প্রতিটি সিরিজেই এমন ঘটছে। বিসিবি কর্মকর্তারা দুঃখ প্রকাশ করে আশ্বাস দেন ‘ভবিষ্যতে আর হবে না’। তবু আবারও ঘটে একই ঘটনা। কাল যেমন মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বিসিবির মৌসুমি নিরাপত্তাকর্মী আর এক পুলিশ সদস্যের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হলেন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ-এর ক্রীড়া সাংবাদিক মোহাম্মদ সেকান্দার আলী।
ঘটনার পর সাংবাদিকদের সেকান্দার আলী জানিয়েছেন, বেলা ১১টার দিকে বাংলাদেশ দলের অনুশীলন দেখতে তিনি শেরেবাংলা স্টেডিয়াম থেকে ইনডোরের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় তাঁর অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখতে চান নিরাপত্তাকর্মীরা। বিসিবি তখনো দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেয়নি জানিয়ে সেকান্দার নিজের পত্রিকা অফিসের পরিচয়পত্র দেখান। বিসিবির দুই নিরাপত্তাকর্মী তবু তাঁকে ধমকাধমকি শুরু করেন। একপর্যায়ে সেকান্দার আলীকে ধাক্কাও দেন। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক পুলিশ সদস্যও যোগ দেয় তাঁদের সঙ্গে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে বিসিবির নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীদের অসদাচরণ নতুন কিছু নয়। প্রতিবারই এসব অভিযোগ বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস ও নিরাপত্তা পরামর্শক হোসেন ইমামকে জানানো হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত অভিযুক্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি। সে উদাসীনতারই অবধারিত পরিণতি কালকের ঘটনা। মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস অতীতের মতোই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ‘এ ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। ভবিষ্যতে যেন এ রকম ঘটনা আর না ঘটে, আমরা সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।’ নিরাপত্তা পরামর্শক হোসেন ইমামও যথারীতি আশ্বাস দিয়েছেন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার।
অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড নেই বলে যাঁরা সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করলেন, ওই সময় তাঁদের কাছেও বিসিবির নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কোনো পরিচয়পত্র ছিল না। এমনকি ঘটনার পর যখন বিসিবি কর্মকর্তারা তাঁদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার রুমে ডেকে পাঠালেন, তখনো তাঁদের গলায় কার্ড দেখা যায়নি। এসব নিরাপত্তাকর্মীকে বিসিবি কীভাবে নিয়োগ দেয়, নিরাপত্তাসংক্রান্ত কাজে তাদের যোগ্যতা কী, এসব প্রশ্ন অনেক পুরোনো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিরাপত্তার বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর হলেও অভিযোগ আছে, বিসিবি কোনো বাছবিচার না করেই এই কমিটিতে লোক নিয়োগ দিয়ে আসছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব নিয়োগ হয় রাজনৈতিক প্রভাবে অথবা বোর্ড পরিচালকদের ব্যক্তিগত পছন্দে। বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নাকি নিয়োগ দেওয়া হয়। নিরাপত্তার কাজে এই কর্মীদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ যে নেই, সেটি অবশ্য স্বীকার করেছেন জালাল ইউনুস।
সাংবাদিকেরা তো নয়-ই, মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এখন নিরাপদ নন ক্রিকেটাররাও। ভারত সিরিজের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওয়ানডের পর দেখা গেছে, মাঠের ভেতর অন্তত কয়েক শ মানুষ। ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে ক্রিকেটারদের টেনেহিঁচড়ে সেলফি তুলতে বাধ্য করছিলেন তাঁরা। এসব অনাহুতদের দলে অনেক বোর্ড পরিচালকের আত্মীয়স্বজনও ছিলেন। বিসিবির নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের বাধা দেবে কি, উল্টো সাহায্য করছিল! মাঠে সাধারণ দর্শকের প্রবেশাধিকার না থাকলেও যাঁদের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব, তাঁরাই দলে দলে লোক ঢুকিয়েছেন মাঠে। মাঠ আর খেলোয়াড়দের সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে নিজেরাই মেতেছেন সেলফি-উৎসবে। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ছবি তুলতে অনেকে ড্রেসিংরুমে ভিউইং এরিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়লেও তাদের বাধা দেননি নিরাপত্তা কর্মীরা।
কাল টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে মুখ খুললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাও। প্রায় প্রতি ম্যাচের পরই যে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা নিয়ে তাঁর মন্তব্য জানতে চাইলে বলেছেন, ‘শেষ কয়েকটা ম্যাচে দেখেছি, মাঠে অনেক দর্শক ঢুকে গেছে... হয়তো বাইরে থেকে চলে এসেছে। এগুলো আগে কখনো হয়নি। আন্তর্জাতিক ম্যাচে এ রকম হলে বাইরের খেলোয়াড়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। তাদের কাছে মনে হতে পারে, এটা আবার কেমন!’
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম তাহলে এখন ক্রিকেটারদের জন্যও নিরাপদ নয়!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0