ড্রেসিংরুমে মুশফিক যে রকম স্পর্শকাতর চরিত্র হিসেবে পরিচিত, সম্ভাব্য অগ্নিশর্মা চেহারাটা কল্পনা করে তাঁকে এ নিয়ে ঘাঁটানোর কথা নয় কারোই। যে কোনো কিছুতেই তিনি অতিপ্রতিক্রিয়াশীল। মুশফিকের অসময়ে রিভার্স সুইপ খেলা নিয়ে অতীতের প্রশ্নগুলোর মতো তাই এবারেরটিও হয়তো থেকে যাবে দলীয় আলোচনার বাইরে।

বাংলাদেশ দলের সঙ্গে না থাকাদের সুবিধা, তাঁদের সে আগুনে পোড়ার ভয় নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার দুই সাবেক ক্রিকেটার অ্যাশওয়েল প্রিন্স আর নিল ম্যাকেঞ্জি যেমন। দুজনই দুই সময়ে কাজ করেছেন বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে, দুজনই এই সিরিজের শুরু থেকে আছেন সুপার স্পোর্টসের ধারাভাষ্যকক্ষে এবং দুজনই এখন মুশফিক থেকে নিরাপদ দূরত্বে।

ওয়ানডে সিরিজের সময় প্রিন্স-ম্যাকেঞ্জির কথায় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের প্রশংসা শোনা গেলেও কাল মুশফিকের অবিবেচকের মতো আউট হওয়া মেনে নিতে পারছেন না তাঁরাও।

কাল লাঞ্চের সময় মিডিয়া ডাইনিংয়ে প্রিন্সের সঙ্গে দেখা এই প্রতিবেদকের। মুশফিকের ওপর বিরক্তিই ফুটে উঠল তাঁর কথায়। দৃশ্যটা যেন তখনো চোখে ভাসছে তাঁর, ‘খুবই বাজে শট ছিল ওটা। চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন শট। ও দলের সেরা ব্যাটসম্যান, সবচেয়ে অভিজ্ঞ। ও কেন ওই সময় রিভার্স সুইপ খেলবে!’

রিভার্স সুইপ সে ভালো খেলতে পারে, হতে পারে এটা তার প্রিয় একটা শট। কিন্তু আমার প্রশ্ন সময়টা নিয়ে।
বাংলাদেশের সাবেক ব্যাটিং কোচ নিল ম্যাকেঞ্জি

বাংলাদেশের হয়ে মুশফিকের (চলতি পোর্ট এলিজাবেথ টেস্ট সহ ৮০টি) চেয়ে বেশি টেস্ট আর কেউ খেলেননি। টেস্টে মুশফিকের চেয়ে বেশি রান (৪৯৩১) কাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আর কারো নেই। বাংলাদেশের হয়ে ডাবল সেঞ্চুরিও তাঁরই বেশি (৩টি)।

এরকম একজন ব্যাটসম্যানকে টেস্টের ব্যাটিং নতুন করে শেখানোর কিছু নেই। বরং তাঁর কাছ থেকেই অন্যরা শিখবে। কিন্তু বারবার একই ভুল করে অন্যদের কি শেখাচ্ছেন মুশফিক?

টেস্টে রিভার্স সুইপ খেলা যাবে না, এমন কোনো নিয়ম নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরাও কাল এই শট খেলেছেন, ডিন এলগার তো আউটও হলেন রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে। প্রশ্ন আসলে মুশফিকের রিভার্স সুইপ খেলার সময়টা নিয়ে।

কাল ইনিংসের ৬৯তম ওভারে প্রথম বল হাতে নেন সাইমন হারমার। প্রথম বলেই সুইপ শটে চার মেরে মুশফিকের ফিফটি। পরের বলে এলবিডব্লুর আপিল এবং তৃতীয় বলেই আলোচিত রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে মুশফিক বোল্ড।

দল যখন তাঁর কাছে সময় পার করে দেওয়া ঝুঁকিমুক্ত ব্যাটিং দাবী করছিল, ঠিক তখনই উইকেট দিয়ে এলেন মুশফিক!


প্রিন্সের পর মিডিয়া ডাইনিংয়ে দাঁড়িয়ে নিল ম্যাকেঞ্জিও ঠিক এ কথাটাই বললেন, ‘রিভার্স সুইপ সে ভালো খেলতে পারে, হতে পারে এটা তার প্রিয় একটা শট। কিন্তু আমার প্রশ্ন সময়টা নিয়ে।

দলের অবস্থা ভালো ছিল না, লাঞ্চেরও আর অল্প কিছু সময়ই বাকি ছিল। মুশফিকের উচিত ছিল সময়টা পার করে দেওয়া। ওই সময়টা কোনোভাবেই রিভার্স সুইপ খেলার জন্য আদর্শ ছিল না।’

মুশফিক কেন সেটা খেললেন তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও দেওয়ার চেষ্টা করলেন ম্যাকেঞ্জি। কিন্তু সেটি তার নিজেরই মনঃপুত নয়, ‘হতে পারে ফিফটি পেয়ে যাওয়ার পর ও একটু নির্ভার হয়ে গিয়েছিল। অথবা ভেবেছে নতুন বোলারকে চাপে ফেলবে। কিন্তু কোনো যুক্তিতেই ওই সময়ে রিভার্স সুইপ খেলাটা আমার ঠিক মনে হচ্ছে না।’

আরেক ধারাভাষ্যকার সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার মার্ক নিকোলাস তো মুশফিকের আউট দেখে টেলিভিশনেই বলে দিলেন, ‘ও ছেলেমানুষী করল, তাই নয় কি!’


কিন্তু মুশফিকের কানে কথাগুলো বাতাসে ভেসে গেলে তো হবে না, টিম ম্যানেজমেন্টেরই উচিত একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে মুশফিককে তাঁর দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়ে বলা, জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা ‘ছেলেমানুষী’ নয়।

কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার লোক কি বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে আছে?

বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন একজনকে প্রশ্নটা করতেই তিনি কিন্তু কাল ব্যস্ততা দেখিয়ে দ্রুত হাঁটা দিলেন। যেতে যেতে অবশ্য বললেন জানা কথাটাই, ‘মুশফিকের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলা যায় না... ওর সঙ্গে কথা বলা কঠিন।’