আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরির পর মেহেদী হাসান মিরাজ
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরির পর মেহেদী হাসান মিরাজছবি: শামসুল হক

চট্টগ্রাম টেস্টে কাল প্রথম দিনের খেলা শেষে অপরাজিত ছিলেন সাকিব আল হাসান ও লিটন দাস। উইকেটে অনেকক্ষণ থাকায় দুজনই ২২ গজের চরিত্র বুঝে গিয়েছিলেন।

৪৯ রানের অবিচ্ছিন্ন একটা জুটিও হয়েছিল। আজ দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরুর আগে এ দুজনই ছিলেন বাংলাদেশের বাজির ঘোড়া। অন্তত সমর্থকদের কাছে।

সাকিব অথবা লিটনের কাছ থেকে বড় ইনিংস দেখার আশায় ছিলেন সবাই। লিটন পারেননি। সাকিব সেঞ্চুরির পথে বেশ অনেকটা পথ এগিয়েও হতাশ করেছেন।

শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরির দেখা মিলল এমন একজনের কাছ থেকে, যিনি অলরাউন্ডার হলেও জাতীয় দলে খ্যাতি কুড়িয়েছেন স্পিনার হিসেবে। মেহেদী হাসান মিরাজ।

বিজ্ঞাপন

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান ছিলেন মিরাজ। পাশাপাশি অফ স্পিনেও দারুণ হাত। ২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ফিফটি ছিল তাঁর।

সে বছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই চট্টগ্রামেই টেস্ট অভিষেক ঘটে মিরাজের। দুই ম্যাচের সিরিজে ১৯ উইকেট নিয়ে সেই যে সিরিজসেরা হলেন, এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি বোলার মিরাজকে। কিন্তু বোলার মিরাজের ছত্রচ্ছায়ায় মাঝের এ পাঁচ বছরে হারিয়ে গিয়েছিলেন ব্যাটসম্যান মিরাজ। এত দিনে তাঁকে পাওয়া গেল!

default-image

সেই কবে ২০১৮ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫০ (৬৮) পেরিয়েছিলেন। আর এর আগে ২০১৭ সালে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে করেছিলেন ৫১ রান। ব্যস, টেস্টে মিরাজের পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস বলতে এই দুই ঘটনাই।

টেস্টে দুবার ম্যাচে ১০ উইকেট পাওয়ার কীর্তির সঙ্গে তুলনা করলে মিরাজের পরিচয় পুরোপুরি বোলার বলেই ঠেকে। সে মিরাজ অবশেষে তাঁর ব্যাটসম্যান সত্তার পরিচয় খুঁজে পেলেন।

আজ দ্বিতীয় দিনের খেলার তৃতীয় ওভারে লিটন আউট হওয়ার পর উইকেটে আসেন মিরাজ। অন্য প্রান্তে ছিলেন সাকিব। সপ্তম উইকেটে তাঁদের জুটিতে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল সাকিবের।

কিন্তু ১৩০ বলে তাঁদের ৬৭ রানের জুটিতে অন্তত রানসংখ্যার বিচারে নেতৃত্বটা দিয়েছেন আসলে মিরাজ। এ জুটিতে তাঁর অবদান ৭৭ বলে ৩৮। সাকিব আউট হওয়ার পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারত বাকি ব্যাটিং অর্ডার। স্বীকৃত ব্যাটসম্যানরা আউট হওয়ার পর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণত এমনই ঘটে থাকে।

default-image

কিন্তু দুই বোলার তাইজুল ইসলাম ও নাঈম হাসানকে নিয়ে মিরাজের লড়াইটা একবার দেখুন—তাইজুলের সঙ্গে ১১৭ বলে ৪৪ রানের জুটি। যেখানে মিরাজের অবদান ২২, আর তাইজুল খেলেছেন ৭২ বল, অর্থাৎ রান তুলেছেন মিরাজ, বল খেলেছেন তাইজুল। নাঈমের সঙ্গেও তাই—৭৭ বলে ৫৭।

নবম উইকেট জুটিতে একটু দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেছেন মিরাজ। সেটিও ক্রিকেটীয় কৌশল থেকে—অন্য প্রান্তে উইকেট ক্রমান্বয়ে শেষ হয়ে আসায় এক প্রান্ত থেকে যত বেশি সম্ভব রান তোলার চেষ্টা করেছেন এ অলরাউন্ডার।

বিজ্ঞাপন

এমনকি শেষ উইকেটে মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়েও তাঁর ২৬ বলে ১৪ রানের জুটিতে ছিল লড়াইয়ের ছাপ। টেস্টে সাতে কিংবা আটে নেমে কোনো ব্যাটসম্যানের এমন লড়াই কত দিন দেখে না বাংলাদেশ!

