default-image

ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দিয়েছে আয়ারল্যান্ড—একে কী বলা যেতে পারে? এবারের বিশ্বকাপের প্রথম অঘটন? আয়ারল্যান্ডের অভাবনীয় জয় কিংবা ধারাভাষ্যকারদের ভাষায় ইতিহাস সৃষ্টিকারী জয়? নেলসনে আয়ারল্যান্ডের আজকের জয়কে কিছুই নয়, অভিহিত করা যেতে পারে তাদের আর দশটা সাধারণ জয়ের মতোই একটা ঘটনা। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোকে হারানো যে দেশটি অভ্যেসে পরিণত করেছে, সে দেশের একটি জয়কে কোনোভাবেই যে অঘটন বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। আজ নেলসনে কোনো অঘটন ঘটেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩০৪ রানের জবাবে আয়ারল্যান্ড যেন বলে-কয়েই ম্যাচটা বের করে নিয়ে এল। রচনা করল নিজেদের ক্রিকেটে আরও একটি বিখ্যাত মহাকাব্য। 
শুরুর দিন থেকেই একপেশে খেলায় ক্রিকেট রোমাঞ্চ খুঁজে বেড়ানো দর্শকদের বিরক্তিটা খুব স্পষ্ট। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত—প্রতিটি দলই নিজেদের প্রথম ম্যাচ জিতেছে আগে ব্যাট করে স্কোরবোর্ডে ৩০০ কিংবা এর বেশি রান তুলে। আজ প্রথমে ব্যাট করে ক্যারিবীয়রা যখন স্কোরবোর্ডে ৩০৪ রান তুলে ফেলল, তখন অনেকের কাছেই ‘একপেশে’ ফলটা ছিল ব্যাপকভাবেই অনুমেয়। কিন্তু সব অনুমান, ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে দলগত নৈপুণ্যের অসাধারণ প্রদর্শনী দিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম রোমাঞ্চটির জন্ম দিল আয়ারল্যান্ড। ম্যাড়মেড়ে ম্যাচের শঙ্কায় যাঁরা আজ টিভি সেটের সামনে বসেননি, তাঁদেরও একটা বার্তা পেঁৗছে দিল আইরিশরা—আয়ারল্যান্ড মাঠে নামলে যেকোনো কিছুর জন্যই প্রস্তুত থাকুন।
বিশ্বকাপে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো তিন শয়ের বেশি রান তাড়া করে জিতল আয়ারল্যান্ড। আজ থেকে চার বছর আগে বেঙ্গালুরুতে কেভিন ও’ব্রেইনের অনন্য ব্যাটিংয়ে ইংল্যান্ডের ৩২৭ রান তাড়া করে ঐতিহাসিক এক জয় পেয়েছিল তারা। আজ নেলসনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩০৪ রান তাড়া করে জয়ের ব্যাপারটি ক্রিকেটে দেশটির অগ্রগতিরই বিরাট এক প্রমাণ হয়ে থাকছে।
টসে জিতে ফিল্ডিং নিয়েই সবাইকে চমকে দিয়েছিল আয়ারল্যান্ড। ইনিংসের শুরুতেই অবশ্য দারুণ একটি দিনের পূর্বাভাষ পেয়েছিল আইরিশরা। মাত্র ৮৭ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ৫ উইকেট ফেলে দিয়ে আকাশে ভাসছিল দলটি। কিন্তু পঞ্চম উইকেট জুটিতে লিন্ডল সিমন্স ও ড্যারেন সামির ১৫৪ রানের জুটিতে শুরুর ধাক্কা সামলে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সিমন্সের ব্যাট থেকে আসে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি (১০২), সামি করেন ৮৯। এই দুয়ের মিলিত প্রয়াসে স্কোরবোর্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩০৪ রানের সংগ্রহটাকে মোটামুটি নিরাপদই মনে হচ্ছিল। অন্তত, দুটি দেশের তথাকথিত ক্রিকেট ঐতিহ্য বিচার করেই।
কিন্তু অনুমেয় ব্যাপার-স্যাপার উল্টে দেওয়াই যে আইরিশদের অভ্যেস। তিন শয়ের ওপর সংগ্রহ তাড়া করে জেতা যাবে না—এমন ধারণা পাল্টে দিতেই যেন চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় ব্যাট করে গেলেন আইরিশ ব্যাটসম্যানরা। উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড ও পল স্টার্লিং উদ্বোধনী জুটিতেই তুলে ফেললেন ৭১ রান—আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রথম আটে থাকা টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বিপক্ষে সর্বোচ্চ। পোর্টারফিল্ড ২৩ রানে বিদায় নিলেও ব্যাট হাতে স্টার্লিং খেললেন ৮৪ বলে ৯২ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে এড জয়েসকে সঙ্গে নিয়ে স্টার্লিং যোগ করলেন আরও ১০৬ রান। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র আট রান দূরে ফিরলেও স্টার্লিংয়ের ব্যাটেই দারুণ এই জয়ের ভিত্তি খুঁজে পায় আইরিশরা।

স্টার্লিং ৯২ রান করেছেন। এড জয়েস কিংবা নেইল ও’ব্রেইনও কম যান না। ভাই কেভিন ও’ব্রেইন চার বছর আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের নায়ক হয়েছিলেন। আজ নেইল হতে চাইলেন জয়ের আরেক নায়ক। তবে একক নায়ক হতে না পারলেও স্টার্লিং, জয়েসের সঙ্গে দলের জয়ে নেইলের অবদান কিন্তু মাপা হচ্ছে একই নিক্তিতে। জয়েসের ব্যাট থেকে আসে ৮৪ রান। নেইল করেন ৭৯। তৃতীয় উইকেট জুটিতে আরও ৯৬ রান যোগ হলে জয়টাকে দূর-দিগন্ত নয়, দৃষ্টিসীমার খুব কাছেই দেখা শুরু করে আয়ারল্যান্ড।
দল যখন নিশ্চিত জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন হঠাৎই একটু ‘অ্যান্টি ক্লাইমেক্স’। পটাপট পড়ে গেল গোটা তিনেক উইকেট। রোমাঞ্চ-পিয়াসীরা দেখছিলেন, খোঁজ করছিলেন নতুন কোনো রোমাঞ্চের, কিন্তু ততক্ষণে জয়টা যে খুব কাছেই চলে এসেছে আইরিশদের। তাই অ্যান্টি ক্লাইমেক্সের মুখে দাঁড়িয়েও নেলসন মহাকাব্যের ক্লাইমেক্সটা টেনে দিতে খুব একটা দেরি বা ভুল হয়নি নেইল ও’ব্রেইন ও জন মুনিদের।
ক্যারিবীয় বোলারদের জন্য আজ একটা বন্ধ্যা দিনই গেছে। কেমার রোচ, জেরম টেলর, জেসন হোল্ডাররা কেউই সময়মতো আঘাত হানতে পারেননি। উল্টো তাঁদের নিরামিষ বোলিংয়ে আইরিশ ব্যাটাররা নিজেদের ব্যাটিংটা উপভোগ করে যান বেশ নিশ্চিন্ত চেহারাতেই। টেলর ৭১ রান দিয়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট। ক্রিস গেইল ও মারলন স্যামুয়েলস—দুজনই নিয়েছেন একটি করে উইকেট। সূত্র: স্টারস্পোর্টস।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন