বাংলাদেশ দলের প্রায় পুরো কোচিং স্টাফই তো দক্ষিণ আফ্রিকান। আপনার খেলায় সেটা কতটা সাহায্য করেছে?

আফিফ: আমাদের সঙ্গে অ্যালবি (অ্যালবি মরকেল) কাজ করেছিলেন। ডেথ হিটিং নিয়ে তাঁর কয়েকটা সেশন খুব ভালো ছিল। পাওয়ার হিটিং নিয়ে কিছু কাজ করেছি। ছোট ছোট কিছু জিনিস ছিল, যেগুলো জানতে পেরেছি। হয়তো সেগুলো অনুশীলন করে যেতে থাকলে পাওয়ার হিটিংয়ে আরও উন্নতি হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় তো প্রথম সফর করলেন। বাউন্সের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিলেন? আপনাকে দেখে মনে হয়েছে খুব স্বচ্ছন্দে খেলছেন।

আফিফ: আমাদের হেড কোচ (রাসেল ডমিঙ্গো) তো দক্ষিণ আফ্রিকার, তিনি একটা ভাবনা আমাদের মাথায় দিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা হলো এই উইকেটে প্রথমে একটু কঠিন, কিন্তু পরে আরামে রান করা যায়। আউটফিল্ডও খুব দ্রুতগতির। তাই আমি এই জিনিসটাই চেষ্টা করেছি। প্রথমে কিছুটা সময় নিয়েছি। পরে আস্তে আস্তে সহজ হয়ে গিয়েছে। আর সেখানে কদিন অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছি, সেটা কাজে লাগিয়েছি। এটা একটা বড় ব্যাপার ছিল।

default-image

দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার আগে বিপিএল, আফগানিস্তান সিরিজেও রানের মধ্যে ছিলেন। সেটাও কি কিছুটা সাহায্য করেছে?

আফিফ: ছন্দটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার মনে হয় কি জানেন, আমি তখনই ভালো খেলি, যখন আমি দিনেরটা দিনেই মন থেকে সরিয়ে নিই। এক দিন যদি ভালো খেলি, পরদিন সেটা আমার মনে রাখি না। পরের দিনটা নতুন করে শুরু করি। যদি খারাপও খেলি, পরের দিন একই মানসিকতা থাকে। আমি দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো ছন্দে ছিলাম। কিন্তু সেখানেও আমি ম্যাচ ধরে ধরে খেলেছি। সেটাই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মানে আপনার খেলায় ‘সুইচড অন-সুইচড অফ’ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ…

আফিফ: হ্যাঁ।

এটা নিশ্চয়ই আপনি করতে করতে অভ্যস্ত হয়েছেন…

আফিফ: এটা অভ্যাসের ব্যাপার। অনেক সময় ভালো খেললে অনেক ভালো কথা আসে। খারাপ খেললে অনেক নেগেটিভ কথা আসে। আমি সব সময় একই রকম থাকতে চাই। ভালো খেললেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। খারাপ খেললেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। এটা মানসিকভাবে আমাকে স্থির রাখতে সাহায্য করে।

একটু পেছনে যাই। আফগানিস্তান সিরিজে মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে ১৭৪ রানের জুটির প্রসঙ্গে আসি। ৪৫ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর এমন একটা ম্যাচ জেতানো জুটি—এটির প্রশংসা হয়তো আপনি সারা জীবনেই শুনবেন।

আফিফ: এটা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ। কারণ, ওভাবে উইকেট পড়ে যাওয়ার পর অনেক রান দরকার ছিল। আমি ক্রিজে এসে প্রথমে উইকেটটা দেখছিলাম। ভাবছিলাম, দেখি কতক্ষণ খেলা যায়। যখন খেলাটা ধরে ধরে কাছাকাছি পর্যায়ে চলে আসে, তখন মনে হচ্ছিল যে নাহ্, জয় সম্ভব। তখন আরও জোর চেষ্টা করেছি উইকেট না দেওয়ার। রান আসছিল। চট্টগ্রামের উইকেট ভালো, আমরা সবাই জানি। শুধু ভাবছিলাম, যেন উইকেট না দিই।

default-image

ওই ম্যাচটা আপনার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের মাত্র অষ্টম ম্যাচ। ভেবেছিলেন, এত তাড়াতাড়ি এমন স্মরণীয় একটা ইনিংস খেলবেন?

আফিফ: আমি আসলে এতটা ভাবি না। ক্রিকেট খেলার সময় ওই নির্দিষ্ট মুহূর্তটা নিয়েই ভাবি, উপভোগ করার চেষ্টা করি। আর কিছু না।

মিরাজের সঙ্গে জুটির রহস্যটা বলুন তো...

আফিফ: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার আগে থেকেই মিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে বোঝাপড়াটা ভালো। অনেক দিন ধরে একসঙ্গে খেলাতে হয়তো খুব ভালো মিলে যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকাতেও আপনাদের দুজনের একটা ভালো জুটি ছিল...

আফিফ: ম্যাচের অবস্থা অনেকটা আফগানিস্তান সিরিজের মতোই ছিল। তাই সেদিনও দুজন মিলে যতটা পারি ব্যাটিং করে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে উইনিং শট খেলার পর আপনি একদমই উদ্‌যাপন করেননি। গত বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে আবার খুব উদ্‌যাপন করেছিলেন। দুই ম্যাচে দুই রকম প্রতিক্রিয়া কেন?

আফিফ: এমন ম্যাচ জিতলে নিজের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করে। কিন্তু আগে যেটা বললাম, খারাপ সময়ে যেমন, ভালো সময়েও তেমন থাকার চেষ্টা করি। যখন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচ জেতানোর পর আবেগ দেখিয়ে ফেলেছিলেন, তখনই ঠিক করেছিলাম, এ রকম ম্যাচ আবার জেতাতে পারলে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করব।

বাকি সবার মতো আমিও তিন সংস্করণের ক্রিকেটার হতে চাই।
আফিফ হোসেন

এটা তো আপনি সচেতনভাবেই করছেন যেন আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে…

আফিফ: হ্যাঁ।

গত এক বছরে বিশ্বের সেরা বোলারদের অনেককেই প্রথমবারের মতো খেলেছেন। স্টার্ক, হ্যাজলউড, রাবাদাদের খেলার আগে আপনার প্রস্তুতিটা কেমন থাকে?

আফিফ: প্রস্তুতিটা স্বাভাবিকই থাকে। নিজে আত্মবিশ্বাসী অনুভব করার জন্য ঠিক যতটা দরকার, ততটুকু প্রস্তুতিই নেই। এর বেশিও না, কমও না। যখন বুঝি যে আমার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট, তখনই ব্যাটিং শেষ করি। আর ওদের মতো বোলারদের খেলার সময় নাম, উইকেটসংখ্যা, কে কেমন—এসব চিন্তা করি না। বরং ভাবি, ওই দিন যদি আমি ভালো খেলতে পারি, তাহলে আমিই দাপট দেখাব। ওই দিন যদি ওই বোলার ভালো করে, আমি চেষ্টা করি তাঁকে ধরে খেলে বাকি বোলারদের দিকে নজর দেওয়ার। আমি এভাবে চিন্তা করি।

মিচেল স্টার্ককে যে ড্রাইভটা মেরেছিলেন (অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে মিরপুরে), তখন কি মনে হচ্ছিল আপনি তাঁর ওপর দাপট দেখাচ্ছেন?

আফিফ: ওই ড্রাইভের আগের তিন-চারটা বল স্টার্ক খুব ভালো করেছিল। একটা খারাপ বল করতেই আমি চার মারি। এটাই ক্রিকেট।

default-image

সেটা নিশ্চয়ই আপনার ক্যারিয়ারের বিশেষ একটা মুহূর্ত ছিল।

আফিফ: হ্যাঁ, কিন্তু সেটা চলে গেছে। আমি সেটা নিয়ে আর ভাবি না। সামনে যেন এমন আরও মুহূর্তের জন্ম দিতে পারি, সেটা নিয়ে ভাবি।

আপনি সাধারণত যে জায়গায় ব্যাট করেন, সেখানে তো একেক সময় ম্যাচের পরিস্থিতি একেক রকম থাকে। এ ক্ষেত্রে আপনি কোন শটটা খেললে মনে হয় যে, দিনটা আপনার হতে পারে?

আফিফ: কোনো বিশেষ শট নেই। উইকেটে আসার পর যদি রান আসে, তাহলেই আমি স্বচ্ছন্দ অনুভব করি। সেটা সেভাবেই হোক। এজ লেগে চার হলেও সমস্যা নেই। রান এলেই হলো।

আপার কাটটা কখন খেলেন—এটা কি এমনিতেই চলে আসে? নাকি আপনি ফিল্ডিং সেটআপ দেখে আঁচ করেন যে বলটা শর্ট হতে পারে, তখন আপনি সিদ্ধান্ত নেন যে আপার কাট করবেন।

আফিফ: বোলার যদি বাউন্সার করে আর ফিল্ডিং যদি ওই শটটা খেলার মতো থাকে, তখন খেলি।

দুই সংস্করণে নিয়মিত হয়েছেন। টেস্টও নিশ্চয়ই খেলতে চান, নিয়মিত হতে চান?

আফিফ: সুযোগ হলে কেন না! বাকি সবার মতো আমিও তিন সংস্করণের ক্রিকেটার হতে চাই।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন