বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই কাজ বলতে যত সহজ, করতে তত কঠিন। সুনীল গাভাস্কারের একটা কথা থেকে বুঝে নেওয়া যায়, ‘...এমনকি একটা হাফ ভলি ডেলিভারিকেও ফাঁকা জায়গা দিয়ে মারতে হয়।’

ক্রিজে ‘কচ্ছপকামড়’ দিয়ে পড়ে থাকার ব্যাটিংও ঠিক তেমন—প্রতিটি রক্ষণাত্মক খেলায় চাই পূর্ণ মনোযোগ, বলের গতিবিধির শেষ পর্যন্ত চোখ রাখতে হয়; ব্যাটিংয়ে সম্ভবত এ কাজটাই সবচেয়ে কঠিন। আর এই কঠিন কাজকে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে এমনভাবে প্রতিফলন ঘটালেন, যেন ঠুক ঠুক ব্যাটিং সবাই গুলে খেয়েছেন, কী আশ্চর্য!

default-image

আশ্চর্য না হয়ে উপায়ও নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা কথা প্রচলিত, ব্যাটসম্যানরা টেস্ট ও টি–টোয়েন্টি খেলেন ওয়ানডে মেজাজে—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উঠে আসার সময় ঘরে ৫০ ওভার ক্রিকেটের শিকড় গেড়ে বসার প্রতিফলন হয়তো!

সে যা–ই হোক, আরও দুটো কথা প্রচলিত—দেশের মাটিতে ব্যাটিংয়ে বজ্র আঁটুনি (হাল সময়ে সেখানেও ঘাটতি) থাকলেও বিদেশে ফস্কা গেরো। আর এই গেরো খুব সহজেই প্রতিপক্ষের বোলাররা খুলে ফেলেন টপ অর্ডারদের ধারাবাহিক ব্যর্থতায়। এবার কি টপ অর্ডারের চাপ কিছু টের পাওয়া গেল!

এই তো নভেম্বর–ডিসেম্বেরই ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ দুই টেস্টে চরম ব্যর্থ ছিল টপ অর্ডার। দলও দুটি ইনিংসে অলআউট হয় ৩২ ও ৫৬.২ ওভারের মধ্যে।

বিদেশের মাটিতে টপ অর্ডারের (প্রথম তিন) সম্মিলিত ২৭.৬৭ ব্যাটিং গড়ও সাদমান ইসলাম, মাহমুদুল হাসান ও নাজমুল হোসেনের পক্ষে ছিল না। আর পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ দুই টেস্টে কোনো ইনিংসেই ওপেনিং জুটি টেকেনি ৫ ওভারের বেশি। শেষ দুই টেস্টে সাদমানের স্কোর ১৪, ১, ৩, ২ আর মাহমুদুলের ০ ও ৬—তাঁর আবার অভিষেক টেস্ট!

কিন্তু নিকটতম অতীতের এই দুঃস্বপ্ন নিয়ে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে প্রথম ইনিংসে ১৮.১ ওভার পর্যন্ত ব্যাট করেছে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি। রান উঠেছে ৪৩। ১০৯ বলের এই জুটির একটা তাৎপর্য আছে। নিউজিল্যান্ডে তামিম ইকবাল অংশ নন এমন কোনো ওপেনিং জুটিতেই বাংলাদেশ এত বেশি বল খেলতে পারেনি।

default-image

৩২ বছর বয়সী তামিম যদি এখন শেষের লগ্ন দেখে ফেলেন, তাহলে এই তারুণ্যের জমাট জুটিটা বেশ আশা জোগাতে পারে। বিশেষ করে মাহমুদুল হাসান। সাদমানের ধরনটা এত দিনে জানা হয়ে গেলেও মাহমুদুল সত্যিই চমকে দিয়েছেন।

ক্যারিয়ারে মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা মাহমুদুলের মধ্যে একটা আলাদা কিছু আছে। ব্যাটিংয়ের ঢংয়ে বাংলাদেশের চিরায়ত ওপেনারদের তুলনায় একটু আলাদা। বাংলাদেশের ওপেনাররা সাধারণত বল ছাড়তে অনভ্যস্ত।

কিংবা ছাড়তে গিয়ে অফ স্টাম্পটা কোথায় ভুলে যাওয়ার খেসারত দিতে হয়। ট্রেন্ট বোল্ট, টিম সাউদি ও কাইল জেমিসনের মতো সুইংনির্ভর পেসারদের বিপক্ষে মাহমুদুলকে মোটেও নড়বড়ে মনে হয়নি। অন্তত বল ছাড়ায়।

অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে অযথা খোঁচা মেরে বসার প্রবণতাও দেখা যায়নি। দুটি বিষয় সফলতার সঙ্গে করতে পারলে আর স্টাম্পের বল ব্যাটের নিচে খেলতে পারলে ওপেনারদের কাজটা সহজ হয়ে যায়। মাহমুদুল ঠিক এই কাজ করেই এখন নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সর্বোচ্চ বল খেলা বাংলাদেশি ওপেনার।

বাংলাদেশ দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ করার পরই রেকর্ড হয়ে গিয়েছিল। ২১১ বলে ৭০ রানে অপরাজিত ছিলেন মাহমুদুল। আজ তৃতীয় দিনে তাঁকে ঘিরে আশাটা আরও বড় ছিল। কিন্তু ওই যে রক্ষণাত্মক খেলা সহজ না, মনোযোগে একটু চিড় ধরলেই সর্বনাশ।

default-image

তৃতীয় দিনে আরও ১৮ বলে ৮ রান যোগ করে নিল ওয়াগনারের অফ স্টাম্পের বাইরের বল কাট করতে গিয়ে মাহমুদুল আউট। আগে আরও দুবার ওভাবে খেলার চেষ্টা করেছিলেন।

ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট ফিল্ডার দাঁড়িয়ে থাকলেও ফাঁদটা তখন বুঝতে পারেননি।

কিন্তু তাঁর ২২৮ বলে ৭৮ রানের এই ইনিংস নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওপেনারদের চিরায়ত সমস্যা সমাধানে নতুন এক দিগন্তের উন্মোচন করেছে। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে এত দিন অন্তত ২০০ বল খেলা কোনো ওপেনার ছিল না বাংলাদেশের। এর আগে ২০০৮ সালে ডানেডিন টেস্টে সর্বোচ্চ ১৪৪ বল খেলেছিলেন জুনায়েদ সিদ্দিকী।

এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ তামিম ইকবালকে এক পাশে রেখে গায়ের পোশাক বদলানোর মতো ওপেনার পাল্টালেও দুই শ বল খেলার নজির গড়লেন ২১ বছর বয়সী এক আনকোরা তরুণ। অথচ এই নিউজিল্যান্ডের উইকেট ও কিউইদের পেস ‘চতুষ্টয়’ নিয়ে কারও ভয়ের অন্ত নেই। শুধু একটা পরিসংখ্যানেই তা বোঝানো যায়।

নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ভারতের ডাকাবুকো ব্যাটিং লাইনআপে ওপেনারদের সম্মিলিত ব্যাটিং গড় (৩২.৩৪) কিন্তু বাংলাদেশের ওপেনারদের চেয়ে কম (৩৪.৫৬)। যদিও সেখানে টেস্ট ম্যাচ খেলার সংখ্যা এখানে একটি বিষয়। তবু কাজটা যে কঠিন, তা স্পষ্ট।
মাহমুদুলের এই বয়সে অমন ‘কচ্ছপকামড়’ ইনিংসে তাঁকে পরিসংখ্যানের আরেকটি পাতায় জায়গা করে দিয়েছে। মাহমুদুলের বয়স আজ ২১ বছর ৫১ দিন।

default-image

নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ২২ বছরের কম বয়সী ওপেনারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বল খেলেছেন মাহমুদুল। ২০১৬ সালে হ্যামিল্টন টেস্টে ২০ বছর ৩৪৯ দিন (যেদিন ম্যাচ শুরু হয়) বয়সে ২৩৮ বলে ৯১ রান করেন পাকিস্তানি ওপেনার সামি আসলাম।

টেস্টে বাংলাদেশের কোনো ওপেনার অন্তত দুই শ বল খেলবেন, তা ভাবতেই অন্য রকম লাগে। কারণ, এই নজির খুব বেশি নেই। ২২ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এমন নজির মাত্র ১২ বার, দেশের বাইরে ৪।

এর মধ্যে তামিম একাই এমন নজির গড়েছেন চারবার, জাভেদ ওমর তিনবার, ইমরুল কায়েস দুবার, মেহরাব হোসেন ও নাফিস ইকবাল একবার করে। সাত বছর আগে খুলনায় তামিম ও ইমরুলের সেই ২৭৮ ও ২৪০ বলের ইনিংসের পর মাহমুদুলের কল্যাণে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো ওপেনারের কাছ থেকে দুই শর বেশি বল খেলতে দেখা গেল।

বিদেশের মাটিতে দেখা গেল এক যুগেরও (১৩ বছর) বেশি সময় পর। ২০০৯ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৪৩ বল খেলেছিলেন তামিম, তারপর এই প্রথম মাহমুদুল। শুরুতে বলা হচ্ছিল ওপেনারদের চাপের কথা। গত দুই বছরে ঘরের বাইরে বাংলাদেশের কোনো ওপেনারই দুই শ বলের ইনিংস খেলতে পারেননি। এমনকি তামিমও না।

default-image

আর যদি পুরো ব্যাটিং অর্ডার বিবেচনা করা হয়, তাহলে এ সময়ে পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে দুই শ বল খেললেন মাহমুদুল।

উদ্বোধনী জুটিতে কেউ জমে গেলে মিডল অর্ডারের জন্য কাজটা সহজ হয়ে যায়। মাহমুদুল এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে পথটা দেখিয়ে দেওয়ায় সে পথেই হেঁটেছেন নাজমুল, মুমিনুল ও লিটনরা।

মুমিনুল যেমন বিদেশের মাটিতে খেলেছেন নিজের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বলের ইনিংস। লিটন আজ অবশ্য ছাপিয়ে গেছেন নিজেকেই। গত বছর হারারে টেস্টে ১৪৭ বল খেলেছিলেন লিটন। সেটা বিদেশে তাঁর সর্বোচ্চ বল খেলার ইনিংস ছিল—কারণ, আজ ৮৬ রানের পথে তিনি খেলেছেন ১৭৭।

প্রশ্ন হলো, বল খেলার এই হিসাবটা কেন? শুধু টেস্ট ক্রিকেট বলেই না, টপ অর্ডারের ক্রমাগত ব্যর্থতা ও বিদেশের মাটিতে বাজে ব্যাটিংয়ের দুর্নাম ঘোচানোর একটা চেষ্টা ছিল ব্যাটসম্যানদের মধ্যে।

সে কাজে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা আপাতত ভালোই সফল। বিদেশের মাটিতে নিজেদের টেস্ট খেলার পরিসংখ্যানে এরই মধ্যে এক ইনিংসে তৃতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক (১৫৬) ওভার খেলার নজির গড়েছে বাংলাদেশ।

২০১৩ সালে গল টেস্টে বাংলাদেশের ১৯৬ ওভার খেলার ইনিংসই সর্বোচ্চ। কাল ভোরে মেহেদী হাসান মিরাজরা কি এই চূড়াও টপকে যেতে পারবেন? না পারলেও ক্ষতি নেই। টেস্টটা অন্তত ড্রয়ের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা তো ফুটে উঠেছে। বিদেশের মাটিতে সেটাই বা কম কী!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন