default-image

মিরপুরকে পেছনে ফেলে এখন কি তাহলে এক নম্বরে পি সারাভানামুত্তু ওভাল? গত অক্টোবরে মিরপুরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গৌরবগাথা হয়ে ছিল এত দিন। সেটিকে কি পেছনে ফেলে দিল শততম টেস্টের রূপকথা?
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টাও অনেক বড়। ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির এই জোয়ারের দিনেও টেস্ট ক্রিকেটের কৌলীন্যকে সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেয় ক্রিকেটের জন্মদাতা দেশটি। যেকোনো টেস্ট সিরিজের আগে এমন প্রস্তুতি নেয়, যেন বিসিএস পরীক্ষায় বসতে যাওয়া কোনো ছাত্র! সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়, সেটিও প্রথমবারের মতো, মিরপুর চিরদিন আলাদা মহিমা নিয়েই জ্বলজ্বল করবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে।
তারপরও পি সারা ওভালকে এগিয়ে রাখতে চাচ্ছি কেন? কারণ ইংল্যান্ড খেলেছে বিরুদ্ধ কন্ডিশনে। সাম্প্রতিক অতীতে দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে উপমহাদেশের প্রথাগত টার্নিং উইকেট বরাবরই জুজু হয়ে দেখা দিয়েছে ইংলিশদের কাছে। আর ইংল্যান্ড সিরিজে বাংলাদেশ উইকেটও বানিয়েছিল বটে! পারলে যে উইকেট স্পিনাররা সব জায়গায় সঙ্গে করে নিয়ে যান!
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়টা শুরুতেই এগিয়ে যাচ্ছে সেটি দেশের বাইরে বলে। তা দেশের বাইরে এর আগেও তো তিনটি টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। তবে এর কোনোটিতেই প্রতিপক্ষ এমন বলার মতো কোনো শক্তি ছিল না। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি জয় ওদের দ্বিতীয় দলের বিপক্ষে। সেরা খেলোয়াড়দের সবাই ধর্মঘটে যাওয়ায় অনেকে তো ফ্লয়েড রেইফারের সেই দলটিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ‘তৃতীয় দল’-ও বলেন! দেশের বাইরে অন্য জয়টি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।
সেই তিনটি জয়ের সঙ্গে শততম টেস্টের জয়ে ততটাই পার্থক্য, যতটা পার্থক্য সাইবেরিয়া আর সাহারায়। ক্রিকেটে সবচেয়ে কঠিন কাজের তালিকা করতে গেলে শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কাকে হারানো শুরুর দিকেই থাকে। শ্রীলঙ্কা আর আগের শ্রীলঙ্কা নেই, দলটি যাচ্ছে একটা পালাবদলের মধ্য দিয়ে—সবই সত্যি। কিন্তু এই দলটিই দেশের মাটিতে সর্বশেষ সিরিজে ৩-০-তে হোয়াইটওয়াশ করেছে অস্ট্রেলিয়াকে। সেই দলটিকে বাংলাদেশ যেভাবে হারাল, সেটি ইংল্যান্ডকে হারানোর চেয়েও চমকপ্রদ।
১৯১ রান শুনতে এমন কিছু মনে হয় না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শ্রীলঙ্কায় চতুর্থ ইনিংসে এটাই পাহাড় ডিঙানোর মতো। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ দলে যদি রঙ্গনা হেরাথ নামে একজন বোলার থাকেন। এই উপমহাদেশের বাকি দুই দল ভারত ও পাকিস্তানও যেটির প্রমাণ ভালোমতোই পেয়েছে। চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করা শুধু ব্যাটিং দক্ষতারই পরীক্ষা নেয় না, তার চেয়েও বেশি নেয় মানসিক শক্তির। মিরপুরের চেয়ে এখানেও এগিয়ে থাকছে পি সারা ওভাল। মিরপুরে তো বাংলাদেশকে চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করে জিততে হয়নি।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্টে প্রথম জয়। সেটি পি সারা ওভালে এসেছে বলেই তা আরও মধুর। কলম্বোর এই মাঠ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অনেক কান্নার সাক্ষী। বড় এক অপমানেরও। এখানে আগের তিনটি টেস্ট ম্যাচেই ইনিংসে হারতে হয়েছে বাংলাদেশকে। আছে ৬২ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্নও। টেস্ট ক্রিকেটে যা বাংলাদেশের সর্বনিম্ন স্কোর।
মুশফিকুর রহিমের তা ভালোই মনে থাকার কথা। বাংলাদেশের এই দলের একমাত্র তিনিই ছিলেন সেই টেস্টে। ক্যারিয়ারের প্রথম দুটি টেস্ট খেলেছিলেন বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে। ওই টেস্টেই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের ভূমিকায় মুশফিকের টেস্ট অভিষেক। দ্বিতীয় ইনিংসে ৮০ রান করেছিলেন। কিন্তু সেটিকে ছাপিয়ে বড় হয়ে থাকার কথা প্রথম ইনিংসে ৬২ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জা। মুশফিক করেছিলেন ৯, তাতেই সেটি ইনিংসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর! বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে রাজিন সালেহ ছাড়া আর কেউ যে দুই অঙ্ক (২১) ছুঁতে পারেননি। কাল জয়সূচক রানটি মুশফিকের ব্যাট থেকে এলে তাই খুব ভালো হতো! তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ থাকার কথা নয়। দলকে এমন একটা ম্যাচ জিতিয়ে ফিরেছেন, অধিনায়ক হিসেবে আর কী চাওয়ার থাকে!
শততম ম্যাচ একবারের বেশি খেলা যায় না। তবে সুযোগ থাকলে বাংলাদেশ বোধ হয় বারবার তা খেলতে চাইত। শততম ওয়ানডের পর শততম টেস্টেও জয়। দ্বিতীয়টির তুলনায় প্রথমটি ছিল অনেক বেশি উত্সবের উপলক্ষ। বাংলাদেশ যে তখন মাঠে নামে আর হারে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে সেই জয়ের মহিমা হালের ক্রিকেট-দর্শকেরা তাই বুঝতেই পারবেন না। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বরের সেই রাত আরেকটি কারণেও বিখ্যাত হয়ে আছে। সেটি ছিল প্রলয়ংকরী সুনামির সেই রাত। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশের প্রথম বড় জয় দুয়ার খুলে দিয়েছিল আরও অনেক জয়ের। বছর আড়াইয়ের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় আসে। মাঝখানে ভারতের বিপক্ষেও আরেকটি। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সমীহযোগ্য শক্তি হয়ে ওঠার বীজটা কিন্তু পোঁতা হয়েছিল শততম ওয়ানডের ওই জয়েই। আজ থেকে অনেক বছর পর শততম টেস্টের এই জয়টাও কি টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য এমন তাত্পর্য নিয়ে দেখা দেবে?
আশা করতে দোষ কী!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন