বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

অথচ ৩০ বছর বয়সী আসিফ পাকিস্তানের ক্রিকেটে সব সময়ই আলোচিত-সমালোচিত এক চরিত্র। সমালোচনার তিরবিদ্ধ হয়েছেন কখনো ক্যাচ ফেলে, কখনো ব্যাট হাতে পরিস্থিতির দাবি মেটাতে ব্যর্থ হয়ে, টানা বাজে ফর্মে থেকেও দলে সুযোগ পেয়ে। আসিফের হাতে যে টি-টোয়েন্টির মারকাটারি ব্যাটিংটা আছে, ক্লাব ক্রিকেট এবং পিএসএলে সেটা তিনি প্রায়ই দেখাতে পারলেও জাতীয় দলে ধারাবাহিক হতে পারেননি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর সর্বোচ্চ ইনিংস অপরাজিত ৪১ রানের, সেটিও করেছেন ২০১৮ সালের জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এই বিশ্বকাপের আগের টানা চার ম্যাচে তো দেখা পাননি দুই অঙ্কেরই!

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষও তাই কখনোই পাকিস্তান দলে আসিফকে সহজভাবে নিতে পারেনি। ২০১৮ সালে যখন তিনি প্রথম জাতীয় দলে ডাক পান, তখন যেমন সেটা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল, এবারের বিশ্বকাপ দলে তাঁকে রাখা নিয়েও হয়েছে একই রকম সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত ‘ট্রল’ হওয়া চরিত্র আসিফ।

default-image

এটুকু পড়ে কোথাও কি আসিফের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মিল খুঁজে পাচ্ছেন? বাংলাদেশেও তো ক্রিকেটাররা খারাপ খেললে ‘ট্রল’ নিয়মিত ঘটনা। সেটি কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে যায় বৈকি। কিন্তু আসিফের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পার্থক্য বোধ হয় এই জায়গাতেই যে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনাগুলোকেও ইদানীং গায়ে মাখতে শুরু করেছেন। কখনো কখনো আক্রমণাত্মক ভাষায় সেগুলোর জবাব দিয়ে নিজেদের ওপরই চাপ বাড়িয়ে নিচ্ছেন। অথচ আসিফ নাকি সেসব পাত্তাই দেন না!

পরশু রাতে আফগানিস্তানকে হারানোর পর তিনি নিজেই বলেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আমি অনেক দূরে আছি। আমি এসব অনুসরণ করি না। আমাকে নিয়ে কী সমালোচনা হয়, সেটাও আমি অনেক সময় জানতে পারি না।’ ঠিক একই কারণে আসিফ এটাও জানতে পারছেন না যে পরশু রাতের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই চলছে তাঁর কাছে পাকিস্তানের মানুষের ক্ষমা চাওয়া এবং দুঃখ প্রকাশের পর্ব।

default-image

পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার আগে ফয়সালাবাদের এক পোশাক কারখানায় কাজ করতেন আসিফ। অনুশীলনের সুযোগ পেতেন কাজ শেষ করে রাতে। পোশাক কারখানার কাজের ফাঁকে ফাঁকে খেলেই একসময় নাম লেখান ফয়সালাবাদের ক্লাব ক্রিকেটে। সেখান থেকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, ইসলামাবাদ ইউনাইটেডের হয়ে পিএসএলে খেলা এবং পাকিস্তান দলের সাবেক অধিনায়ক ও কোচ মিসবাহ-উল-হকের চোখে পড়া। মূলত মিসবাহর পছন্দেই জাতীয় দলের ক্যাপ পান আসিফ। স্বাভাবিকভাবে মিসবাহই তাঁর প্রেরণা। আফগানিস্তানকে হারানো ৪ ছক্কায় মিসবাহর আস্থারই প্রতিদান দিয়েছেন আসিফ। আগের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শারজায়ও পাকিস্তানের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। ৩ ছক্কায় ২৩ বলে ২৭ রান করে সেদিনও তিনি দলকে জিতিয়েই মাঠ ছেড়েছিলেন।

আসিফকে নিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটে আলোচনা-সমালোচনা থাকতেই পারে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্ষেত্রটাই এমন যে সেখানে নানা চিন্তা আর রুচির মানুষের বসবাস। সবাই যে সেখানে খুব ভেবেচিন্তে কথা বলেন, মতামত দেন, তা তো নয়। এদিক দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মুখ সরিয়ে রাখা আসিফ হতে পারেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য আদর্শ।

default-image

কিন্তু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভালো খেলার যেটা প্রথম শর্ত, আসিফদের মতো সে রকম বল মাঠছাড়া করা ‘পাওয়ার হিটার’ কোথায় পাবে বাংলাদেশ? ক্রিকেটীয় সামর্থ্য, টেকনিক, অনুশীলন—সবকিছু বিবেচনায় রেখেও এটাই তো সত্যি যে জিনগত কারণেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সে জায়গায় পিছিয়ে। কাল দুবাইয়ে নির্বাচক হাবিবুল বাশারও বলছিলেন, ‘আমাদের পাওয়ার হিটার দরকার। অন্য দলগুলোতে এমন অনেকেই আছে, যারা ওভারে ১০ থেকে ১২ রান করে তুলতে পারে। এই জায়গায় আমাদের ঘাটতি আছে।’ সেটি পূরণের একটা পথও বাতলে দিলেন তিনি, ‘বারবার খেলা হওয়ায় অনেক সময় ঘরোয়া ক্রিকেটে আমরা ভালো উইকেট পাই না। যার জন্য আমাদের পাওয়ার হিটার তৈরি হচ্ছে না। আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে যেন আমরা ভালো উইকেটে খেলতে পারি।’

ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বের হয়ে একটু দেশের তৃণমূল ক্রিকেটের দিকে ফিরে তাকানো যাক। না, ঘরোয়া ক্রিকেটের সমস্যা নিয়ে নতুন করে কোনো অভিযোগ করার ইচ্ছা নেই। সেসব অভিযোগ যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পাথুরে দেয়ালে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসবে, তা তো জানাই। বরং একটা মজার কথা বলেই শেষ করা যাক।

২২ অক্টোবর সকালে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সিসিডিএমের এক কর্মকর্তা ফেসবুকে তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেটের উদ্বোধনের ছবি পোস্ট করলেন। মজাটা হলো, সেদিন বিকেলেই তিনি আরেকটি ছবি দিলেন তৃতীয় বিভাগ বাছাইয়ের চ্যাম্পিয়ন দলের। ক্লাবটি তাঁর নিজেরই বলে খেলোয়াড়দের গ্রুপ ছবিতে আছেন তিনিও।

একই দিনে এই দুই ছবির অর্থ, এক ম্যাচেই শেষ তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেট! দুই দল মিলে তৃণমূল পর্যায়ের মাত্র ২২ জন ক্রিকেটার সুযোগ পেলেন প্রতিযোগিতামূলক ক্লাব ক্রিকেটে খেলার যোগ্যতা প্রমাণের। বিসিবির বৃত্তের বাইরে থাকা বাকি ক্রিকেটাররা কেন নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পেলেন না, সে ইতিহাস অনেক লম্বা এবং পুরোনো। বাংলাদেশের ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট কারোরই তা অজানা নয়।

আসিফের মতো ‘পাওয়ার হিটার’ শুধু আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন কথাটা। আমরাই বোধ হয় আমাদের নতুন প্রতিভা উঠে আসার পথটা রুদ্ধ করে রেখেছি!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন