শ্রীলঙ্কা দল বাংলাদেশ সফরে আসার পর থেকেই রঞ্জনের কথা খুব মনে পড়ছিল। ফোন করব করব করতে করতে শেষ পর্যন্ত তা করলাম গতকাল দুপুরে। বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা প্রথম টেস্টের আগের দিন। বন্ধুর হালহকিকত জানার আগ্রহ তো অবশ্যই একটা কারণ। আরেকটা উদ্দেশ্যও ছিল। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে চরমতম এই দুঃসময়ে এই টেস্ট সিরিজ নিয়ে শ্রীলঙ্কানদের ভাবনা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া।

প্রসঙ্গটা তুলতেই রঞ্জনের ওই দীর্ঘশ্বাস, ‘তুমি তো অনেকবারই শ্রীলঙ্কায় এসেছ। এ দেশের মানুষ ক্রিকেট কেমন ভালোবাসে, এটাও তাই তোমার ভালোই জানা। কিন্তু এখন যে অবস্থা, তাতে আমরা যারা সরাসরি ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত, এর বাইরে আর কেউ ক্রিকেট নিয়ে ভাবছে বলে মনে হয় না। টেলিভিশনে টেস্ট ম্যাচ দেখাবে...কিন্তু সাধারণ শ্রীলঙ্কানরা তা দেখবে বলে আমার মনে হয় না।’

বলতে বলতে কয়েকটা প্রশ্ন করে শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি কতটা জানি, সে ব্যাপারে একটা ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করল রঞ্জন। টেলিভিশনে দেখে, পত্রপত্রিকায় পড়ে যতটুকু জানি, তা বললাম ওকে। শোনার পর রঞ্জন বলল, ‘আসল পরিস্থিতি এর চেয়েও খারাপ। টিভিতে দেখে আর পত্রিকা পড়ে বোঝা সম্ভব নয়, অবস্থা কতটা ভয়াবহ। নিজেরা এই অবস্থায় না পড়লে কারও পক্ষেই আসলে বোঝা সম্ভব নয়।’

শ্রীলঙ্কার এই দলের সব খেলোয়াড়কেই রঞ্জন খুব ভালো করে চেনেন। দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড় অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে উঠে আসা বলে তাঁদের বেশ কয়েকজনকে আবিষ্কারের কৃতিত্বও তাঁর পাওনা। যাঁদের জন্য রঞ্জনের একটু মায়াই লাগছে। দেশের এই অবস্থায় ক্রিকেটে মন দেওয়া কত কঠিন, মায়া এটা ভেবে। ‘দেখো, ক্রিকেটারদের হয়তো আর্থিক কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পুরো দেশ যখন ডুবতে বসেছে, ওরা কি আর স্বাভাবিক থাকতে পারে? মানসিকভাবে ওরা কেউ ভালো নেই। এই অবস্থায় কারও পক্ষেই হান্ড্রেড পার্সেন্ট দেওয়া সম্ভব নয়। আমি তো বলব, এটা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সিরিজগুলোর একটা।’

default-image

বাংলাদেশে পা রাখার পর থেকে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদেরও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। বিপর্যস্ত দেশের মানুষকে একটা ভালো কিছু উপহার দেওয়ার প্রতিজ্ঞার কথা তাঁরা বলছেন বটে, তবে এই সিরিজে কিছু আশা করতেই ভয় পাচ্ছেন রঞ্জন। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটীয় কার্যক্রম যদিও থেমে নেই। গত সপ্তাহে শ্রীলঙ্কাজুড়ে আন্তজেলা অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্ট শুরু হয়ে কারফিউর জন্য তা স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। আগামী সপ্তাহ থেকে আবারও তা শুরু হবে। নির্বাচক হিসেবে রঞ্জনকে মাঠে মাঠে ঘুরতে হবে। এমনিতে তাঁর জন্য দারুণ আনন্দের এই কাজটাতেও যে এখন মন বসছে না, কথার সুরে তা বুঝতে একটুও সমস্যা হলো না।

এই দুঃসময় কবে শেষ হবে, আদৌ শেষ হবে কি না, শ্রীলঙ্কা আবার আগের শ্রীলঙ্কা হবে কি না...এসব বলতে বলতে রঞ্জনের কণ্ঠে বিষাদ চুইয়ে পড়ে। রনিল বিক্রমাসিংহে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর একটু আশার আলো দেখছেন, শ্রীলঙ্কার সব বিরোধী দল তাঁকে সমর্থন দিচ্ছে বলে আরেকটু। কিন্তু শ্রীলঙ্কা যে গর্তে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসাটা যে সহজ নয়, এটাও তো জানেন।

শ্রীলঙ্কায় সাতবার যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমি আমার মুগ্ধতার কথা বলি আর রঞ্জনের দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে বিরতি কমে। কলম্বো টু গল এক্সপ্রেসওয়ে প্রথম দেখাটা কেমন চমক ছিল, সেই ১৯৯৪ সালে কলম্বোর ঝাঁ–চকচকে শপিং মল দেখে আমার কেমন আফসোস হয়েছিল, আমাদের দেশে কবে এমন কিছু হবে...এসব শুনে রঞ্জন বলে, ‌‘১৯৯৪ সালে আমি প্রথম গিয়ে যে বাংলাদেশকে দেখেছিলাম, সেই বাংলাদেশ এখন কোথায় চলে গেছে। আর আমরা কোথায়...এখন আমরা বাংলাদেশের কাছ থেকেও ঋণ নিই।’

শেষ কথাটা বলেই তাঁর মনে হলো, এটাতে না বাংলাদেশের কেউ আবার আহত হয়। যে কারণে বলেন, ‌‘আমি কিন্তু প্রশংসা করেই কথাটা বলেছি। বাংলাদেশ যেন আমাদের মতো ভুল না করে।’

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন