আইপিএলে বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক হিসেবে ব্যর্থ কোহলি
আইপিএলে বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক হিসেবে ব্যর্থ কোহলিছবি: বিসিসিআই

সেই যে ২০১৬ সালে ফাইনাল খেলল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু, এরপর আইপিএল যেন বিরাট কোহলির দলটির জন্য হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্ন। সেবারের পর থেকে এ নিয়ে চারটি আইপিএলের দুটিতে এবি ডি ভিলিয়ার্স-কোহলির দল শেষ করেছে পয়েন্ট তালিকার তলানিতে (২০১৭ ও ২০১৯), মাঝে ২০১৮ সালে শেষ করেছে ষষ্ঠ হয়ে।

আর এবার কোনো রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, রানরেটে এগিয়ে থেকে প্লে-অফে উঠেছিল বটে, কিন্তু কাল সেই প্লে-অফে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে বেঙ্গালুরু।

বিজ্ঞাপন
default-image

হারের পর থেকেই কোহলির অধিনায়কত্ব নিয়ে উঠে গেছে প্রশ্ন। উঠবে নাই–বা কেন? ২০১৩ সালে দলটার অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন কোহলি, এরপর থেকে আট মৌসুমে এ নিয়ে মাত্র তিনবার প্লে-অফে খেলতে পেরেছে বেঙ্গালুরু।

কাল বেঙ্গালুরুর বিদায়ের পর তাই ভারতের সাবেক ওপেনার গৌতম গম্ভীর বলেছেন, বেঙ্গালুরুর উচিত কোহলির বাইরে অন্য কাউকে অধিনায়কত্বের জন্য বিবেচনা করা। গম্ভীরের সঙ্গে একমত আরেক সাবেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান সঞ্জয় মাঞ্জরেকারও।

৫,৬, ৭, ৮—কালকের হারটা বেঙ্গালুরুকে এই সংখ্যাগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বটে। কালকের হারটি এবার আইপিএলে কোহলিদের টানা পঞ্চম, কোহলিরা ম্যাচটা হেরেছেন ৬ উইকেটে। তা নিয়ে এবারের আইপিএলে তাঁদের পারফরম্যান্সটা দাঁড়াল এই—৭ জয়ের বিপরীতে হার ৮টি!

কালকের হার হয়তো বেঙ্গালুরুর ব্যাটিংয়ের পরই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এবি ডি ভিলিয়ার্সের ৫১ রানের সৌজন্যে আগে ব্যাট করা বেঙ্গালুরু করতে পেরেছে মাত্র ১৩১ রান, কেন উইলিয়ামসনের ফিফটিতে লক্ষ্যটা ৬ উইকেট আর ২ বল হাতে রেখেই পেরিয়ে গেছে হায়দরাবাদ।

বিজ্ঞাপন
default-image

আরেকবার ব্যর্থতায় বেঙ্গালুরুর বিদায়ের পর তাই কোহলির দিকেই আঙুল তুলছেন অধিনায়ক হিসেবে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে দুবার আইপিএল জেতানো গম্ভীর।

তিনি বেঙ্গালুরুর ফ্র্যাঞ্চাইজির দায়িত্বে থাকলে অধিনায়ক বদলাতেন কি না—ক্রিকইনফোতে কাল ম্যাচের পর এমন প্রশ্নে গম্ভীরের উত্তর, ‘১০০%! কারণ এখানে সমস্যাটা জবাবদিহিতে। টুর্নামেন্টে (কোহলির অধিনায়কত্বে) আট বছর হয়ে গেল কোনো শিরোপা জেতেনি বেঙ্গালুরু। আট বছর অনেক লম্বা সময়। আমাকে বলুন, আর কোন অধিনায়ক...অধিনায়ক বাদ দিন, কোন খেলোয়াড় আট বছর শিরোপা না জিতে থাকার পরও এভাবে চালিয়ে যেতে পারত! তাই এখানে জবাবদিহি থাকতে হবে। একজন অধিনায়ককে জবাবদিহি করতে হবে।’

কোহলির নিজে থেকেই ব্যর্থতার দায় নেওয়া উচিত বলে মনে হচ্ছে গম্ভীরের, ‘এটা শুধু এক বছরের ব্যাপার নয়। শুধু এই হারের ব্যাপার নয়। বিরাট কোহলির সঙ্গে আমার কোনো ঝামেলা নেই, কিন্তু কোনো একটা সময়ে ওর উচিত হাত উঁচিয়ে বলা “হ্যাঁ, আমিই দায়ী। আমারই জবাবদিহি করতে হবে”।’

সে প্রসঙ্গে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের উদাহরণও টেনে এনেছেন গম্ভীর, ‘আট বছর অনেক লম্বা সময়! অশ্বিনের সঙ্গে কী হয়েছে দেখুন। (কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবে) দুই বছর অধিনায়ক ছিল, শিরোপা জেতাতে পারেনি, তাই ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

ভারত দলে ‘নেতা’দের মধ্যে অন্য যে দুজন এত দিন ছিলেন, আইপিএলে তাঁদের নেতৃত্বের সঙ্গে কোহলির নেতৃত্বের তুলনাও টেনেছেন গম্ভীর, ‘আমরা এম এস ধোনির কথা বলি, রোহিত শর্মার কথা বলি...কিন্তু আমরা কি বিরাট কোহলির কথা বলি? একেবারেই না! ধোনি তিনবার আইপিএল জিতেছে, রোহিত শর্মা চারবার শিরোপা জিতেছে। ওরা সাফল্য এনে দিয়েছে বলেই এত লম্বা সময় দলের অধিনায়কত্বে। আমি নিশ্চিত রোহিত শর্মা আট বছরে কোনো শিরোপা না জিততে পারলে ওকেও সরিয়ে দেওয়া হতো। একেক জনের জন্য সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি তো একেক রকম হতে পারে না!’

বিজ্ঞাপন

কোহলির বেঙ্গালুরু এবারের আইপিএলে প্লে-অফে খেলার যোগ্যও ছিলেন না বলে মনে হচ্ছে গম্ভীরের, ‘আপনি যখন সব প্রশংসা পাবেন, সমালোচনার ভাগও আপনাকে নিতে হবে। আপনি বলে যেতে পারেন না যে “আমরা প্লে-অফে জায়গা করে নিয়েছি” কিংবা “প্লে-অফে খেলা আমাদের প্রাপ্য ছিল”।’ একেবারেই তা ছিল না। আরসিবির (রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু) এবারের প্লে-অফে খেলা প্রাপ্যই ছিল না। সর্বশেষ চার-পাঁচটি ম্যাচ দেখুন...এমনকি মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের বিপক্ষে ওই সুপার ওভারে জেতা (২৮ সেপ্টেম্বর) ম্যাচটাও দেখুন, সেদিনও ওরা ভাগ্যবান ছিল যে নবদীপ সাইনি অত দারুণ একটা ওভার করেছে! এর বাইরে ওদের মৌসুমটা তো খুব একটা ভালো কাটেনি। সেটা ব্যাটিংয়ের দিক থেকেই ভাবুন কিংবা বোলিংয়ের দিক থেকে!’

এবারের আইপিএলে ব্যাট হাতেও সময় ভালো যায়নি কোহলির। ১৫ ম্যাচে করেছেন মাত্র ৪৬৬ রান। এর মধ্যে কাল আবার ওপেনিংয়ে নেমেছেন ভারত অধিনায়ক। কিন্তু আইপিএলে এই মৌসুমে প্রথমবার হঠাৎ ওপেনিংয়ে নামার ফাটকা কাজে লাগেনি, ৭ বলে ৬ রান করে আউট হয়েছেন কোহলি।

তাঁর ওপেনিংয়ে নামা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন গম্ভীর, ‘বিরাট কোহলির ব্যাটিং উদ্বোধন করা নিয়ে কত কথা হয়েছে! কিন্তু আপনি ব্যাটিং উদ্বোধন করতে চাইলে সেটা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই করে আসা উচিত ছিল। আর সে রকম দলও থাকা উচিত ছিল তাদের। বিরাট উদ্বোধন করতে চাইলে সে ক্ষেত্রে নিলামে সে রকম একটা মিডল অর্ডার বেছে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আরেকবার দলটা বলতে শুধু বিরাট আর এবি-ই (ডি ভিলিয়ার্স) ছিল!’

এবারের আইপিএলে কোহলি-ডি ভিলিয়ার্সের বাইরে বেঙ্গালুরুর হয়ে দেবদূত পাডিক্কালই যা আলো ছড়িয়েছেন, ৪৭৩ রান নিয়ে বেঙ্গালুরুর সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ২০ বছর বয়সী ওপেনার। কিন্তু টুর্নামেন্টে পাঁচ ফিফটিসহ ৪৫৪ রান করা ডি ভিলিয়ার্সকেই শুধু আলাদা করে রাখছেন গম্ভীর, ‘এবির মৌসুমটা খারাপ কাটলে কী হতো একবার কল্পনা করুন! ও একাই ওদের সাত জয়ের দু-তিনটি এনে দিয়েছে। আমার মনে হয় না ওরা (বেঙ্গালুরু) গতবার যা করেছে, তার চেয়ে এবার আলাদা কিছু করেছে।’

বেঙ্গালুরু চিরায়ত সমস্যাটাও ধরিয়ে দিয়েছেন গম্ভীর, ‘শুধু আপনি প্লে-অফে খেলতে পেরেছেন, সেটাও আপনার দলের একজনের চোখধাঁধানো ঝলকের কারণে...এর মানে কিন্তু এই নয় যে আপনার দল আইপিএল জেতার শক্ত দাবিদার।’

বেঙ্গালুরুর অধিনায়কত্বে বদলের ব্যাপারে আরেক সাবেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান ও বর্তমানে ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মাঞ্জরেকারও একমত গম্ভীরের সঙ্গে, ‘আপনি যদি পরিস্থিতির বদল চান, ফলে বদল চান, আপনাকে অধিনায়ক বদলাতেই হবে। কিন্তু বিরাট কোহলি নিজে থেকে হাত উঁচিয়ে বলবে, “আমি অধিনায়ক হিসেবে ভালো কিছু এনে দিতে পারিনি”, এটা আমি আশা করি না। এখানে মালিকপক্ষকে কাজটা করতে হবে।’

মন্তব্য পড়ুন 0