একরাশ হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ছে বাংলাদেশ দল। কাল চট্টগ্রামে।
একরাশ হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ছে বাংলাদেশ দল। কাল চট্টগ্রামে।ছবি: প্রথম আলো
চতুর্থ দিন পর্যন্ত জয়ের অবস্থানে থেকেও কেন পঞ্চম দিনে বাংলাদেশ হেরে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে, সেই কারণ ব্যাখ্যা করেছেন সাবেক বাংলাদেশ অধিনায়ক ও আইসিসির ম্যাচ রেফারি রকিবুল হাসান
default-image

প্রথমে বড় সাধুবাদ জানাতে চাই, অভিনন্দন জানাতে চাই, স্যালুট করতে চাই তথাকথিত ‘কম শক্তিশালী’ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে। টেস্ট ক্রিকেটটা কী, সেটি তারা দেখিয়ে দিল।

আমরা বলি, টেস্ট ক্রিকেট হলো আসল ক্রিকেট। যেখানে দরকার ধৈর্য, সাহস, দক্ষতার। যার সবকিছুই আমি দেখেছি ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই অভিষিক্ত ক্রিকেটার এনক্রুমা বোনার ও ম্যাচের নায়ক কাইল মেয়ার্সের মধ্যে। অসাধারণ পারফর্ম করেছে। যখন জয় তো দূরের কথা, ম্যাচ বাঁচানো সম্ভব কি না, সেটাই নিশ্চিত ছিল না ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য, সেখান থেকে পারফর্ম করেছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে সবাই মনে করেছিল, চা–বিরতির আগে খেলা শেষ হবে।

বাংলাদেশ ম্যাচে গিয়েছিল চার স্পিনার ও এক পেসার নিয়ে। এটা ঠিক হয়নি। দিন শেষে আমাদের ক্ষতিই হলো। সাকিব আল হাসানের সার্ভিস আমরা পেলাম না চোটের কারণে। অন্য তিন স্পিনার যারা আছে, তারাও কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্পিনারদের তুলনায় প্রতিষ্ঠিত স্পিনার।

বিজ্ঞাপন
default-image

একটা ব্যাপার কারও চোখেই পড়ছে না। শীতের সময় খেলা হলে উইকেটে রোলিং করলে উইকেট ফ্ল্যাট হতে থাকে। এই জন্য দেখা গেছে, দ্বিতীয় দিন যেমন বল বাঁক খেয়েছে, তৃতীয় ও চতুর্থ দিন কিন্তু তেমন বল বাঁক খায়নি। বল উঁচু–নিচু হয়েছে কিন্তু এত জোরে বাঁক খায়নি। কারণ, উইকেট ততক্ষণে ফ্ল্যাট হয়েছে। উইকেটে একটু পরিবর্তন এসেছে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, আমরা মনে হয় ওদের প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং দেখে একটু বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। খেলাটা ছিল ওভারের। আমরা ওদের ১১০ ওভারের মতো দিয়েছি ৩৯৫ রানের জন্য। ৪০০ রানও আমরা করিনি। ৩৯৯ আর ৪০০ রানের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য আছে। আমাদের ৪০০ করে আরেকটু খেলে ছেড়ে দিতে পারতাম।

তবু এটাকে আমি বড় কারণ হিসেবে দেখছি না। উইকেটের আশপাশের ফিল্ডাররা অধিনায়ক মুমিনুলকে সাহায্য করেনি। বোলাররা তাকে সাহায্য করেনি। অর্থাৎ বাংলাদেশকে সাহায্য করেনি। ফলে টেস্ট হার নিয়ে চট্টগ্রাম ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। এটাই মূল কারণ।

তাইজুল শুধু বলে একটু বাতাস দিয়েছে। বাকিরা শর্ট বল করেছে। এমন উইকেটে আপনি শর্ট বল করলে ব্যাটসম্যানরা অনেক সময় পায় পেছনে গিয়ে পুল করার। আবার যখন সামনে বল করেছে, এমন জায়গায় ফেলেছে, যেটা ব্যাটসম্যানদের জন্য মারা সহজ। তখন ওরা ওভার দ্য টপ খেলে ছয় মেরেছে।

default-image

মোস্তাফিজ মার খেয়েছে তিনটা সতর্কবার্তার কারণে। এই কারণে তার বোলিংয়ের ছন্দপতন হয়েছে। এরপর সে ইনসুইংটা করতে পারছিল না। কারণ, তাকে ক্রিজের দূরে থেকে বোলিং করতে হচ্ছিল। কাটার করতে বাধ্য হচ্ছিল। ওই বোলিংয়ে রান থামানো যায় কিন্তু উইকেট নেওয়া যায় না। মাঝে মাঝে সে ইয়র্কারের চেষ্টা করেছিল। প্রথম ইনিংসে সাফল্য পেয়েছিল তাতে, কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে যখন চেষ্টা করেছে, ততক্ষণে ব্যাটসম্যানরা উইকেটে থিতু হয়ে গিয়েছিল।

টেস্ট জিততে হলে তো উইকেট নিতে হয়। আমরা সেটা পারিনি। ৪৯ রানে নাজমুল স্লিপে মেয়ার্সের ক্যাচ ফেলেছে। লিটন বোনারের স্টাম্পিং মিস করেছে। এই পর্যায়ে কেন এটা হবে। ওই জায়গায় কিন্তু বেশ কিছু সুযোগ এসেছে। কিন্তু আমরা সেটা ধরতে পারিনি। মোটা দাগে যদি বলতে হয়, বাজে বোলিং, উইকেট বোঝার ব্যর্থতা, একই সঙ্গে বাজে ক্যাচিং। এটা হলো আমাদের দীনতা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কথা যদি বলি, আমার জীবনে এমন দায়িত্বশীল ব্যাটিং আমি দেখিনি। একটা ছেলে নতুন সাঁতার শিখেছে, সেই কিনা সমুদ্রে সাঁতরে সোনা জিতল! মেয়ার্সের ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাস, শান্ত মনোভাব—সবই ছিল অসাধারণ। ম্যাচ শেষে সে শুধু মুচকি হাসছিল। একদম বালকসুলভ হাসি।

কাল এক ইনিংসের মধ্য দিয়ে একজন টেস্ট ক্রিকেটার জন্ম নিল। বোনারও তা-ই। দুটি জুটি আমাদের ম্যাচ থেকে ছিটকে ফেলেছে। প্রথমে বোনার ও পরে দা সিলভা। আমরা চার দিন নিয়ন্ত্রণ করেছি খেলাটাকে। কিন্তু শেষ দিনেই হেরে গেছি আমরা।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন