default-image

আমি অদৃশ্য। তবে লিখলে একটা কাঠামো দাঁড়ায়। সেই কাঠামো আসলে দেখার, উপভোগের। ইউটিউবে হয়তো আমার চুম্বক অংশের দেখা পাবেন। সরাসরি যাঁরা আমার জন্ম দেখেছিলেন, তাঁরা স্বাদ পেয়েছেন পুরোটার, তাঁরা এক অর্থে ভাগ্যবানও।

আমার পর আমারই মতো আরও এসেছে, সামনেও আরও আসবে, কিন্তু একটি জায়গায় আমি চিরকালীন; এই দেশের কারও দক্ষতা, ধৈর্য, মনঃসংযোগ ও ঘাম নিংড়ে আমার আগে, আমার পর্যায়ের কেউ জন্মায়নি। আমিই প্রথম!

তাই বাড়ির বড় ছেলের মতো আদরের জায়গাটাও আলাদা। যত দিন আমার চেয়ে এক ধাপ বড় পর্যায়ে ‘প্রথম’-এর দেখা মিলছে না, তত দিন স্মৃতির পাতায়, স্মরণের মণিকোঠায় আমার নামটাই আগে আসবে। ভণিতা লাগছে? আমার জগৎটা জানলে বোধকরি সব পরিষ্কার হবে।

মানবকুলে যে আগে জন্মায়, সে বড়। আমরা এই মানবকুলের অংশ না হলেও যাঁরা জন্ম দিয়েছেন, অন্তত তাঁদের কাছে ‘সন্তানতুল্য’। আমাদের মধ্যে যে আগে জন্মায় সে প্রথম, কিন্তু ‘বড়’ ঠিক হয় ‘শরীর’-এর পুরুত্বে, ব্যাপ্তিতে। কেউ সরাসরি স্বীকার না করলেও আমরা কিন্তু মানুষের সুকুমার বৃত্তির অংশ।

বিজ্ঞাপন
default-image

মানুষের উৎকৃষ্ট গুণাবলিই তো সুকুমার বৃত্তি? তাহলে লোকে ক্রিকেট মাঠে দেশের জন্য নিজেকে নিংড়ে যেসব গুণের প্রকাশ ঘটায়, যেমন ধরুন সামান্য এক টুকরো হাতলওয়ালা কাঠ নিয়ে নেমে বিরুদ্ধ ও শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশে ধৈর্য, মনঃসংযোগ ও লড়াইয়ের সম্মিলনে যা করে, সেসব কি শুধুই সংখ্যা? তাহলে আমি তেমনই একটা সংখ্যা। ক্রিকেটীয় পরিভাষায় ‘ইনিংস’, আর এই ইনিংসের জগতে আমার স্থান এক বিশেষ জায়গায়।

বিলি মারডক (অস্ট্রেলিয়া), টিপ ফস্টার (ইংল্যান্ড), অব্রে ফকনার (দক্ষিণ আফ্রিকা), ক্লিফোর্ড রোচ (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), মার্টিন ডোনেলি (নিউজিল্যান্ড), ইমতিয়াজ আহমেদ (পাকিস্তান), পলি উমরিগড় (ভারত), ব্রেন্ডন কুরুপ্পু (শ্রীলঙ্কা) ও ডেভ হটন (জিম্বাবুয়ে)। ক্রিকেটের পোকা হলে এই নামগুলো দেখে এতক্ষণে ধরে ফেলার কথা। ধরতে না পারলেও সমস্যা নেই। আজ এই বিশেষ দিনে ধরিয়ে দিতেই তো স্মৃতির জাবর কাটছি।

এই নামগুলো তাদের দেশকে এনে দিয়েছেন আমারই মাপের ‘প্রথম’-এর ছোঁয়া। বুঝতেই পারছেন, আমাকে যিনি জন্ম দিয়েছেন তিনিও এই বিশেষ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এই তালিকা এতটাই বিশেষ যে ৯৯.৯৪ গড়ের সেই বেঁটেমতো লোকটা, যাকে আপনারা মাথায় করে রেখেছেন, কিংবা বাড়ির পাশেই প্রতিবেশী দেশে যাকে ‘ঈশ্বর’ করে রাখা হয়েছে, সেই বেঁটেমতো লোকটারও এখানে জায়গা হয়নি ভাগ্যের মারপ্যাঁচে।

আর আমাদেরও কেমন ভাগ্য দেখুন, জন্মদাতা কিংবা দাত্রীকে লোকে মা-বাবা বলে ডাকে। কিন্তু আমরা কী বলে ডাকব? মা? বাবা? আমাদের জগৎটাই যেহেতু মানুষের সৃষ্টি, তাই লাজ-শরমের মাথা খেয়েই বলছি, মানুষই এই অধিকার দেয়নি, এই রেওয়াজ করেনি; সেটা কি শুধুই নিরেট সংখ্যা বলে, প্রাণের অস্তিত্ব নেই তাই!

অথচ লোকের প্রাণে শক্তি, উচ্ছ্বাস জাগে আমাদের দেখে। টেস্টে বড় কোনো ইনিংস দেখে লোকের বিস্ময় জাগেনি, তা কখনো শুনিনি। কী নিবেদন, দক্ষতা, একাগ্রতা, চেষ্টা...ইত্যাদি! লোকে নাকি এসব দেখেই তাদের জীবনে চলার খোরাক মেটায়। বলা বাহুল্য, ঠিক এ জায়গায় আমি আমার জনক, থুক্কু, স্রষ্টাকে নিয়ে গর্ব করি।

default-image

হ্যাঁ, আবেগমথিত ভুল তাঁর হয়, হয়তো একটু বেশিই; বেঙ্গালুরুতে সেই অবিশ্বাস্য বিসর্জন কিংবা ঘরের খেলায় সতীর্থের ওপর চড়াও হওয়ার কথা ওঠে। কিন্তু যে লোক আমাদের জগৎকে আপন করে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো প্রতিনিয়ত অনুশীলন করেন, এতটুকু ক্লান্তি নেই, তাঁকে প্রাপ্যটুকু না দেওয়া হয়তো মনুষ্যসমাজের রীতি, কিন্তু ক্রিকেটে এসব চলে না। কথায় আছে, গেম অব ক্রিকেট ইজ আ গ্রেট লেভেলার!

আর তাই আমার মনে হয়, আমাকে অর্জন করতে যে গুণাবলির প্রয়োজন ছিল কোনো বাংলাদেশির মধ্যে, সেসবের সেরা সম্মিলন ঘটানো মানুষটার হাতেই আকৃতি পেয়েছি। মুশফিকুর রহিম! অথচ কী আশ্চর্য দেখুন, তাঁর নিজের ইচ্ছা ছিল আমি অন্য কারও পরিচয় বহন করি।

গলে সেদিন রাতে মুশফিক আমাকে চাননি। অন্তত তাঁর মুখের কথায়। আর এখানেও সম্ভবত খেল দেখিয়েছে তাঁর সেই আবেগ, আর কিছুটা বাস্তববোধও। তিনি চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম প্রেমের হাতেই উঠুক প্রথম জোড়া পদ্ম।

নিজেকে পদ্ম ভাবতে একটু লজ্জাই লাগছে। কিন্তু লোকে পুলক দমাতে না পেরে আমাকে যখন নানা বিশেষণে ভূষিত করে সেই বেলা! শুধু আমি কেন, আমাদের মতো ছোট-বড়দের স্রষ্টাদেরও এসব মেনে নিতে হয়। যে অন্য কারও কথা বললাম, তাঁর বিষয়টাই ভেবে দেখুন, তিনি অনেকের চোখেই বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের প্রথম প্রেম। প্রথম ‘দুঃখ’ও। ছ্যাঁকা, প্রতারিত হওয়া...এসবও বলা যায়। কিন্তু তিনিও চেষ্টা করেছিলেন আমাকে পেতে। অধরা থেকেছি তাঁরই ভুলে, নাকি ক্রিকেটের দৈব তুড়িতে?

একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। আমাকে পেতে দেশের অভিষেক টেস্টেই বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে গিয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম। তাঁর সেই সংখ্যাকে বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরলে এরপর যে খুব চেষ্টা হয়েছে, তা বলা যায় না। ২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে আমিনুলের চেয়ে আরেকটু এগিয়েছিলেন আপনাদের প্রথম প্রেম, মোহাম্মদ আশরাফুল। এর ছয় বছর পর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাঁর আশপাশে থেকে ব্যর্থ হন তামিম ইকবাল।

বিজ্ঞাপন
default-image

আমিনুল সেদিন আমাকে পেলে দেশের মানুষের আবেগের ব্যারোমিটারে কী ঘটত, তা জানি না। তবে লোকের মুখে শুনেছি, সেই অভিষেক টেস্টে ড্রেসিংরুমে ঈদের আবহ ছিল। মানে, উৎসবমুখর পরিবেশ আরকি! মন্ত্রী-মিনিস্টাররা অহরহ আসছেন, অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, টেস্টের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সর্বোচ্চ আবহে! আমিনুল এই বিরুদ্ধ-স্রোতেই যতটুকু এগিয়েছিলেন, সেটা যেন টেস্ট ব্যাটিংয়েরই সূত্র; আশরাফুল-তামিমরা হেঁটেছেন সে পথেই এবং আরও যাঁরা এসেছেন...।

কিন্তু গলে আট বছর আগে, পনেরো শ শতকের দুর্গের প্রান্তরে সেদিন যা ঘটেছিল, তা রূপক অর্থে যেন অমিত প্রতিভা ও একাগ্রতার জুটি বেঁধে দেশের হয়ে লড়াইয়ের মোড়কে আমাকে পাওয়ার চেষ্টা! বলা বাহুল্য, নিজেকে ধন্য মনে হয়েছিল।

৪ উইকেটে ৫৭০ রানে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করেছিল শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নেমেছিল দ্বিতীয় দিনে। সেদিন ৬৫ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন আশরাফুল। মুশফিক ব্যাটিংয়ে নামেন তৃতীয় দিনে দল ১৭৭ রানে চতুর্থ উইকেট খোয়ানোর পর। আশরাফুল তখন অপরাজিত ১৩৯ বলে ৮৫ রানে।

এখান থেকে দিনের খেলা শেষে আশরাফুল ১৮৯ আর মুশফিক ১৫২ রানে অপরাজিত। ভাগ্যও সুপ্রসন্ন ছিল। বলা হয়, দ্বিতীয় দিনে গলের পিচ দেখে মনে হবে চতুর্থ দিনের! প্রকট স্পিনবান্ধব। কিন্তু সেই টেস্টে গলের পিচ ভোজবাজির মতো হয়ে উঠেছিল ব্যাটিংস্বর্গ। কুলাসেকারা, ইরাঙ্গারা সুইং পাননি, হেরাথ-মেন্ডিসরা পাননি ‘কামড়’। সেই ড্র টেস্টের পর এ নিয়ে দুকথা শুনতে হয়েছে পিচ কিউরেটরকে।
তাই বলে মুশফিক-আশরাফুলকে পিচ যে হাতে সেঞ্চুরি তুলে দিয়েছে, তা ভেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সুনীল গাভাস্কারের ভাষায়, ‘একটা হাফ ভলি বলও ঠিকমতো খেলতে হয়।’ আমাদের জগতে এটাই নিয়ম।

সেই নিয়ম মেনেই পরের দিন আমাকে পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন আশরাফুল। মুশফিক সেদিন (তৃতীয় দিন) আশরাফুলের তুলনায় বেশি রান করলেও সেভাবে টের পাওয়া যায়নি। অনেকটা ধ্যানমগ্ন বকের মতো, ছোঁ মেরে শিকার তুলে নেবে, পানি কিচ্ছুটি টের পাবে না!

default-image

তৃতীয় দিনের খেলা শেষে আশরাফুলকে নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন অনেকেই। হোক না অধারাবাহিকে, তবু বাংলাদেশের প্রথম প্রেমের হাতেই তাহলে উঠছে! অলক্ষ্যে হেসেছিলেন কেউ। আশরাফুলের পরবর্তী গন্তব্য ‘তিনি’ নিশ্চয়ই জানতেন। আর তাই পরের দিন (চতুর্থ দিন) পাল্টে যায় দৃশ্যপট। ব্যর্থ হয় প্রতিভা, অন্য প্রান্তে তখনো অটল চেষ্টা ও একাগ্রতার সম্মিলনে গড়া মানুষটি।

চতুর্থ দিনের প্রথম বলেই রিভার্স সুইপ খেলেছিলেন আশরাফুল। তখনই টনক নড়া উচিত ছিল। একটুর জন্য আমি ফসকে যেতে পারি! পঞ্চম ওভারে গিয়ে তা চূড়ান্ত হলো। এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে একটা বুনো শট খেলতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন আশরাফুল (১৯০)। স্কোর তখন ‘নেলসন’ ৪৪৪/৫! ২৬৭ রানের সেই জুটিতে দুজনে মিলে খেলেছিলেন ৫১৮ বল। বাংলাদেশের যেকোনো উইকেট জুটিতে এটি সবচেয়ে বেশি বল খেলার রেকর্ড।

টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে কুমার সাঙ্গাকারার রেকর্ড খুব ভালো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাট করে ফিল্ডারদের খাটিয়ে মেরেছেন। মুশফিকের জিদ চেপে গিয়েছিল। এর জবাব দিতে হবে! তৃতীয় দিন শেষে রাতের খেতে খেতে আশরাফুলকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই প্রথমে আপনি...পান। এরপর আমি। এরপর আমরা ২৫০...৩০০ তুলব। কোনো ছাড়াছাড়ি নাই।’

সম্ভবত এই মানসিকতাই সেদিন আমাকে পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রেখেছিল অধিনায়ক মুশফিককে। সেই টেস্টে ১৩৫ ওভার উইকেটকিপিংয়ের পর প্রায় সোয়া সাত ঘণ্টা ব্যাট করার অমানুষিক সামর্থ্যটা তো আর এমনি এমনি আসেনি। আমাকে পাওয়াটা ছিল তাঁর প্রতি নিয়ত ঘাম ঝরিয়ে নিজেকে ভেঙেচুরে গড়ার পুরস্কার। এই পুরস্কার মুশফিক পরেও আর পেয়েছেন। আমার চেয়েও বড় কিছু হয়তো সামনেই। কিন্তু সেদিন আমাকে পাওয়ার পর তাঁর চোখে শিশুসুলভ আনন্দের যে ছটা দেখেছিলাম, আজ তা খুব করে মনে পড়ছে। মানুষের অনুভূতি নিয়ে আমারও বলতে ইচ্ছা করছে, টেস্টে ‘আমি’ বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের প্রথম দুই শ, যেদিন আমি জন্মেছিলাম, দিনপঞ্জির পাতা বদলে গল টেস্টের সেই চতুর্থ দিন ফিরে এসেছে আজ; আজ আমার জন্মদিন!

আমি জানি, কথাটা কেউ শুনতে পায়নি। ডাকলে হয়তো মুশফিক নিজেও শুনবেন না। কিন্তু জনক কখনো সন্তানকে ভুলে থাকতে পারে না, সে আমি জানি।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন