‘আমরা সিনিয়র হচ্ছি না!’
আগের ম্যাচে বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য জয় এসেছে দুই তরুণের ব্যাটে চড়ে। আফগানিস্তানের ২১৫ রানের জবাবে ৪৫ রানেই ৬ উইকেট হারানো বাংলাদেশকে ৪ উইকেট হাতে রেখেই জয় এনে দিয়েছে আফিফ হোসেন ও মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাট, প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের মহাকাব্যিক জয়ে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি হয়তো ছিল সেটিও। এত দিন ধরে সাকিব, মুশফিক, তামিম, মাহমুদউল্লাহর মতো ‘সিনিয়র’দের ঘাড়ে সওয়ার বাংলাদেশ দলকে অবশেষে ‘জুনিয়র’রা কঠিন পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ জিতিয়ে আনলেন!
আজ দ্বিতীয় ওয়ানডেতে একেবারে তরুণ কোনো ক্রিকেটার সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি, তবে আজকের ম্যাচেও বাংলাদেশের ৮৮ রানের জয়ের নায়ক সাকিব, তামিম বা মাহমুদউল্লাহ নন। মুশফিকও পার্শ্বনায়কের ভূমিকায়। নায়ক যে লিটন দাস! ম্যাচ শেষে সেই লিটনই ‘জুনিয়র-সিনিয়রে’র ভূমিকার প্রসঙ্গে বললেন, ‘আমরাও এখন সিনিয়র হচ্ছি না!’
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুটা আজ খারাপ হয়নি। তবে ৮৩ রানের মধ্যে তামিম ও সাকিব ফিরে যাওয়ার পর তৃতীয় উইকেটে মুশফিকের সঙ্গে জুটি বাঁধেন লিটন। মুশফিকও দারুণ খেলেছেন, ৯৩ বলে ৮৬ রানের ঝকঝকে ইনিংস দেখেছে তাঁর ব্যাট। তবে ২০২ রানের জুটিতে তাঁকে ছাপিয়েও দিনের নায়ক ১২৬ বলে ১৩৬ রান করা লিটন।
বছর দুয়েক ধরে আগের চেয়ে আরও বেশি ধারাবাহিক হচ্ছেন লিটন। দলের ব্যাটিংয়ের বড় ভরসাও হয়ে উঠছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৭ বছর কাটিয়ে ফেলা ২৭ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান যখন আজ ম্যাচ শেষে বললেন, ‘তাঁরাও সিনিয়র হচ্ছেন’, তাঁর আত্মোপলব্ধিটা বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের আনন্দ দেওয়ারই কথা।
আফগানিস্তানের রশিদ-মুজিবের মতো বোলারদের সামলানোর ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ছাপ দেখানোর প্রশ্নে লিটনের উত্তর, ‘আমরাও সিনিয়র হচ্ছি না? (হাসি) আমরাও তো ম্যাচ খেলে খেলে উন্নতি করছি। এখন তো আমরা যারা খেলছি আমরা সবাই...আমি ৫ বছর খেলে ফেলেছি, আফিফরা ২-৩ বছর খেলেছে, সবার তো একটা অভিজ্ঞতা হচ্ছে’—বলছিলেন লিটন।
তবে দিন শেষে সিনিয়র-জুনিয়র তো শুধুই অভিজ্ঞতার পার্থক্য, মাঠে নামার পর প্রত্যেকের পরিচয় তো শুধুই বাংলাদেশ দলের ১১ ক্রিকেটারের একজন! লিটনের উপলব্ধিও তেমনই, ‘আমার মনে হয় না এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আমরা কেউ আর সেভাবে চিন্তা করি।’
আজ নিজের ইনিংস নিয়ে কীভাবে চিন্তাটা সাজিয়েছেন লিটন? ওয়ানডেতে পঞ্চম শতক তো প্রক্রিয়া মেনে এসেছে, তার আগে লিটনের পরিকল্পনায় জড়িয়ে ছিল টেস্টের ভাবনা।
আগের ম্যাচে আলো ছড়ানো আফগান পেসার ফজলহক ফারুকিকে সামলানো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লিটন জানিয়েছেন সে পরিকল্পনার কথা, ‘মূলত চিন্তা ছিল, প্রথম দশ ওভারই নয়, ওর (ফারুকি) স্পেল যতক্ষণ আছে ততক্ষণ টেস্ট ব্যাটিংয়ের মনোভাব নিয়ে খেলার। কারণ আমি জানি ১৫-১৬ ওভার যদি খেলে ফেলা যায়, ততক্ষণে আবহাওয়া বদলে যায়, উইকেট ভালো হয়ে যায়, বোলারও বদলে যায়। সে কারণে প্রথমে পরিকল্পনা ছিল টেস্ট ব্যাটিং করা।’
অভিজ্ঞতায় পরিণত মস্তিষ্কের ভাবনা বলবেন এটিকে? তাহলে লিটনের পরের কথাটাও শুনে নিন, পরিপক্বতার ছাপ আরও বেশি করে খুঁজে পাবেন! ওয়ানডেতে এ নিয়ে আটবার ৫০ বা তার বেশি রান হয়েছে লিটনের, তার ৫টিতেই ছুঁয়েছেন তিন অঙ্ক। ভালো শুরুকে টেনে নেওয়া, ৫০-কে ১০০-তে বদলে ফেলার এই অভ্যাস কীভাবে হলো? উত্তরটা ঝুঁকিহীন খেলার চেষ্টাতেই লেখা!
গত দেড়-দুই বছরে ইনিংসের শুরুতে বাতাসে ভাসানো শট তেমন একটা খেলতে দেখা যায় না লিটনকে। কীভাবে হলো এই বদল?
লিটনের বিশদ উত্তর, ‘ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি কীভাবে পরিকল্পনাটা করছেন। খেলাটাকে কীভাবে নিয়ে চিন্তা করছেন। আমি চাইলে হয়তো শুরুর দিকে ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে মেরে দিতে পারতাম। তাতে কী হতো? চার বা ছয়! কিন্তু সেটাতে ঝুঁকি বেশি থাকত, হয়তো উইকেটটাই চলে যেত! এখন আমার উইকেট যাওয়া মানে তো দল চাপে পড়ে যাওয়া। আমার মনে হয় যে এই জিনিসটা নিজের চেষ্টাতেই বদলে নেওয়া প্রত্যেক ব্যাটসম্যানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমি এটা নিয়ে চিন্তা করছি, ভেবেছি যে আমার উইকেটের একটা মূল্য আছে। তো নিজের মূল্যটাই দিচ্ছি। আশা করি সামনেও দিতে পারব।’
তাতে বাংলাদেশ দলেরই লাভ!