মিরাজ আজ আটে নেমে এমন লড়াই করেই আদায় করে নেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি, সেটিও টেস্ট ময়দানে। উদযাপনটাও তাই হলো দেখার মতো।

৯৯ রানে জোমেল ওয়ারিক্যানকে প্যাডল সুইপ করে রানের জন্য দৌড়ানোর পথেই একবার লাফ দিলেন। চোখেমুখে ঠিকরে বেরোচ্ছিল উচ্ছ্বাস। উইকেটে চুমুও খেলেন। ২৩ বছর বয়সী এ অলরাউন্ডারের ব্যাটিং দেখে উল্টো তাঁর কপালে চুমু আঁকতে চাইবেন সমর্থকেরা।

default-image

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা পরিকল্পনা করেই মাঠে নেমেছিলেন। সকাল থেকে লেগে ফিল্ডার সাজিয়ে ক্রমাগত পায়ের ওপর বল করে যাচ্ছিলেন ক্যারিবীয় স্পিনাররা। অফ সাইডে স্পিনারদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় দু-তিনজন ফিল্ডার ছিলেন।

শর্ট লেগেও ফিল্ডার ছিল। মিরাজ তা দেখে বুঝেশুনেই খেলেছেন। জোর করে কোনো শট খেলার চেষ্টা করেননি। এক-দুই করে রান নিয়েছেন। যে ১৩ বাউন্ডারি মেরেছেন, সব কটিই দৃষ্টিনন্দন।

স্কয়ার কাট, ব্যাক ফুট পাঞ্চ ও মিড অন দিয়েও নিচে খেলেছেন। সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ছিলেন ওয়ারিক্যানকে এগিয়ে এসে ইনসাইড আউটে কাভার দিয়ে মারা বাউন্ডারি। চোস্ত ব্যাটসম্যানের প্রতিচ্ছবি!

আর পেসারদের ক্ষেত্রে বাউন্সার যেভাবে ‘ডাক’ করেছেন, সেটি টপ অর্ডাররা দেখে নিতে পারেন। স্টাম্পের বল এবং অফ সাইডে ব্যাটে পাবেন, এমন বল ছাড়া খেলেননি।

সময়ের সঙ্গে ব্যাটিংয়ের ধারা পাল্টেছেন মিরাজ। ৯৯ বলে যখন ফিফটি পেলেন উইকেটে ছিলেন তাইজুল। ৩৮ রান পর্যন্ত তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন সাকিব। তিনি যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, একদম রয়ে-সয়ে খেলেছেন মিরাজ। বোলাররা ব্যাট হাতে নামতেই রান বের করার চেষ্টা করেছেন মিরাজ। তবে সবই ক্রিকেটীয় শট খেলে।

default-image

পরের ৫০ রান তিনি তুলে নিয়েছেন ৬১ বলে। অর্থাৎ বোলাররা অন্য প্রান্তে থাকতে উইকেটে টিকে থাকার সঙ্গে রানের সুযোগও তিনি হাতছাড়া করেননি। আটে নেমে এমন পরিণত ব্যাটিংয়ে তাঁর ১৬৮ বলে ১০৩ রানের ইনিংসটি চোখে লেগে থাকবে অনেকের।

আর এর মধ্য দিয়ে একটি অনন্য অর্জনেরও দেখা পেয়েছেন মিরাজ—মিরাজই একমাত্র ক্রিকেটার, যিনি বাংলাদেশের হয়ে যুব টেস্টে সেঞ্চুরির সঙ্গে টেস্টেও পেলেন তিন অঙ্কের দেখা। আর হ্যাঁ, সেটা ছিল তাঁর যুব টেস্ট অভিষেক ম্যাচ—চারে নেমেছিলেন ব্যাটসম্যান হিসেবে।

জাতীয় দল নিশ্চয়ই এই ‘ব্যাটসম্যান’ মিরাজকেও ঘন ঘন দেখতে চায়।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন