শুরুটা বিপিএল দিয়ে। ‘ওঠ ছুড়ি, তোর বিয়ে’ স্টাইলে হয়ে যাওয়া বিপিএলটা একটা উপকার করে গেছে তাঁর, পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ক্রিকেটের প্রথম পাওয়ার হিটিং কোচ জুলিয়ান রসের সঙ্গে। তাঁর টোটকাতেই যেন বদলে গেলেন এনামুল। প্রথমে বিপিএলে রান করলেন ২৮০। তবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগটাই হয়ে গেল দরজা ভাঙার চাবি। এক লিস্ট-এ টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ে ফিরলেন আলোচনায়। এখন তো প্রত্যাবর্তন হচ্ছে টেস্ট দলেই।

default-image

তবে সাদা বলের ক্রিকেটে সাফল্য পেলে কি লাল বলও জলবৎ তরলং হয়ে যায়? এমনিতে হয় না যদিও। এখন যেমন জস বাটলারকে বলা হচ্ছে লিমিটেড ওভারের সেরা ক্রিকেটার, অথচ টেস্ট দলে জায়গা পাকা করার চেষ্টায় খাবি খেয়ে বাদই পড়লেন শেষমেশ। এখনকার সীমিত ওভারের ক্রিকেটের সঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটের চাহিদার তো পুরোই আকাশ-পাতাল ফারাক।

টেস্টের ব্যাকরণ বলছে, হাতটাকে শরীরের কাছাকাছি রাখতে, ‘করিডর অব আনসার্টেইনটি’র বলগুলো তাড়া না করতে, নরম হাতে খেলতে। কিন্তু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির ‘ধরো-তক্তা-মারো-পেরেক’ ব্যাটিং করতে হলে হাতটাকে শরীর থেকে দূরে সরাতেই হবে; ব্যাট সুইংয়ের গতি বাড়াতে হবে, তার জন্য হাতটাকে ব্যাটের সাথে শক্ত করে চেপেও ধরতে হবে। আর এনামুলের জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন হচ্ছে যে ওয়েস্ট ইন্ডিজে, সেখানে টেস্ট খেলা হয় ডিউক বলে। বাংলাদেশের এসজি বলের চাইতে বলটা বেশি নড়াচড়া করে বাতাসে, সুইং করেও অনেকক্ষণ। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের যেই মানসিকতা, সেই আক্রমণত্মক মানসিকতা নিয়ে টেস্টে সফল হওয়াটাও খুব কঠিন।

এতসব প্রতিকূলতা সামলাতে না পেরে সেন্ট লুসিয়া টেস্টে এনামুল যদি তাই ব্যর্থও হন, তাতে ‘গেল, গেল রব’ তুলে ফেলাটা নিতান্তই অনুচিত হবে। শূলে চড়াতে চাইলে বরং তাঁর টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডের রিপোর্ট কার্ড আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো।

***

গেলবার যখন দল থেকে ছিটকে গেলেন এনামুল, তখন তাঁর বিপরীতে অভিযোগ উঠেছিল মূলত দুটি। প্রথমত, তার ফুটওয়ার্ক খুব বাজে। বলতে গেলে পা-ই নাড়ান না। দুই নম্বর, তাঁর স্ট্রাইক বদলানোর সামর্থ্য খুব কম।

একদিনের ক্রিকেটে প্রথম খুঁতটা আদতে কোনো খুঁতই নয়। দুই প্রান্ত থেকে নতুন বল নিয়মের আমদানি হলেও বলটা সুইং করেই বা কতক্ষণ? বলতে গেলে সব দেশের ওয়ানডে পিচই ব্যাটিং-বান্ধব হয়ে গেছে সাম্প্রতিক সময়ে। হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন ভালো হলে রান করাটা তাই মোটেই দুরূহ কোনো কাজ নয়। জায়গায় দাঁড়িয়েই বল খেলা যায় অনায়াসে।

এখনও কি এনামুল বদলেছেন? মাস দুই আগে শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে রেকর্ড ১১৩৮ রান করার পথে এনামুল মেরেছেন ৯৭ চার আর ৪৭ ছয়, অর্থাৎ প্রায় ৫৯ শতাংশ রানই জায়গায় দাঁড়িয়ে। বাকি যে ১০১০ বল, ওই বলগুলোতে নিয়েছেন ৪৬৮ রান।

কিন্তু এখান থেকেই আসছে দ্বিতীয় সমস্যাটার কথা। না দৌড়ে এনামুল আসলে কত রান নিতে পারবেন? কত দ্রুত রানগুলো তুলতে পারবেন? ক্যারিয়ারের শুরুতে যে এনামুলের দেখা মিলেছিল, তিনি প্রথম প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিলেও দ্বিতীয় প্রশ্নে পারেননি। ৩৫ ম্যাচ খেলে তিনটা ওয়ানডে সেঞ্চুরি পেলেও প্রতি ১০০ বলে রান তুলতেন মাত্র ৭০.৭০ করে। এর পেছনে এদিকে-ওদিকে বল ঠেলে এক-দুই রান নিতে না পারার অক্ষমতাই দায়ী ছিল। এখন পর্যন্ত করা ওয়ানডে রানের অর্ধেকই তাই চার-ছক্কা হাঁকিয়ে।

এখনও কি এনামুল বদলেছেন? মাস দুই আগে শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের হিসাব-নিকাশ বের করা যাক। রেকর্ড ১১৩৮ রান করার পথে এনামুল মেরেছেন ৯৭ চার আর ৪৭ ছয়, অর্থাৎ প্রায় ৫৯ শতাংশ রানই নিয়েছেন জায়গায় দাঁড়িয়ে। বাকি যে ১০১০ বল, ওই বলগুলোতে নিয়েছেন ৪৬৮ রান। জটিল প্রশ্নের সরল উত্তরটা তাই এমন, নিজেকে আমূল বদলে ফেলেননি তিনি, তবে নিজের শক্তির জায়গাটাকেই আরও শাণিত করেছেন।

এই শাণিত এনামুল ‘রিভোট্রিল’ হয়ে কাজ করতে পারেন বাংলাদেশের রুগ্ন টি-টোয়েন্টি দলেও। ফরম্যাটটায় ইনিংস উদ্বোধন নিয়ে বাংলাদেশ ঝক্কি পোহাচ্ছে অনেক দিন ধরেই। তামিম ইকবাল নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন এই সংস্করণ থেকে, নাঈম শেখ-মুনিম শাহরিয়াররাও পারেননি যুগের চাহিদা পূরণ করতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজটায় এনামুলের ইনিংস উদ্বোধন তাই নিশ্চিতই। আর তখন চাওয়া থাকবে, ডিপিএলের পারফরম্যান্সেরই যেন পুনর্জাগরণ ঘটে ফের, ইনিংসের শুরু থেকেই স্কোরকার্ডে উঠতে শুরু করে চার আর ছয়। গবেষণায় তো দেখাই গেছে, বাউন্ডারির হিসাবে এগিয়ে থাকা দলগুলোই টি-টোয়েন্টিতে বেশির ভাগ ম্যাচ জেতে!

টি-টোয়েন্টি দলটার সঙ্গে বাংলাদেশের ওয়ানডে দলটার পার্থক্য ঠিক ১৮০ ডিগ্রি উল্টো। তবুও, এই বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে নতুন একটা মাত্রা যোগ করতে পারেন তিনি। তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ওয়ানডে দলটা ইদানীং বেশ ভালোই করছে, এমন সময়ে এনামুলকে নিয়ে এ রকম বক্তব্য যথেষ্টই সাহসী। শক্ত-পোক্ত ব্যাখ্যা দেওয়াটাও তাই জরুরি।

default-image

তামিম-লিটনের ওপেনিং জুটিটা খারাপ করছে না একদমই। এখন পর্যন্ত ৩২ ম্যাচ একসাথে ব্যাট করে তাঁরা দুজনে যোগ করেছেন ১২৫৪ রান। শুধু ইনিংস উদ্বোধনের কথা বললে হিসাবটা ৩০ ম্যাচে ১২১৭ রান। ৪১.৯৬ গড়টাও বেশ ভালো, ছয়টা হাফ সেঞ্চুরি জুটির তিনটাকে আবার রূপ দিয়েছেন সেঞ্চুরিতে। ওই ম্যাচগুলোতে ওভারপ্রতি ৫.৩১ করে রান তুলেছেন। পরিসংখ্যানই ‘শ্লথগতির ব্যাটিং করছেন’ তকমা সাঁটাতে দিচ্ছে না এই জুটির পাশে।

তবে একটু তলিয়ে দেখতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে, পাওয়ার প্লে–তে উড়ন্ত সূচনা এনে দেওয়া বলতে যা বোঝায়, দুজনে মিলে সেই কাজটা করতে পারছেন না ঠিকঠাক। দুজনে মিলে ইনিংসের প্রথম ১০ ওভারে রান তুলেছেন ওভারপ্রতি মাত্র ৪.১৬ করে। তামিম অধিনায়কত্ব গ্রহনের পর ধারাটা বদলেছে—এমন বলার উপায় নেই। রান রেট বেড়ে ৪.৪১ হয়েছে এই ম্যাচগুলোতে, তবে সেটা এখনো ইউটোপিয়ার আদর্শ জগতের মানদণ্ডে পৌঁছায়নি।

অথচ, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের নীলনকশা যদি জানতে চাওয়া হয় তো পাওয়ার প্লে-র বিস্ফোরক সূচনার কথাই বের হবে সবার আগে। নিজেদের খোলনলচে আমূল বদলে ফেলার অংশ হিসেবে এই পরিবর্তনটা তারা জেনে-বুঝেই করেছে। ২০১৫ বিশ্বকাপের ভরাডুবির পরে যে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ চালিয়েছিল তারা, সেখানে উঠে এসেছিল, ইনিংসের শেষ ভাগে দ্রুত রান তোলার ক্ষেত্রে দলগুলোর পার্থক্য ঊনিশ-বিশ, কিন্তু ইনিংসের শুরুতে ধরে খেলার ভাবনা থেকে বেরোতে পারেনি বেশির ভাগ দলই। ইংল্যান্ড দলটা নিশানা তাক করেছিল ইনিংসের ওই পর্যায়টাকে কাজে লাগানোতে। ফলাফল, ২০১৭-১৯ সময়কালে ইংল্যান্ড পাওয়ার প্লে-তে রান তুলেছিল বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গেও ব্যবধান ছিল ১ রানের।

এনামুলকে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট কাজে লাগানোর কথা ভাবতে পারে ঠিক এখানেই। এবারকার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে তাঁর দল প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের যে ১৪ ম্যাচের বল-বাই-বল উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে, সেই ম্যাচগুলোতে এনামুল প্রথম ১০ ওভারে ব্যাট করেছেন ১০১.২ স্ট্রাইক রেটে। সুপার লিগের পাঁচ ম্যাচে গিয়ে সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছে ১০৭.৩। শক্ত দলের বিপক্ষে মরচে ধরে তাঁর ব্যাটে, সেই যুক্তিটাও ধোপে টিকছে না তাই। ‘যাও, গিয়ে মেরে আসো’—মন্ত্র কানে পড়ে দিয়ে এনামুলকে ইনিংসের গৌরচন্দ্রিকা করতে পাঠানো যেতেই পারে।

হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের তফাৎটা গ্রিনল্যান্ড থেকে অ্যান্টার্কটিকার, সেটা মানতেই হবে। এনামুলকে শুরুতে জায়গা করে দিতে কাকে নিচে নামানো হবে, প্রশ্নটাও উঠবে। আবার, বিশ্বকাপ থেকে মাস দশেক দূরত্বে দাঁড়িয়ে এনামুলকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে সেটা বুমেরাং হয়ে ফেরত আসারও ঝুঁকি থাকছে। তবে ছয়টা বিশ্বকাপ তো ঝুঁকি এড়িয়ে খেলার চেষ্টা করা হলো, খুব একটা সুবিধা করতে পারা যায়নি টুর্নামেন্টগুলোতে।

এবার নাহয় ‘হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড’-এর রাস্তাটাই বেছে নিক বাংলাদেশ। কী আছে জীবনে!

পাঠক, খেলা নিয়ে আপনিও কি লিখতে চান প্রথম আলোতে? ক্রিকেট হোক বা ফুটবল, হকি বা টেনিস...যেকোনো বিষয়ে আপনার লেখা পাঠিয়ে দিতে পারেন নিচের ই-মেইল ঠিকানায়: [email protected]
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন