বাবরকে রান আউটের চেষ্টা।
বাবরকে রান আউটের চেষ্টা। ছবিঃ এএফপি

পাকিস্তান বলেই হয়তো এভাবে হেরে যাওয়া সম্ভব!

মাত্র ১১৯ রানের লক্ষ্য দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। পাকিস্তানের জন্য এ আর এমন কী—এমনই হয়তো ভেবেছিলেন প্রায় সবাই! কিন্তু এই ম্যাচই অবিশ্বাস্যভাবে জিতে গেছে জিম্বাবুয়ে।

পাকিস্তান দলটা ক্রিকেটে অননুমেয়তার জন্যই বেশি বিখ্যাত। অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ জেতার রেকর্ড যেমন আছে তাদের, তেমন প্রায় জিতে যাওয়ার অবস্থা থেকে হেরে যাওয়ার ‘কীর্তি’ও কম দেখায়নি দলটা। হারারেতে আজ তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে পরেরটাই দেখল ক্রিকেট।

একটা পর্যায়ে ৩ উইকেট ৭৮ রান ছিল পাকিস্তানের, সেখান থেকে ৯৯ রানে অলআউট হয়ে গেছে বাবর আজমের দল! ১৯ রানে ম্যাচটা জিতে সিরিজে ১-১ সমতা ফিরিয়েছে জিম্বাবুয়ে।

টি-টোয়েন্টিতে এটিই পাকিস্তানের সর্বনিম্ন স্কোর নয়। এর চেয়েও কম রানে অলআউট হওয়ার রেকর্ড দলটা গড়েছে আরও পাঁচবার। ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭৪ রানে অলআউট হওয়ার রেকর্ড এখনো টি-টোয়েন্টিতে তাদের সর্বনিম্ন, এর আগে-পরে আশি-নব্বইয়ের ঘরে পাকিস্তান অলআউট হয়েছে আরও চারবার।

বিজ্ঞাপন

প্রতিপক্ষ দলগুলো অবশ্য সেখানে কাগজে-কলমে বেশ ভারী—ওয়েস্ট ইন্ডিজ (৮২ রানে অলআউট হয়েছে পাকিস্তান), ভারত (৮৩), ইংল্যান্ড (৮৯) ও শ্রীলঙ্কা (৯৫)। পাকিস্তানের সঙ্গে জিম্বাবুয়ের পার্থক্য টি-টোয়েন্টিতে কেমন, সেটি বোঝাতে বরং আরেকটা তথ্য কাজে লাগতে পারে, টি-টোয়েন্টিতে দুই দলের ১৬ বারের দেখায় এসে আজই প্রথম পাকিস্তানকে হারিয়েছে জিম্বাবুইয়ানরা।

ইনিংসের ১৬তম ওভারের পঞ্চম বলে লুক জঙ্গের বলে বাবর আজম আউট হওয়ার পরই পাকিস্তানের কী যেন হয়ে গেল! ততক্ষণে অবশ্য এত ছোট লক্ষ্যের ম্যাচটাকেও বেশ ‘সাফল্যের সঙ্গে’ জমজমাট বানিয়ে ফেলেছেন বাবররা। অধিনায়ক ফেরার সময়েই পাকিস্তানের জন্য সমীকরণটা ছিল, ২৫ বলে দরকার ৪১ রান, হাতে আছে ৬ উইকেট।

কিন্তু সমীকরণটা মেলাবে কী, পুরো লেজেগোবরে করে ফেলল পাকিস্তান। পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে আসিফ আলী (৩ বলে ১ রান) ফিরলেন। বাবরের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ২২ রানের জুটি গড়ে বেশ থিতু হয়ে যাওয়া দানিশ আজীজ তখনো ক্রিজে, আসিফ আউট হওয়ার পর ফাহিম আশরাফ এসে ১৮তম ওভারের শেষ পর্যন্ত তবু উইকেটে বাঁধ দিয়েছিলেন।

কিন্তু ওভারপ্রতি ১০-এর বেশি দরকার যখন, সে অবস্থায় মাঝের ১০ বলে দানিশ-আশরাফ মিলে নিলেন মাত্র ৮ রান। ফল? ১৮ ওভার শেষে ১২ বলে ৩২ রান দরকার পাকিস্তানের, হাতে ৫ উইকেট। হার তখনই চোখ রাঙাচ্ছে, কিন্তু সেটি এভাবে হবে, কে জানত!

১৯তম ওভারে ব্লেসিং মুজারাবানি এলেন জিম্বাবুয়ের আশীর্বাদ হয়ে। ওভারে ১২ রান দিলেও তুলে নিলেন আশরাফ-দানিশ দুজনকেই! প্রথম বলেই ক্যাচ আউট আশরাফ। সে সময় স্ট্রাইকে যাওয়া দানিশ দ্বিতীয় বলে চার মারলেও চতুর্থ বলে আউট। হারিস রউফ এসে একটা ছক্কাও হাঁকালেন সে ওভারে।

default-image

কিন্তু ওভার শেষে তখনো সমীকরণ জিম্বাবুয়ের দিকেই হেলে, ৬ বলে পাকিস্তানের দরকার ২০ রান। হাতে ৩ উইকেট, ক্রিজে দুই নতুন ব্যাটসম্যান হারিস (২ বলে ৬) ও উসমান কাদির।

কিন্তু জঙ্গের করা শেষ ওভারে পাঁচ বলের মধ্যেই সব শেষ! একটা রানও হয়নি, পাকিস্তানের উইকেট গেল তিনটি! প্রথম বলে হারিস রউফকে তড়িঘড়ি স্ট্রাইকে আনতে গিয়ে উসমান কাদির রান আউট। কিন্তু হারিস স্ট্রাইকে গিয়েও কোনো লাভ হলো না। পরের দুই বলে রান নিতে পারেননি হারিস। ততক্ষণেই নিশ্চিত, অতিরিক্ত রান না দিলে জিম্বাবুয়ে হারছে না!

পরের দুই বলে পাকিস্তানের লজ্জাই নিশ্চিত করল জিম্বাবুয়ে। পরপর দুই বলে হারিস আর আরশাদ ইকবালকে ফিরিয়ে পাকিস্তানকে অলআউটই করে দিলেন জঙ্গে। ইনিংসে মাত্র ১৮ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন তিনি!

এর আগে লক্ষ্য ছোট বলে দেখেশুনেই শুরু করেছিলেন কদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে শেষ হওয়া সিরিজে আলো ছড়ানো পাকিস্তানের দুই ওপেনার মোহাম্মদ রিজওয়ান ও বাবর আজম। ষষ্ঠ ওভারের প্রথম বলে যখন রিজওয়ান (১৮ বলে ১৩ রান) আউট হয়ে ফিরছেন, তখন পাকিস্তানের স্কোরবোর্ডে রান মাত্র ২১।

বিজ্ঞাপন

আগের পাঁচ ওভারে দুজনের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল, পাকিস্তান কি এই ম্যাচ ইচ্ছা করেই ২০ ওভার পর্যন্ত নেবে! অতি রক্ষণাত্মক হয়ে পড়া রিজওয়ান শেষ পর্যন্ত ষষ্ঠ ওভারের প্রথম বলে লুক জঙ্গের বলটাতে মনোযোগ হারিয়ে ফেললেন। স্লোয়ার বল দিয়ে দিন শুরু করা জঙ্গের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে রিজওয়ান ধরা পড়েন এক্সট্রা কাভারে।

ফখর জামান এসেও পারলেন না, দলকে ৩৭ রানে রেখে ফিরলেন (৭ বলে ২ রান)। হাফিজও একই পথের যাত্রী। ১০ বলে ৫ রান করে হাফিজ যখন ফিরছেন, পাকিস্তানের রান ৩ উইকেটে ৫৬। তার চেয়েও বড় ব্যাপার, ততক্ষণে ইনিংসের ১২তম ওভার শেষ হতে আর এক বল বাকি।

default-image

বাবর আজম তখনো পাকিস্তানের আশা হয়ে ছিলেন, যদিও ফখর আউট হওয়ার পর থেকে তাঁর ব্যাটও যেন চলছিল না! ফখর আউট হওয়ার সময়ে ২২ বলে ৪ চারে বাবরের রান ছিল ২২, হাফিজ আউট হওয়ার সময় তা ৩৬ বলে ৫ চারে ৩৫।

দানিশ ক্রিজে আসার পরও বাবর আক্রমণের দায়িত্ব সেভাবে নিতে পারেননি। চতুর্থ উইকেটে ২৪ বলে বাবর-দানিশের জুটিতে ২২ রান এসেছে কোনো বাউন্ডারি ছাড়াই! এরপর দলকে ৭৮ রানে রেখে বাবর (৪৫ বলে ৪১) যখন আউট হলেন, পাকিস্তানের সামনে তখন কঠিন সমীকরণ। সেটি মেলানোর মতো কেউ ছিলেন না।

টস জিতে জিম্বাবুয়েকে ব্যাটিংয়ে পাকিস্তান নিজেদের ইনিংসের শুরুতেও কি এমনটা ভাবতে পেরেছিল? তিনাশে কামুনহুকামুয়ে (৪০ বলে ৩৪) ছাড়া জিম্বাবুয়ের ইনিংসে তেমন বড় কোনো রান নেই। দুই অঙ্কে গেছেন আরও চারজন, যদিও বিশের ঘর পার করতে পারেননি কেউই।

কিন্তু পাকিস্তানের ইনিংসের গল্পটা তো আরও করুণ। বাবর ছাড়া দুই অঙ্ক পেরিয়েছেন দুজন, এর মধ্যে বিশের ঘর পেরিয়েছেন শুধু দানিশ (২৪ বলে ২২)। কিন্তু ইনিংসে ১০০-র বেশি স্ট্রাইক রেট শুধু একজনের—নয় নম্বরে নেমে ৫ বলে ৬ রান করা হারিস রউফ। জিম্বাবুয়ের সেখানে দুই অঙ্কে যাওয়া তিনজনের স্ট্রাইকরেটই এক শর বেশি।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন