বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

তাসকিন, শরীফুল, খালেদ, ইবাদতদের ডিঙিয়ে জায়েদের জন্য এখন দলে সুযোগ পাওয়া এখন একটু কঠিনই। এই বাস্তবতা জানেন তিনিও। তারপরও কেন বললেন ওই কথা? কেন বললেন তাঁর বাদ পড়ায় ‘অন্য কাহিনি’ থাকতে পারে?

জায়েদ আলোচনায় এসেছেন তাঁর না খেলা আর বাদ পড়া নিয়ে ঝাঁজালো প্রতিক্রিয়া দিয়েই। তিনি বলেছেন, দলে তাঁর হয়ে কথা বলার কেউ নেই, তাঁর কোনো লবিং নেই, জাতীয় দলে এমন কেউ আছেন যিনি চান না তিনি দলে থাকুন বা খেলুন। জায়েদ এটাও পরিষ্কার করেছেন যে সেই ব্যক্তিটি দলের কোচ বা অধিনায়ক নন।

আজ জায়েদ না হয়ে যদি কথাগুলো জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের কেউ বলতেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটে বড় একটা বোমাই ফাটত। জায়েদ বলেই পটকা ফোটারও শব্দ হলো না। উল্টো নানামুখী চাপে এক দিনের মধ্যেই তাঁকে অবস্থান বদলে ফেলতে হলো। তারপরও শোনা যাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে অমন বক্তব্যের জন্য ঈদের পর বিসিবির সামনে জায়েদকে জবাবদিহি করতে হবে।

সেই জবাবদিহির আবহ বন্ধুভাবাপন্ন হলেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ভালো। বলে ফেলে আবার গিলে ফেলা কথার জন্য জায়েদকে আসামির কাঠগড়ায় না তুলে বরং সাহস দিয়ে জানতে চাইতে হবে, ‘তুমি আসলে কী বলতে চেয়েছ? খুলে বলো।’

দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার একদিন ড্রেসিংরুমে একে একে সব সতীর্থের কাছে জানতে চাইছিলেন, কোচ হিসেবে তারা রাসেল ডমিঙ্গোকে ১০-এ কত নম্বর দেবেন। এক ক্রিকেটার ওই সিনিয়রকে পাল্টা বলে বসেন, ‘আপনি নিজে কেন নম্বর দিচ্ছেন না?’

বিসিবির আচরণবিধির শৃঙ্খলে বন্দী ক্রিকেটারদের এমনিতে খুব বেশি মুখর হওয়ার সুযোগ নেই। জুনিয়র ক্রিকেটারদের তো আরও বিপদ। কিছু বলার আগে হাজারবার ভাবতে হয়, এটা বললে অমুক ভাই মাইন্ড করবেন না তো, ওটা বললে তমুক ভাই আবার কী মনে করেন! মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়াই–বা সেটা কীভাবে নেবে! বড় ভাইদের মতো সবার তো আর শক্তিশালী ‘… ইয়ান’ গ্রুপ নেই, যারা তাদের কিছু হলে জ্বালাবে আগুন ঘরে ঘরে, মানববন্ধন করবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তুলবে।

default-image

তো এ কারণে জাতীয় দলে এমনিতেই নির্বাক চরিত্র বেড়ে যাচ্ছে। স্পর্শকাতর হতে পারে এমন প্রসঙ্গগুলোয় মধ্যম সারির এবং জুনিয়র খেলোয়াড়েরা নিজেদের মতামত গোপন রাখতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যদি বলেনও, সেটা নিতান্তই দায়সারা গোছের। মনে হয় ‘ডাবিং’। মুখ নাড়ছেন তিনি, কথা বলছেন অন্য কেউ।

জায়েদ সেখানে ব্যতিক্রম হয়ে একটা স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছেন, যাতে জাতীয় দলের ভেতরে অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে থাকা অনাস্থা, অস্বস্তির কিছুটা হলেও আঁচ পাওয়া যায়। বাইরে থেকে দলটকে যতটা সুখী বলে মনে হয়, দলটা আসলেই সে রকম সুখী পরিবার কি না, সে সংশয় জাগায়। জায়েদ যদি ঠিক বলে থাকেন, তাহলে তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিললই। তখন খুঁজে বের করতে হবে কে সেই ব্যক্তি টেস্ট দলে যার প্রভাব কোচ-অধিনায়কের চেয়েও বেশি। আর জায়েদ যদি বাদ পড়ার হতাশা থেকেই এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে থাকেন, সেটার ব্যাখ্যাও তাঁর কাছে চাইতে হবে। তিনি বলবেন কেন তাঁর মধ্যে এই অনাস্থা।

default-image

বিসিবির প্রয়োজন নেই পুরো ব্যাপারটি জনতার মঞ্চে নিয়ে এসে ক্ষণে ক্ষণে জাতিকে ঘটনাপ্রবাহ জানানো। এটা হোক চার দেয়ালের ভেতর। জনগণ শুধু শেষের ফলাফলটাই জানুক। জানুক জায়েদ আসলে কী বলতে চেয়েছেন।

সেই ফলাফলের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একবার বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে উঁকি দিয়ে দেখা যাক সেখানকার পরিবেশটা এখন কেমন। সদ্য সমাপ্ত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের একটা ঘটনার কথা বললে অবশ্য সেই পরিবেশের কিছুটা আপনিও দেখে ফেলবেন।

দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার একদিন ড্রেসিংরুমে একে একে সব সতীর্থের কাছে জানতে চাইছিলেন, কোচ হিসেবে তারা রাসেল ডমিঙ্গোকে ১০-এ কত নম্বর দেবেন। জবাবে কেউ বলছিলেন ৮, কেউ ৭, ৯—এ রকম। তার মধ্যেই অভিজ্ঞতায় মধ্যম সারির এক ক্রিকেটার ওই সিনিয়রকে পাল্টা বলে বসেন, ‘আপনি নিজে কেন নম্বর দিচ্ছেন না? সবার কাছে সবার নম্বর জানতে চাচ্ছেন, নিজের নম্বরটাও দিন। বলেন, আপনি ডমিঙ্গোকে দশে কত দেবেন?’

default-image

এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পড়ে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন ওই সিনিয়র ক্রিকেটার এবং ডমিঙ্গোকে তাঁর নিজের নম্বরটি দেওয়া ছাড়াই শেষ হয়েছিল ড্রেসিংরুমের সেই অস্বস্তিকর পর্ব। টিম ম্যানেজমেন্টের অনেকেই ওই ঘটনায় মনে মনে হাততালি দিয়েছেন। তরুণেরা পাল্টা বলতে শিখছে, এটা তো ভালো লক্ষণই!

ওই ঘটনায় এটা পরিষ্কার যে ‘সুখী পরিবার’ বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে ভিন্ন হাওয়াও আছে। সীমিত পরিসরে হলেও সেখানে ভিন্নমত উচ্চকণ্ঠ হতে শুরু করেছে। জায়েদ কিঞ্চিৎ আওয়াজ তুলে আবার মিইয়ে যেতে চাইলেও সেই ভিন্ন হাওয়ার ঝাপটা ঠিকই লেগেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। প্রশ্ন হলো, বিসিবি হাওয়াটাকে কীভাবে অনুভব করবে?

এক. তারা এটাকে ভুল–বোঝাবুঝির মৃদু হাওয়া ধরে নিয়ে হাওয়াটাকে চলে যেতে দিতে পারে।

দুই. এটাকে চক্রান্ত কিংবা ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা প্রমাণ করে জায়েদকে সতর্ক, তিরস্কার অথবা শাস্তির আওতায়ও আনতে পারে।

তিন. জায়েদের কথাটাকে ড্রেসিংরুমের অন্ধকার কোনায় ঘাপটি মেরে থাকা অসন্তোষের উদ্‌গিরণ হিসেবে দেখে ঘটনার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং অবশ্যই সেটি জায়েদকে অভয় দিয়ে, নিরাপদ রেখে।

default-image

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগপর্যন্ত বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে মূলত দুটি অস্বস্তি ছিল। একটা তো তামিম-ডমিঙ্গো সম্পর্কের শীতলতা, যেটি দক্ষিণ আফ্রিকায় অনেকটাই উষ্ণতা পেয়েছে বলে বাহ্যিকভাবে মনে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সাকিবের সঙ্গে তামিমের অস্বস্তিকর সম্পর্ক, যেটি একটা সময়ে পারস্পরিক ‘বাক্‌ধর্মঘটে’ও রূপ নিয়েছিল বলে শোনা যায়। আফগানিস্তান সিরিজের পর ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম নিজ উদ্যোগে সাকিবের সঙ্গে বসে সে পরিস্থিতি সহজ করে এনেছেন বলে দলের ভেতরের খবর, যেটার বিজ্ঞাপন দক্ষিণ আফ্রিকাকে ওয়ানডে সিরিজে হারানোর পর সেঞ্চুরিয়নের মাঠে দুজনের আলিঙ্গনের ছবি।

কিন্তু এর মধ্যেই জায়েদের অভিমানী স্বর যেন নতুন বার্তা দিল! বিসিবির মাধ্যমে এখন এটাই জানা দরকার, জায়েদ আসলে কী বলতে চেয়েছেন। এটি শুধুই তাঁর খেলতে না পারার হতাশার বহিঃপ্রকাশ নাকি এখানে আসলেই ‘অন্য কাহিনি’ আছে!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন