default-image

পুরো নাম কুমার কার্তিকেয়া সিং। ২৭ এপ্রিলের আগেও আইপিএলের খেলোয়াড় তালিকায় ছিলেন না। মুম্বাইয়ের আরশাদ খান চোটে পড়ায় বিকল্প হিসেবে তাঁকে নিয়েছে দলটি। দুই দিন পরই আইপিএল অভিষেক বাঁহাতি লেগ স্পিন করেছেন, করেছেন গুগলি, বাঁহাতি অর্থোডক্স করেছেন, এমনকি ডানহাতি অফ স্পিনারের সম্পত্তি হয়ে ওঠা ক্যারম বলও করেছেন। অথচ ছয় মাস আগেও বাঁহাতি স্পিন ছাড়া কিছুই পারতেন না। শুধু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে বোলিংয়ের সবচেয়ে কঠিন ধরনটা রপ্ত করেছেন।

ক্রিকেটে নিজেকে শাণিত করার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই ১৫ বছরের কার্তিকেয়াকে কানপুর থেকে দিল্লিতে টেনে এনেছিল। নিজের ক্রিকেট–প্রেম পরিবারের জন্য বোঝা হতে না দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে বের হয়েছিলেন ঘর থেকে। প্রাদেশিক আর্মড কনস্টাবুলারির কনস্টেবল পদে থাকা বাবাকে আর্থিক চাপ থেকে বাঁচানোর সে প্রতিজ্ঞা ৯ বছর ধরে পূরণ করে গেছেন। দিল্লিতে চেনাজানার মধ্যে শুধু এক বন্ধু রাধেশ্যাম। লিগ ক্রিকেট খেলা রাধেশ্যাম তাঁকে দিল্লির অনেক একাডেমিতেই নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সব একাডেমিই ভর্তি ফি আর মাসিক বেতন চায়, সেটা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা ১৫ বছরের এক কিশোর কোথায় পাবেন?

এ সময় সঞ্জয় ভরদ্বাজের একাডেমিতে হাজির হন দুজন। প্রথমেই জানিয়ে দেওয়া হয়, এক পয়সাও দিতে পারবে না কিশোর কার্তিকেয়া। ভরদ্বাজ তবু ট্রায়াল দিতে বলেন কার্তিকেয়াকে। মাত্র একটা বল করতে হয়েছিল। ক্রিকইনফোকে ভরদ্বাজ বলেছেন, ‘ওর অ্যাকশন এত নিখুঁত ছিল। ওর আঙুলের ব্যবহার বলকে কথা বলাত।’

কোচিংয়ের ঝামেলা তো মিটল, কিন্তু থাকা-খাওয়া? কার্তিকেয়ার সে ব্যবস্থা হলো গাজিয়াবাদের কাছে মসুরি নামের এক গ্রামে। এক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন ১৫ বছরের কার্তিকেয়া। ভরদ্বাজের একাডেমি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে সেটা। সারা রাত সেখানেই কাজ চলত, তারপর সকালে একাডেমিতে। মাঝেমধ্যে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন কিশোর কার্তিকেয়া। কারণ, হেঁটে গেলে ১০টা রুপি জমত। সে টাকায় এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে ক্ষুধা মেটানো যেত।

default-image

কার্তিকেয়া কাছে কোথাও না থেকে প্রতিদিন এত দূর থেকে কেন আসেন—এ কৌতূহল মেটাতে গিয়েই ভরদ্বাজ আবিষ্কার করেন, এই ছেলেকে সারা রাত এক কারখানায় কাজ করতে হয় এবং এরপর এভাবে একাডেমিতে পৌঁছাতে হয়। নিজের একাডেমির রাঁধুনির সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে দেন কোচ। এখনো তাঁর মনে আছে কার্তিকেয়া প্রথম দিন কী করেছিলেন, ‘রান্নার ঠাকুর যখন ওকে দুপুরের খাবার দেন, কার্তিকেয়া কাঁদতে শুরু করে, সে এক বছর ধরে দুপুরে খায় না!’

এরপরের পথটা মোটামুটি সহজ ছিল কার্তিকেয়ার। বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হলো কার্তিকেয়াকে, স্কুলের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন। দিল্লি অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিডিসিএ) লিগে ৪৫ উইকেট পেয়েছিলেন। তিনটি প্রতিযোগিতায় সেরা ক্রিকেটার হয়েছেন। কিন্তু যখন ডিডিসিএর ট্রায়াল হলো, তখন সেরা ২০০–তেও জায়গা হয়নি।

ভরদ্বাজ এমন কিছু এই প্রথম দেখেননি। গৌতম গম্ভীর, অমিত মিশ্রর সাবেক কোচ তিনি। মিশ্রর ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটেছিল, তখন হরিয়ানায় পাঠিয়েছিলেন শিষ্যকে। কার্তিয়েকাকে পাঠালেন মধ্যপ্রদেশে। সেখানে প্রথম দুই বছরে পঞ্চাশের বেশি উইকেট নিয়ে কোচের মান রেখেছেন কার্তিকেয়া। রাজ্যের ট্রায়াল ম্যাচের সব কটিতেই ইনিংসে অন্তত পাঁচ উইকেট পেয়েছেন। ২০১৮ সালে রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেকও হয়ে গেছে তাঁর। সেবারই প্রথম কার্তিকেয়ার পরিবারের অন্যদের খোঁজ জেনেছিলেন ভরদ্বাজ। ফোনে কথা বলেছিলেন শিষ্যের বাবার সঙ্গে।

default-image

তবু বাড়ি ফেরেননি কার্তিকেয়া। ওই যে নিজেকে তখনো চেনানো হয়নি। নিজেকে শাণিয়ে নেওয়ার প্রতিজ্ঞায় একাডেমিতেই রয়ে গেছেন, নিজের বোলিংয়ের পাশাপাশি বাঁহাতি লেগ স্পিনও রপ্ত করার চেষ্টা করেছেন। ভরদ্বাজ তাই অভিষেকেই কার্তিকেয়ার এমন বোলিংয়ে এতটুকু বিস্মিত হননি, ‘যখন সে সময় পেয়েছে, নেটে বল করেছে। বহুদিন সে ইন্দোর থেকে ম্যাচ শেষে ফিরে রাতে আবার লাইট জ্বালিয়ে নেটে বল করেছে। গত ৯ বছরে ওর ক্রিকেট নিয়ে ঘোর আরও বেড়েছে।’

আইপিএলে এবার প্রায় শেষ দিকে যোগ দিয়েছেন কার্তিকেয়া। প্রথম ম্যাচেই সাফল্যের দেখা মিলেছে। বহু বছর অপেক্ষার ফল পেয়েছেন ভিত্তিমূল্য ২০ লাখ রুপির এই বাঁহাতি স্পিনার। এবার তাই আইপিএল শেষে বাড়ি যাবেন। কোনো সন্দেহ নেই, আগামী বছর আবার ফিরবেন এই মঞ্চে। এক থালা খাবার দেখে কান্নার দিনগুলো সেটা নিশ্চিত করেছে আট বছর আগে!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন