সাকিব যে কারণে অন্যদের চেয়ে আলাদা

সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের প্রাণভোমরা। ছবি: প্রথম আলো
সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের প্রাণভোমরা। ছবি: প্রথম আলো
>

সাকিবের মতো মানসিক দৃঢ়তা ও নিজেকে বিশ্লেষণ করার সামর্থ্য না থাকলে অন্ধের মতো তাঁকে অনুকরণ হিতে বিপরীত হতে পারে

কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে যদি বলা হয়, সাকিব আল হাসানকে দেখে শেখা উচিত না, সেই ক্রিকেটার নিশ্চয়ই বিস্মিত হবেন। শুধু কোনো তরুণ ক্রিকেটার কেন, যে কারওরই চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা হবে কথাটা শুনলে। সাকিব বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা ক্রিকেটার। পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত তাঁর যা অর্জন, সেটা সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো। তাহলে সাকিবকে আদর্শ কেন মানবেন না একজন তরুণ ক্রিকেটার! কিন্তু শাহরিয়ার নাফিস, বাংলাদেশের হয়ে ২৪ টেস্ট ও ৭৫ ওয়ানডে খেলার পর নিজ অভিজ্ঞতা থেকে সাফ জানিয়ে দিলেন, উঠতি ক্রিকেটাররা যেন সাকিবকে অনুকরণ না করে!

কেন, সেটার একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন নাফিস। ক্রিকেটারদের আড্ডায় নিয়মিত আলোচনা হয়, এ বিষয়টা নিয়ে। সাকিব খুব বেশি অনুশীলন করেন না, কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ক্রিকেটার তিনি। নাফিস এই উদাহরণ টেনেই বললেন, ‘একেকটা মানুষ একেক রকম। মুশফিকের কথা ধরুন, আমরা জানি মুশফিক অনুশীলনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেয়। সাকিব তেমন না। আমরা ক্রিকেটাররা নিজেদের মধ্যে সব সময় একটা কথা বলে থাকি, সাকিব আল হাসানকে কোনো খেলোয়াড় যেন অনুকরণ না করে। সাকিবের অনুশীলনের ধরন অনুকরণ করা সবার জন্য আদর্শ না-ও হতে পারে। সাকিব মানসিকভাবে নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করে, সেটা অনুকরণীয়।’

কিন্তু সাকিব সব সময়ই এমন ছিলেন না। তরুণ সাকিব অনুশীলনে যথেষ্ট সময় কাটিয়েছেন। ঘাম ঝরিয়েছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিল তিল করে। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শক্ত ভিত সেখানেই গড়ে নিয়েছেন। ক্রিকেটারদের প্রিয় কোচ নাজমুল আবেদীন বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই সাকিবকে দেখে এসেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বললেন, ‘আমাদের একটু গোড়া থেকে দেখতে হবে। ওর যখন বয়স কম ছিল, তখন ওর পরিশ্রম ছিল অনেক। অনুশীলনে সময় অনেক কাটিয়েছে সে।’

২০০৬-০৭ সালের দিকে যখন আন্তর্জাতিক অভিষেক সাকিবের, বাংলাদেশের সূচি তখন এত ঠাসা ছিল না। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি তখন মাত্র শুরু। আইপিএল, বিপিএলের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটও ছিল না। সময়ের সঙ্গে জাতীয় দলের ব্যস্ততা বেড়েছে। বেড়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ব্যস্ততা। একজন পুরোদস্তুর অলরাউন্ডারের ওয়ার্কলোড বিবেচনা করেই ম্যাচের বাইরের অনুশীলন কমিয়ে এনেছেন সাকিব।

নাজমুল আবেদীনের ব্যাখ্যায়, ‘যতই সময় গড়িয়েছে, ওর ম্যাচের বাইরে অনুশীলন কমে এসেছে। কমার কারণ হচ্ছে, শুরুতে তো ম্যাচ খেলার সুযোগ ছিল না। তখন অনুশীলনটা প্রয়োজন ছিল। ক্রিকেটার হিসেবে নিজের ভিত্তিটা তৈরির জন্য সেটা দরকার ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের সংখ্যা এতই বাড়ল যে অনুশীলনটা সেই অনুপাতে কমাতে হয়েছে। সে কারণেই অনুশীলনটা খুব চোখে পড়ে না। এত ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ওই কাজের চাপটাও মানিয়ে নিতে হয় ওকে।’

সাকিবের গুরু কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খুব কাছ থেকে নিজের শিষ্যকে বিশ্বসেরা হয়ে উঠতে দেখেছেন। এবারের বিশ্বকাপের আগে সালাউদ্দিনের সঙ্গে বিশেষ অনুশীলন করেছেন সাকিব, যার ফল হাতেনাতে পাচ্ছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘সাকিবের বোঝার সামর্থ্য অনেক। সে অপ্রয়োজনে কোনো কিছু করে সময় কাটায় না। যা দরকার ঠিক তাই করে সে। অন্যদের যেমন কোনো কিছু বারবার বলতে হয়, সাকিব তেমন না।’

প্রধান কোচ স্টিভ রোডসের ভোটও সাকিবের পক্ষে। ২০১০ সালে সাকিব যখন উস্টারশায়ারের হয়ে খেলতে গিয়েছিলেন তখন কোচ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন রোডস। সাকিব আজকের সাকিব হয়ে ওঠার আগেই তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন রোডস। গত এশিয়া কাপের আগে তিনি বলেছিলেন, ‘সাকিব যখন তরুণ ছিল, তখনই যা অনুশীলন করার করে নিয়েছে। ম্যাচ অনুশীলনও কম করেননি সাকিব। প্রতিটি টেস্টে ৫০ ওভার করে বল করেছে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই। তাঁর সব সময় অনুশীলন করার খুব প্রয়োজন নেই।’

হাইপারফরম্যান্স প্রোগ্রামে ‘ডিপ প্র্যাকটিস’ নামের একটা বিষয় আছে। অ্যাথলেটদের ক্ষেত্রে, কোনো ভুল ধরা পড়লে সেই নির্দিষ্ট ভুল নিয়ে কাজ করে যাওয়াকে ডিপ প্র্যাকটিস বলে। একে একে ভুলগুলো শুধরে ফেলাই ডিপ প্র্যাকটিসের মূলকথা। বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল ঠিক তাই করে থাকেন। অনুশীলনে শুধু দু-একটি বিষয় নিয়েই কাজ করে থাকেন এই দুজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলনে সময় কাটান না। বাংলাদেশ দলের সাবেক মনোবিদ আলী খান বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেছেন এভাবে, ‘সব সময় অনেক অনুশীলন করলেই বিশ্বমানের পারফরমার হওয়া যায় না। ডিপ প্র্যাকটিসের মাধ্যমেও বড় পারফরমার হওয়া যায়। এটা হাইপারফরম্যান্স প্রোগ্রামের পরিচিত ধারণা। এর মাধ্যমে ছয় সপ্তাহের কাজ ছয় দিনে করা যায়।’

সবার কথা থেকে এটা পরিষ্কার, সাকিব আল হাসান তরুণ ক্রিকেটারদের পথপ্রদর্শক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাঁর মতো মানসিক দৃঢ়তা ও নিজেকে বিশ্লেষণ করার সামর্থ্য না থাকলে অন্ধের মতো সাকিবকে অনুকরণ করে যাওয়া হিতে বিপরীত হতে পারে।