default-image

শ্রীলঙ্কান সাংবাদিকেরা রসিকতা করে ম্যাচটিকে বলছেন, ‘শ্রীলঙ্কা বনাম শ্রীলঙ্কা!’
বাংলাদেশ দলের কোচিং স্টাফের তিনজনই শ্রীলঙ্কান। শ্রীলঙ্কা দলের সঙ্গেও যাঁদের যোগসূত্র ছিল। হেড কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সেই যোগসূত্র ছিন্ন হয়েছে প্রচণ্ড অসন্তোষের মাধ্যমে। ট্রেভর বেলিস চলে যাওয়ার পর শ্রীলঙ্কার কোচ হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। ‘এ’ দলের কোচ হিসেবে যে কাজ করেছেন, তাতে সেটি তাঁর প্রাপ্য ছিল বলেও শ্রীলঙ্কান সংবাদমাধ্যমকে একমত দেখলাম। হাথুরুসিংহের তাই শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের ওপর রাগ আছে।
তবে মাঠে তো আর হাথুরুসিংহে খেলবেন না। রাগ-টাগ যা-ই থাকুক, সেটি উগরে দেওয়ার মাধ্যম বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। তবে এটুকু অন্তত নিশ্চিত, এই ম্যাচটাতে বাংলাদেশের হোমওয়ার্কটা নিখুঁতই হওয়ার কথা। শ্রীলঙ্কার এই দলের খেলোয়াড়দের অনেককেই যে হাথুরুসিংহে খুব ভালো করে চেনেন।
তবে হোমওয়ার্ক করলেই তো আর হবে না, পরীক্ষার খাতায় সেটি ঠিকমতো লিখতেও হবে। বাংলাদেশ দলে এ ব্যাপারে আশ্চর্য একটা আত্মবিশ্বাস খেলা করছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ থেকে ১ পয়েন্ট পেয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার পূর্বশর্ত যখন একটি বড় জয় হয়ে গেল, তখন থেকেই কেন যেন শ্রীলঙ্কা টার্গেটে পরিণত।
এই বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে একদমই চেনা যায়নি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হারের পর আফগানিস্তানের বিপক্ষেও জিততে হয়েছে কেঁদে-ককিয়ে। মাহেলা জয়াবর্ধনে আরেকবার তাঁর জাতটা চিনিয়ে না দিলে তো হেরেই বসতে হতো। তবে বিশ্বকাপে পারফরম্যান্স চিন্তা করলে তো ইংল্যান্ডকে হারানোটাকেই বেশি সম্ভব বলে মনে করার কথা। বাংলাদেশ কেন শ্রীলঙ্কাকেই বেশি পছন্দ করছে?
খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে যা বোঝা গেল, বেশি-বেশি খেলার কারণে শ্রীলঙ্কা তাদের খুব চেনা। শ্রীলঙ্কানদের কার কী খেলা, সেটিও মোটামুটি মুখস্থ। তবে এই সুবিধা তো শ্রীলঙ্কারও আছে। গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশ সফরে সব ম্যাচই জিতে এসেছে শ্রীলঙ্কা। সেই স্কোরলাইন অবশ্য ম্যাচগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয় না। একটু এদিক-ওদিক হলেই ওই সিরিজে একাধিক ম্যাচ জিততে পারত বাংলাদেশ।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে খেলার প্রায় দুই দশক পর বাংলাদেশ লঙ্কানদের প্রথম হারাতে পেরেছে। পরের আট বছরে আরও তিনবার সেই স্বাদ পেলেও দুদলের জয়-পরাজয়ের হিসাবটা একেবারেই একতরফা। ৩৭ ম্যাচে বাংলাদেশের জয় মাত্র ৪টি। এক শ্রীলঙ্কান সাংবাদিক এই স্কোরলাইন মনে করিয়ে দিয়ে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসকে প্রশ্ন করলেন, এর পরও কেন শ্রীলঙ্কা এই ম্যাচ জিতবই বলতে পারছে না। ম্যাথুস উত্তর দিলেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রতিক অতীতে খুব ভালো খেলেছে। তার ওপর এটা বিশ্বকাপের ম্যাচ। চাপটা এখানে আলাদা।’

default-image

বিশ্বকাপের ম্যাচ অবশ্য এর আগেও দুটি হয়েছে। চাপ-টাপ যা আছে, তার পুরোটাই যেন বাংলাদেশের ওপর পড়ে চিড়েচেপ্টে দিয়েছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে পিটারমারিজবার্গ তো এখনো দুঃস্মৃতি হয়ে আছে প্রথম ওভারেই ভাসের উপহার দেওয়া দুঃস্বপ্নের কারণে। প্রথম তিন বলেই উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিক। ওই ওভারেই চতুর্থ উইকেট। ২০০৭ বিশ্বকাপেও শ্রীলঙ্কা একই রকম দুর্বোধ্য হয়ে ছিল বাংলাদেশের কাছে। এবার ২ ম্যাচ শেষে শ্রীলঙ্কার চেয়ে ১ পয়েন্টে এগিয়ে থাকা কি মানসিকভাবেও একটু নির্ভার রাখবে বাংলাদেশকে? মাশরাফি বিন মুর্তজা ম্যাচ সম্পর্কে দলের ভাবনাটা এক লাইনেই বলে দিলেন, ‘জয় ছাড়া আর কিছুই ভাবার সুযোগ নেই।’
শ্রীলঙ্কা দলে সবচেয়ে বড় দুটি নাম মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারা। দুজনই বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছুঁতে ছুঁতে হারিয়ে ফেলেছেন। পর পর দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, সে দুটিতে অধিনায়ক আবার তাঁরা দুজনই। ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি জিতেছেন। কিন্তু তাঁরাও খুব ভালো করেই জানেন, মানুষ ওটা খুব বেশি মনে রাখে না। বিশ্বকাপ মনে রাখে এবং সেই বিশ্বকাপ স্মরণীয় করে রাখার শেষ সুযোগ এটাই। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস বলেই দিলেন, ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির মতো বিশ্বকাপেও শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের দুই মহিরুহকে বিদায়ী উপহার দেওয়ার কেমন তাড়না বোধ করছেন দলের অন্য খেলোয়াড়েরা।
সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে এত বড় ব্যাটসম্যান যে, যেকোনো সময়েই পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাঁদের। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বৈরথের দিকে তাকালে এই দুজনের চেয়ে তিলকরত্নে দিলশানকে অনেক বেশি বিপজ্জনক বলে মনে হবে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বশেষ ৮টি ইনিংসে দিলশানের ৩টি সেঞ্চুরি ও ১টি হাফ সেঞ্চুরি।
মাশরাফি বিন মুর্তজার বাবা গোলাম মোর্তজা বিশ্বকাপের খেলা দেখতে গতকাল সকালে মেলবোর্নে পৌঁছেছেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে বলায় নিরাপদ পথে হাঁটলেন, ‘প্রথম দশ ওভার দেখার পর বলতে পারব।’ প্রথম দশ ওভারেই ম্যাচের মীমাংসা? এবার তিনি একটু বিস্তারিত হলেন, ‘জিততে হলে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের রান করতে হবে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে যেমন হয়েছে, তেমন হলে হবে না।’
বিশ্লেষণটা বোধ হয় ঠিকই আছে। তা টপ অর্ডারে কার ওপর ভরসা রাখবেন? তামিম ইকবালের মুখটাই চোখের সামনে ভাসবে সবার আগে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সর্বশেষ ৩টি ইনিংসে ৫০-এর নিচে আউট হননি। এর মধ্যে একবার ফিরেছেন সেঞ্চুরি করে।
কোয়ার্টার ফাইনালের চাবি হাতে এনে দিতে পারে আজকের ম্যাচে জয়। এর বাইরে আরেকটি কারণেও তাৎপর্যময় এই ম্যাচ। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে আজ বাংলাদেশের অভিষেক। তবে ক্যানবেরার মানুকা ওভালকে যেমন মিরপুর বানিয়ে ফেলেছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা, এমসিজিতে বোধ হয় তা সম্ভব নয়। প্রথমত ৯০ হাজার দর্শকের এমসিজির অনেকটাই আজ খালি থাকার কথা। যেটুকু ভরবে, তাতেও শ্রীলঙ্কানদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কলম্বোর পর সবচেয়ে বেশি শ্রীলঙ্কানের বাস নাকি এই মেলবোর্ন শহরেই।
মাঠের খেলার চেয়ে গ্যালারিও আজ কম কৌতূহল জাগানিয়া নয়!

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন