default-image

করোনার সংক্রমণ আবারও বেড়েছে। চলতে থাকা তিন ম্যাচের ভারত-ইংল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজে তাই গ্যালারিতে দর্শক ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেও কেউ কেউ নাছোড়বান্দা।

গ্যালারিতে ঢুকতে না দিলেও ক্ষতি নেই। স্টেডিয়ামের বাইরে থেকে খেলা দেখার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন একজন। মাঠের পাশে একটু দূরে থাকা গোরাদেশ্বর পাহাড়ে উঠে যতটা সম্ভব খেলা দেখার চেষ্টা করছেন। তিনি আর কেউ নন, ভারতীয় ক্রিকেটের ‘সুপার ফ্যান’—সুধীর কুমার গৌতম।

সুধীর ভারতীয় ক্রিকেটের পরিচিত মুখ। একসময় পাকিস্তান ক্রিকেটে যেমন ছিলেন ‘জলিল চাচা’, ভারতীয় ক্রিকেটে তেমনি সুধীর—বিশ্বের নানা প্রান্তে ভারতের ম্যাচে গ্যালারিতে দেখা যায় তাঁকে। শাঁখ বাজাচ্ছেন এবং বিরাট কোহলিদের সমর্থন দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

ভারতের ঘরের ম্যাচে তো তিনি নিয়মিত মুখ—দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে ঘরের মাঠে ভারতের খেলা সব ম্যাচে গ্যালারিতে ছিলেন সুধীর।
সুধীরের আরও একটি পরিচয়, শচীন টেন্ডুলকারের অনেক বড় সমর্থক।

ভারতের ম্যাচে দেশের পতাকা এঁকে থাকেন শরীরে। টেন্ডুলকারের ১০ নম্বর জার্সির আদলও শরীরে এঁকে থাকেন সুধীর। এখন অবশ্য দেখা যায় বুকের ওপর ‘মিস ইউ টেন্ডুলকার, ১০’ লেখা, যেহেতু টেন্ডুলকার অবসর নিয়েছেন।

তাতে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতি সুধীরের অকুণ্ঠ সমর্থন কমেনি এতটুকু। ভারত-ইংল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের কথাই ধরুন। পুনেতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ওয়ানডে সিরিজ। সেই ভোররাতে উঠে শরীরে জাতীয় পতাকা আঁকার কাজে লেগে পড়েন সুধীর।

default-image

টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, এ কাজ করতে তাঁর প্রায় সাত ঘণ্টা লাগে। এরপর ছুটে যান মহারাষ্ট্র স্টেডিয়ামে। সেখানে ভারতীয় দলের আগমন সবাই টের পায় সুধীরের শাঁখের আওয়াজে। স্টেডিয়ামে কোহলিরা পা রাখার সময় সুধীরের শাঁখ বাজানোর রেওয়াজ নতুন নয়।

তবে সুধীরের সত্যিকার অভিযাত্রা শুরু হয় এরপরই।

গ্যালারিতে বসে তো আর ম্যাচ দেখা যাবে না। আবার ম্যাচ দেখার একটা ব্যবস্থা না করেও থাকা যাবে না। ভারতীয় দলকে অভিবাদন জানিয়ে সুধীর চলে যান স্টেডিয়াম থেকে দুই কিলোমিটার দূরের গোরাদেশ্বরে।

ভারতে ঐতিহাসিকভাবে জায়গাটা খ্যাতি কুড়িয়েছে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের বহু পুরোনো গুহা ও নানা চিত্রকলা আছে সেখানে। আর আছে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের দেবদেবীর মূর্তি। ভারতের ৪৮ নম্বর জাতীয় মহাসড়ক ধরে মহারাষ্ট্র স্টেডিয়াম থেকে গোরাদেশ্বরের দূরত্ব ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার।

কিন্তু এ পথে যেতে সুধীরের দেরি হয়, তা ছাড়া ব্যক্তিগত কোনো যানবাহনও নেই তাঁর। সময় বাঁচাতে সুধীরকে তাই বেছে নিতে হয় সংক্ষিপ্ত পথ। সুধীর ঢুকে পড়েন বনের মধ্যে। বনের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার পথে সাপখোপের ভয় তো আছেই।

সংবাদমাধ্যমকে সুধীর জানিয়েছেন, সাপ ও অন্যান্য সরীসৃপ প্রাণীর মুখোমুখি হয়েছেন বনে।

বিজ্ঞাপন

টাইমস অব ইন্ডিয়াকে সুধীর বলেন, ‘বনে প্রচুর সাপ আছে। সড়কপথ ধরে যেতে পারি, কিন্তু অনেক সময় লাগে। নিজের কোনো যানবাহনও নেই। এ কারণে বনের পথ ধরে যাই। পাথুরে ও পাহাড়ি পথ ধরে যেতে হয়। বেশ কয়েকবার চোটও পেয়েছি। কিন্তু পাহাড়ের মাথায় ওঠার পর কোনো ব্যথা থাকে না। সেখান থেকে ভারতীয় দলের জন্য জোরে শাঁখ বাজাই।’

সুধীর যেখান থেকে খেলা দেখেন, সেখান থেকে দূরত্বের কারণে খেলা কি আসলেই দেখা যায়? অন্তত খেলোয়াড়দের নড়াচড়া পরিষ্কারভাবে দেখার কথা নয়। তবে স্টেডিয়ামটা দেখা যায়। সন্ধ্যাবাতির (ফ্লাডলাইট) ছটায় স্টেডিয়াম যখন আলোকিত হয়ে ওঠে তখন সুধীরের মনে হয় জীবন সার্থক। যে দলকে নিজের জীবনের ধ্যানজ্ঞান বলে মেনে নিয়েছেন, তাদের খেলা পরিষ্কারভাবে দেখা না গেলেও যেখানে খেলছেন, সেখানকার আলোর রোশনাই দেখতে পারাই তাঁর কাছে অনেক কিছু। ভাবা যায়!

default-image

‘খেলা কিংবা খেলোয়াড়দের এখান থেকে দেখে চিনতে পারি না। তবু এ জায়গাটা ভালোবাসি। শুধু জায়ান্টস্ক্রিনটা দেখা যায়। কেউ বাউন্ডারি মারলে চিৎকার করে সমর্থন দিই’—বলেন সুধীর। তবে বেশি রাত পর্যন্ত সেখানে তিনি থাকতে পারেন না। যেহেতু বনের ভেতর দিয়ে ফিরতে হবে, সাপখোপের কামড় খাওয়ার ভয় থাকে।

কোনো কোনো দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগেই ফিরতে হয় তাঁকে, ‘প্রথম ইনিংসের ৪০ ওভার দেখে ফিরতে হয়। এক বন্ধুর সঙ্গে আছি, সে থাকার ব্যবস্থা করেছে। অনেকে আমাকে গাড়িতে পৌঁছে দিতে কার্পণ্য করে না। ফিরে ম্যাচের বাকি অংশ টিভিতে দেখি।’

একে তো ভারতীয় দলের পাঁড় সমর্থক, তার ওপর টেন্ডুলকারের কোনো ম্যাচ থাকলে সুধীর মোটেও হাতছাড়া করেন না। রোড সেফটি ওয়ার্ল্ড সিরিজ টুর্নামেন্টে ভারতীয় লিজেন্ডসদের নেতৃত্ব দেন টেন্ডুলকার।

রায়পুরে অনুষ্ঠিত এ টুর্নামেন্টে টেন্ডুলকারের জন্য গলা ফাটিয়েছেন সুধীর। সেখানে টেন্ডুলকারের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর ‘ঈশ্বর’-এর সঙ্গে যে কত দিন পর দেখা! সুধীরের খেলা দেখার জন্য টিকিট থেকে অন্য সব ব্যবস্থা যে টেন্ডুলকার করে দেন। বহু বছর ধরেই এমন চলছে। এমনকি ভারত ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের পর ওয়াংখেড়েতে ভারতীয় দলের ড্রেসিংরুমে সুধীরকে নিয়ে গিয়েছিলেন টেন্ডুলকার।

default-image

‘নিজের ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা হওয়ায় খুব ভালো লাগছিল। তিনি আমাকে সমর্থন দেন, সব খরচ মেটান। ভারতের কোনো ম্যাচ থাকলে তিনি বিমানের টিকিট জোগাড় করে দেন। তাঁর ভক্ত হতে পেরে খুব সম্মানিত বোধ করি। রোড সেফটিতে তিনি ট্রফি জেতায় খুব ভালো লেগেছে। হোটেল ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন। সেখানে গিয়ে একটা ছবিও তুলেছি। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরায় কান্না লুকোতে পারিনি।’

করোনা গ্যালারিতে বসে খেলা দেখায় বাধা হয়ে দাঁড়ালেও সুধীরের মতো সমর্থকদের দমিয়ে রাখতে পারেনি, ‘স্টেডিয়ামে যেহেতু ঢুকতে পারি না, তাই গোরাদেশ্বর পাহাড়ে চড়ে প্রিয় দলকে সমর্থন দিই।’

সমর্থক বটে!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন