী হল কর্তৃপক্ষের কাছে। তারা আমাকে অনুশীলন করার সুযোগ দিত সেখানে।’

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জাভেদ খেলেছেন কয়েক প্রজন্মের সঙ্গে। আজকের তামিম-সাকিবরাও একসময় তাঁর সতীর্থ ছিলেন। আরও অনেক কিছুর মতো এটাকেও জাভেদ গৌরবের মনে করেন। তবে অতৃপ্তি ওই একটাই—অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি না পাওয়া। অভিষেকে আদ্যন্ত ব্যাটিংয়ের কীর্তিও সেই অতৃপ্তিতে কোনো সান্ত্বনা হতে পারেনি আজও।

বিজ্ঞাপন
খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন