default-image

ক্রিকেট পুরোপুরিই এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ক্রিকেটের এই মনস্তাত্ত্বিক আবহকে উসকে দিতেই যেন আধুনিক ক্রিকেটে স্লেজিং নামের এক কৌশলের জন্ম হয়েছে। ব্যাট-বলের লড়াইয়ের পাশাপাশি এই স্লেজিং নামের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এখন ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গেই পরিণত। কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নয়, সম্পূর্ণ খেলোয়াড়ি কারণে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরিতেই ব্যবহৃত এই স্লেজিং। ব্যক্তি বিশেষে মাঝেমধ্যে এই স্লেজিং সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্র খেলোয়াড়েরা এই ব্যাপারটির রেশ মাঠেই রেখে আসতে পছন্দ করেন। অনেকেই স্লেজিং বলতে গালিগালাজকে বোঝালেও মাঝেমধ্যে এই স্লেজিং–পাল্টা স্লেজিং কিন্তু খেলোয়াড়দের রসবোধকে সবার সামনে তুলে ধরে। প্রিয় পাঠক, আসুন খেলোয়াড়দের রসবোধের সর্বোচ্চ পরিচিতি তুলে ধরা ক্রিকেট মাঠের চারটি মজার স্লেজিং-ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক

ইয়ান হিলি ও অর্জুনা রানাতুঙ্গা
১৯৯৯ সালে একটি টেস্ট ম্যাচে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে কোনোভাবেই আউট করতে পারছিলেন না অস্ট্রেলীয় বোলাররা। তাঁদের নানা ধরনের ফন্দি-ফিকির পর্যবসিত হচ্ছিল ব্যর্থতায়। বিভিন্ন আঙ্গিকের ‘স্লেজিং’ও চলছিল ফাঁকে-ফোকরে। কিন্তু রানাতুঙ্গা তাঁর স্বভাবসূলভ ঠান্ডা মাথায় সামাল দিয়ে যাচ্ছিলেন সব চাপ। একটা পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে অস্ট্রেলীয় উইকেটরক্ষক ইয়ান হিলি রানাতুঙ্গাকে শুনিয়ে গ্লেন ম্যাকগ্রাকে বলেই বসলেন, ‘ম্যাকগ্রা উইকেটের গুড লেন্থে একটা মারস চকলেটের বার রেখে দাও। কাজে দেবে। শরীরটা দেখছ না!’ বিশাল বপুর রানাতুঙ্গাকে আউট করার একমাত্র পথ যে চকলেটের লোভ দেখানো, ম্যাকগ্রাকে তা-ই বলতে চেয়েছিলেন হিলি।
মার্ভ হিউজ ও জাভেদ মিয়াঁদাদ
১৯৮৯ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট দল অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল। সেবার একটি টেস্ট ম্যাচে কথার লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন পাকিস্তানি ক্রিকেট গ্রেট জাভেদ মিয়াঁদাদ। মিয়াঁদাদ হঠাৎই অস্ট্রেলীয় ফাস্ট বোলার মার্ভ হিউজকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘হিউজ, তোমাকে কেন যেন একটা বিশাল মোটাসোটা বাস কন্ডাক্টরের মতো লাগছে।’ মাথা গরম হিউজ মন্তব্যটি হজম করে ফেললেন ওই সময়ের জন্য। দুই-একটি বল পরেই মিয়াঁদাদকে আউট করলেন হিউজ। এবার হিউজের পালা, মিয়াঁদাদ সাজঘরে ফেরার পথে তাঁকে অতিক্রম করার সময় মন্তব্য শুনলেন, ‘টিকিট প্লিজ।’
সুনীল গাভাস্কার ও ভিভ রিচার্ডস
আশির দশকের শুরুর দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ভারত টেস্ট ম্যাচ। সুনীল গাভাস্কার হঠাৎ করেই ওপেনিংয়ে না নেমে চার নম্বরে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু পরিকল্পনাটি মাঠে মারা গেল যখন ইনিংসের শুরুতেই স্কোরবোর্ডে কোনো রান না তুলেই সাজঘরে ফিরলেন আংশুমান গায়কোয়াড় ও দিলীপ ভেংসরকার। চার নম্বরে ব্যাট করতে চেয়েছিলেন। ইনিংসের প্রথম ওভারেই ম্যালকম মার্শালের মুখোমুখি হতে হলো গাভাস্কারকে। পুরো ব্যাপারটা লক্ষ করে গাভাস্কারকে শুধালেন ভিভ রিচার্ডস, ‘ম্যান...তুমি যে পজিশনেই মাঠে নাম না কেন স্কোরবোর্ড শূন্যই থেকে যায়।’ গাভাস্কারের উদ্বোধনী ব্যাটিংয়ের কথা উল্লেখ করেই রিচার্ডস মূলত এই মন্তব্য করেছিলেন।
শচীন টেন্ডুলকার, অ্যালান ডোনাল্ড ও ডোড্ডা গণেশ
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলে খেলেছিলেন কর্নাটকের মিডিয়াম পেসার ডোড্ডা গণেশ। ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে ভারতীয় দল দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যায়। সেখানে একটি টেস্ট ম্যাচে প্রোটিয়া ফাস্ট বোলার অ্যালান ডোনাল্ড কিছুইতেই আউট করতে পারছিলেন না ১০ নম্বরে উইকেটে আসা গণেশকে। উল্টো ডোনাল্ডের বলে গণেশ বেশ কয়েকটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে মেজাজ সপ্তমে চড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর। উইকেটের অপর প্রান্তে ব্যাট করছিলেন সে সময়কার ভারতীয় অধিনায়ক শচীন টেন্ডুলকার। গণেশকে গালিগালাজ করলেও তাঁর নির্লিপ্ত চেহারা দেখে আরও ফুঁসছিলেন ডোনাল্ড। এমন সময় ডোনাল্ডের মেজাজ আরও খারাপ করে দেন টেন্ডুলকার। খুব ভদ্রভাবে পরিশীলিতভাবে তিনি ডোনাল্ডকে বললেন, ‘অ্যালান তুমি অযথাই পণ্ডশ্রম করছ। গণেশকে গালি দিয়ে কোনোই লাভ নেই। সে কানাড়ি ভাষা ছাড়া কিছুই বোঝে না। আমারই ওর সঙ্গে কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে, আর তুমি ওকে দুর্বোধ্য ইংরেজিতে গালি দিচ্ছ!’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0