default-image

ক্যারিয়ারে একটাই টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। করেছেন মোটে ১৮ রান। এমন একজন ক্রিকেটারকে মনে রাখার কী এমন দায় পড়েছে ইতিহাসের? তাঁর তো বিস্মৃতির ধুলোতেই হারিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু না, ব্র্যানসবি কুপারকে মনে রাখতেই হবে ইতিহাসের। তিনি না থাকলে হয়তো ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা দল অস্ট্রেলিয়ার জন্মের গল্পটাই হতো অন্য রকম। কুপারকে মনে রাখবে বাংলাদেশও। ইতিহাসের প্রথম টেস্টে খেলা বিবি কুপার যে জন্মেছিলেন আমাদের এই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়!
১৮৭৭ সালের ১৫ মার্চ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড। চমকে দিয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। আর সেই দলের মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান ছিলেন কুপার। সাধারণত উইকেটকিপিং করলেও সেই ম্যাচে অবশ্য পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হিসেবেই খেলেছিলেন। যদিও প্রথম ইনিংসে করেছেন ১৫, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩।
অথচ দলের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন ছিলেন নিঃসন্দেহে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের ভিত্তি যখন তৈরি হচ্ছিল, কুপার গেঁথেছেন অসংখ্য অবদানের ইট। এ কারণে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে তাঁরই নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের মনোনয়নের ভিত্তিতেই অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক নির্বাচিত হন ডেভ গ্রেগরি।
এই কুপারের জন্ম হয়েছিল তখনকার ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রধান শহর ঢাকায়। ১৮৪৪ সালে। বাবা হেনরি কুপার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন বড় সাহেব হিসেবে ঢাকায় চাকরি করতে এসেছিলেন। ভারতে তখনো অবশ্য কোম্পানি শাসন চলছে। ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ক্ষমতা নেয়নি। লন্ডনের খুবই নামজাদা পরিবারের সন্তান ছিলেন হেনরি। তাঁর বাবা মানে ব্র্যানসবি কুপারের দাদা ব্লেক কুপার ছিলেন রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলো।

default-image

১৮৪০ সালে হেনরির সঙ্গে বিয়ে হয় ম্যারিঅ্যান সুইনহোর। ধারণা করা হয়, বিয়ের পরপরই তিনি চাকরি নিয়ে চলে আসেন ভারতে। ঢাকায় কোম্পানি সার্ভিসে চাকরি করার সময়ই হেনরির দ্বিতীয় সন্তান ও প্রথম পুত্র হিসেবে জন্ম হয় ব্র্যানসবি কুপারের, ক্রিকেটে যিনি বিবি কুপার নামে পরে পরিচিত হন।
বিবি কুপার নিজেও বেশি দিন ব্রিটিশ ভারতে থাকেননি। চলে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। তবে এই ঢাকায়ই নাড়িপোঁতা আছে তাঁর। ১৮৪৪ সালের ১৬ জুলাই ঢাকারই একটি চার্চে তাঁকে ব্যাপ্টাইজ করা হয়েছিল। এখানেই প্রথম হামাগুড়ি দিয়েছেন, হয়তো হাঁটতেও শিখেছেন। সঠিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও কল্পনা করতে তো ক্ষতি নেই, এই ঢাকারই কোনো একটা প্রাসাদসম বাড়ির ঘাসঢাকা উঠোনে বাবার সঙ্গে প্রথম খেলেছিলেন ক্রিকেট! ঢাকার কোনো নথিপত্রে সেই উঠোন চিহ্নিত করার আর কোনো উপায় নেই।
ইতিহাসের প্রথম টেস্টের পরের বছর অস্ট্রেলিয়া দল প্রথম সফরে আসে ইংল্যান্ডে। কিন্তু সেই দলে রাখা হয়নি ব্র্যানসবি কুপারকে। অথচ কেন্ট বা মিডলসেক্সের হয়ে ইংলিশ ক্রিকেটে খেলার তাঁর যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ইংলিশ কন্ডিশনে কুপার সফলই হতেন। উল্টো আরও একটি আক্ষেপের অধ্যায় যুক্ত হলো কুপারের জীবনে। শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট ক্যারিয়ারটাই শেষ হয়ে গেল। একটা অপূর্ণতা নিয়েই।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তাঁর রেকর্ড আহামরি গোছের কিছু নয়। বরং মনে হবে, ব্যাটসম্যান হিসেবে খুব একটা সুবিধার ছিলেন না বুঝি। ৫০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১৬০০ রান আর ২০.৫১ গড় কিন্তু আদতে শুভংকরের ফাঁকি। শুধু পরিসংখ্যানে খুঁজলে কুপারকে পাওয়া যাবে না, চেনা যাবে না। বোঝা যাবে না ক্রিকেটে তাঁর অবদান।
ক্রিকেট কুপারকে মনে রাখবে ডব্লু জি গ্রেসের সঙ্গে তাঁর অসাধারণ কিছু জুটির রেকর্ডের জন্যও। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে ১৮৬৯ সালে জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ার্সদের ম্যাচে (সে সময় অপেশাদার ক্রিকেটার জেন্টলম্যানদের নিয়ে গড়া দল ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে মুখোমুখি হতো পেশাদার ক্রিকেটার প্লেয়ার্সদের দলের) ডব্লু জি গ্রেসের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটির ২৮৩ রান। ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের এই জুটিতে গ্রেস করেছিলেন ১৮০, কুপার ১০১। যেটি রেকর্ড হিসেবে টিকেছিল পরের ২৩ বছর।
গ্রেসের সঙ্গে এর আগে-পরে আরও কিছু দারুণ জুটি গড়েছিলেন। বয়সে তাঁর চেয়ে চার বছরের ছোট, সে সময়ের তরুণ গ্রেসের প্রতিও তাঁর অবদান আছে, বড় ভাই হিসেবে অনেক সময়ই পথ দেখিয়েছেন সামনে থেকে। এই গ্রেসই কিন্তু পরে আধুনিক ক্রিকেটের জনক হিসেবে বিখ্যাত হন। ক্রিকেটের সেই বিখ্যাত, সুরসিক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক।
১৮৬৯ সালের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে কিছুদিন কাটিয়ে কুপার চলে যান অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানেই থিতু হন। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট তখন একেবারেই হামাগুড়ি দিচ্ছে। ভিক্টোরিয়া আর নিউ সাউথ ওয়েলসই মূলত দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট। আর ভিক্টোরিয়ার ক্রিকেটকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন কুপার। যে গ্রেস একসময় তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন ক্রিকেট মাঠে, তাঁর দলের বিপক্ষেই ১৮৭৩ সালে একটি ম্যাচ খেলেন কুপার। চার বছর পর অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্বে এমসিজিতে সূচনা হয় টেস্ট ক্রিকেটের। ১৫ মার্চ, নিজের ৩৩তম জন্মদিনে টেস্ট অভিষেক হয় কুপারেরও।
কুপার অস্ট্রেলিয়াতেই বাকি জীবন কাটিয়েছেন। মারাও গেছেন সেখানেই। আজ ৭ আগস্ট তাঁর ১০২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘ঢাকার সন্তান’ কুপারকে স্মরণ করাই তো যায়!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0