বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তিনে নামা কুমার সাঙ্গাকারার সঙ্গে এরপর জিহান মুবারকের ৪৫ রানের জুটিটা ভাঙলে উইকেটে আসেন ফারভিজ মাহরুফ। সাঙ্গাকারার সঙ্গে মাহরুফের জুটি পঞ্চাশ পেরিয়ে যায়। ৫১ রানে ষষ্ঠ উইকেট হারানোর পর বাংলাদেশের জয়ের আশা হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছিল ক্রমে। শেষ পর্যন্ত সাঙ্গাকারা আউট হয়ে গেলেন, কিন্তু একপাশে মাহরুফ ৭৬ বলে ৩৮ রানে অপরাজিত। কিন্তু দলকে জেতালেন এক মুত্তিয়া মুরালিধরন। তিনি এদিক-ওদিক ব্যাট চালিয়ে ৩৩ রানের এক ইনিংস খেলে শ্রীলঙ্কাকে এনে দেন মহাকাব্যিক এক জয়।

এত দিন পর্যন্ত একটা দিক দিয়ে তাদের সেই জয় অনন্যই ছিল। ত্রিশের কমে পাঁচ উইকেট হারিয়ে আর কোনো দলেরই যে রান তাড়া করে জেতার নজির নেই! লঙ্কানদের পর সেখানে কাল যোগ দিল বাংলাদেশও। ২৮ রানে পঞ্চম উইকেট হারানোর পর ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে মহিমান্বিত ফিরে আসার গল্পটা লেখা হয়েছে আফিফ হোসেন ও মেহেদী হাসান মিরাজ নামের দুই তরুণের হাত ধরেই। আর সেই সঙ্গে ত্রিশ রানের কমে পাঁচ উইকেট হারানোর পরও সফল যে দুটি রান তাড়ার ঘটনারই সাক্ষী হলেন মাহরুফ। একবার খেলোয়াড় হিসেবে, পরেরবার ধারাভাষ্যকার হিসেবে।

default-image

সুনাম কিংবা দুর্নাম যা-ই বলেন, নিরীহ ম্যাচেও উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের তা আছে। এই তো কদিন আগে এক টেস্টে বৃষ্টিতে আড়াই দিনের মতো শেষ হয়ে গেল, তারপরও পাকিস্তানের বিপক্ষে সে টেস্টে বাংলাদেশের হেরে গেল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এ ম্যাচটাও তো ছিল আপাতদৃষ্টিতে পানসে এক ম্যাচ। কিন্তু ২১৫ রানের পুঁজি নিয়েই নেমে ফজল হক ফারুকির বল ঠিকমতো খেলতে না পেরে সেটিই হয়ে গেল বাংলাদেশের জন্য কঠিন এক ম্যাচ।

মাত্র ২১৫ রানের লক্ষ্য—বাংলাদেশ সহজেই জিতবে, এমনটাই ভেবেছিলেন বেশির ভাগই। কিন্তু প্রথম স্পেলেই চারজনকে ফিরিয়ে দিয়ে সেই ‘মাত্র’কেই পাহাড়সম বানিয়ে দিলেন ফারুকি! ৪৫ রানে ৬ উইকেট ফেলে বাংলাদেশকে আঁধারে ডুবিয়ে দেওয়ার যে বন্দোবস্ত, সেটির শুরু তো হয়েছিল তাঁরই হাত ধরে।

এরপর...

default-image

এরপর শুধুই আফিফ আর মিরাজ! সাতে ও আটে নামলেও দুজনেই বেড়ে উঠেছেন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবেই। আর এক উইকেট গেলেই ছিল নিশ্চিতভাবেই ম্যাচ হেরে যাওয়ার যাওয়ার শঙ্কা। আর সামনে রশিদ খান-মুজিব উর রেহমান-মোহাম্মদ নবী স্পিনত্রয়ী, সঙ্গে ফজল হক ফারুকি নামের এক গতি বোলার।

মিরাজ-আফিফ নামের ওই দুই তরুণ আফগান স্পিনত্রয়ীকে সামলেছেন দারুণভাবেই। দুজনেরই রক্ষণব্যূহ যেন ছিল দুর্ভেদ্য! ম্যাচ শেষে আফগানিস্তানের অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ নায়ক শহিদির ‘ওরা দুজন আসলে আমাদের সুযোগই দেয়নি’ কথাটিই তো বুঝিয়ে দেয় কতটা দৃঢ় ছিল তাঁদের রক্ষণ। দ্রুত ৬ উইকেট পড়ে যাওয়াটাই ছিল চাপ। সেই সঙ্গে আস্কিং রানরেট বেড়ে যাওয়ার ব্যাপার। আফিফ-মিরাজ তাই আফগান স্পিনত্রয়ীর সামনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করলেন। রানরেটে চোখ রেখে সেই ভারসাম্যও বজায় রাখলেন।

রশিদ-মুজিবের মোট ৫১ বলে আফিফ ডট দেন ৩২টি, দুজনকেই দুটি করে চারের মারের সহায়তায় তাঁদের থেকে মোট আনেন ৩৪ রান। মোহাম্মদ নবীর সামনে অবশ্য আফিফের সিঙ্গেল বের করাটাও বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২৬ বলে স্রেফ নয় সিঙ্গেলই বের করতে পেরেছেন। বাকি তিন পেসারের ৩৮ বলেই যদিও এনে ফেলেছিলেন ৫০ রান।

default-image

তবে নবীর বলে মিরাজ ব্যাকফুটে থেকে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই খেলেছেন। ৩৪ বলে দুই চারে এনেছেন মোট ২৩ রান। রশিদ-মুজিবকে সমীহ করে গেছেন তিনিও। এ দুজনের ৪৫ বলে এনেছেন মোটেই ১৯ রান। বাকি পেসারদের ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ নিয়েছিলেন মিরাজও, ৪১ বলে এনেছেন ৩৯ রান।

ম্যাচ শেষে আফিফ জানিয়েছিলেন, জেতার চিন্তাটা তাঁরা মাথাতেই আনেননি। জেতার জন্য খেলা, ব্যাপারটা বোধ হয় তাঁদের জানাই আছে। সেটি তাই ছিল অবচেতনেই, আর ছিল পণ, ‘উইকেট দেব না।’

যতক্ষণ ব্যাটিং করা যায়, ততক্ষণ করে যাওয়ার চেষ্টাটাই ছিল আফিফ-মিরাজের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত নাইবকে চার মেরে যখন আফিফ নিশ্চিত করলেন জয়টা, তখন দুজনে মাঠ ছাড়ছেন রেকর্ডবুক ওলট-পালট করে। আটে কিংবা তার নিচে নেমে সফল রান তাড়ায় সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটা হয়ে গেল মিরাজের ৮১ রানের ইনিংসে। আর আফিফের প্রথম ওয়ানডে ফিফটির ইনিংসটা হয়ে গেল সফল সাতে বা এর পরে নেমে চতুর্থ সর্বোচ্চ।

default-image

৪৫ রান বা তার কমে ছয় উইকেট নেই—এমন ম্যাচে লক্ষ্য তাড়া শেষেও উইকেট ওই ছয়টিই থেকেছে, এ ঘটনা গতকালের আগে ঘটেছে মাত্র একবারই। ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডের দেওয়া ৯৪ রানের টার্গেটে অস্ট্রেলিয়া ৩৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল, এরপর ডগ ওয়াল্টার্স ও গ্যারি গিলমোর ৫৫ রানের জুটিতে সে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। আর আফিফ-মিরাজ ৪৫ রানে ষষ্ঠ উইকেট হারানোর পর গড়েছেন অপরাজিত ১৭৪ রানের জুটি। ৪৫ বা তার কম রানে ৬ উইকেট হারানোর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি ওই ওয়াল্টার্স-গিলমোরের ৫৫ রানেরটি, আফিফ-মিরাজের জুটিটিই সবচেয়ে বড় তাই। সে হিসাবে তো আফিফ-মিরাজ স্থান করে নিয়েছেন ইতিহাসেই।

খেলোয়াড় হিসেবে দারুণ এক কামব্যাকের গল্পে অংশীদার হয়েছিলেন ফারভিজ মাহরুফ, ধারাভাষ্যকার হয়ে এবার পেলেন আরেকটি গল্প বলার সুযোগ। নিজের চোখে দেখতে পেরেছেন বলে যেটিতে গর্ববোধ করতেই পারেন। কে জানে, ওই হাততালির যে শব্দ শোনা গিয়েছিল, সেটি হয়তো মাহরুফেরই!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন