default-image

ক্রিস গেইলের তাও একটা ব্যাখ্যা মেলে। গায়ে অসুরের শক্তি, প্রকৃতিদত্ত টাইমিং—আর যা যা আছে, সেসবেরও ক্রিকেটের প্রথাগত সমীকরণের সঙ্গে একেবারে আড়ি নয়। কিন্তু এবি ডি ভিলিয়ার্স তো ব্যাটিং-ব্যাকরণকে কখনো নদীতে, কখনো বা সাগরে ছুড়ে ফেলছেন। হার্ডহিটার ক্রিকেট কম দেখেনি, উদ্ভাবনী চিন্তার প্রকাশও কম নয়। তবে এবি ডি ভিলিয়ার্সের মতো দুটিকে মিলিয়ে ব্যাটিংকে এমন যা ইচ্ছে তাই করার ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলতে কি কেউ পেরেছেন এর আগে? সংশয় জাগে!
ওয়েস্ট ইন্ডিজের আগের ম্যাচেই ক্রিস গেইল বিশ্বকাপে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। মাস খানেক আগে এবি ডি ভিলিয়ার্স দুমড়েমুচড়ে দিয়েছেন ওয়ানডেতে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটিকে। কাল সিডনিতে মুখোমুখি দুজন। ব্যাটে আগুনের ফুলকি তাই প্রত্যাশিতই ছিল। তবে জোহানেসবার্গের সেই দিনটির মতো কালও সেটি শুধু এবি ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটেই। জোহানেসবার্গে ডি ভিলিয়ার্সের প্রলয় নাচনের অসহায় সাক্ষী ক্রিস গেইল। সিডনিতেও গেইল কাল অসহায় দর্শকের ভূমিকায়।
ডি ভিলিয়ার্সের তাণ্ডবের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে একমাত্র গেইলেরই আছে। জোহানেসবার্গের মতো সিডনিতেও তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের শুরুটা দেখতে উন্মুখ হয়ে ছিলেন সবাই। কিন্তু ইটের জবাবে পাটকেল দূরে থাক, একটা নুড়ি পাথরও ছুড়তে পারেননি গেইল। জোহানেসবার্গে করতে পেরেছিলেন ১৯ রান, কাল মাত্র ৩।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে মোটামুটি হার মেনে মার্টিন ক্রো এখন শেষদিনের অপেক্ষায়। কিন্তু ক্রিকেটীয় চিন্তাভাবনায় আগের মতোই ধারালো ১৯৯২ বিশ্বকাপের ট্র্যাজিক নায়ক। ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার নিঃসহায় আত্মসমর্পণের পর ক্রিকেটের সবচেয়ে নামী ওয়েবসাইটে এবি ডি ভিলিয়ার্সকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন ক্রো। বিশ্বকাপের আগে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন বলে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। সেই দায় থেকেই বোধ হয়। সেই চিঠিতে দলকে জাগিয়ে তুলতে ডি ভিলিয়ার্সের করণীয় পয়েন্ট ধরে ধরে বুঝিয়ে বলেছেন ক্রো। ডি ভিলিয়ার্স তা পড়েছেন কি না কে জানে। তবে তাঁর ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছে, যা করার নিজেই করে ফেলবেন সিদ্ধান্ত নিয়েই যেন নেমেছিলেন মাঠে।
এবি ডি ভিলিয়ার্সে আমোদিত বিশ্বকাপ এই ম্যাচ শেষ হতে না হতেই প্রহর গুনতে শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের ম্যাচের। তাসমান সাগরের এপার-ওপারের দুই দেশের ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া বা ভারত- পাকিস্তানের মতো মহিমান্বিত নয়। তবে একটু রেষারেষি তো সব সময়ই ছিল। এবার যাতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। যৌথ স্বাগতিক, সাম্প্রতিক ফর্মের বিচারে অস্ট্রেলিয়ার মতো নিউজিল্যান্ডও শিরোপার সমান দাবিদার। তবে এই বিশ্বকাপের যে স্বভাবচরিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে জমজমাট একটা ম্যাচের প্রত্যাশা মিটবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয়। মিটলে তা হবে আনন্দদায়ী ব্যতিক্রম।
এই বিশ্বকাপের অদ্ভুত এক খামখেয়ালি আপনার চোখেও না পড়ে পারেই না। একটু খেয়াল করে দেখুন, সমাপ্তির বিচারে স্মরণীয় ম্যাচগুলো খেলছে ছোট দলগুলো। আয়ারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড বিনোদনের পসরা সাজিয়ে বসেছে আর টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো একের পর এক উপহার দিচ্ছে একতরফা ম্যাচের বিরক্তি। উদ্বোধনী দিনে নিউজিল্যান্ড-শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে শুরু। পরদিন মহাপ্রতীক্ষিত ভারত-পাকিস্তানও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির অনেক আগেই আসলে শেষ। ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে ১৩০ রানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়া তো তিন দিনে টেস্ট ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার সমতুল্য। সমস্যা হলো, তা হলে কাল সিডনিতে যা হলো, সেটিকে কী বলবেন? ওয়ানডেতে ২৫৭ রান যেখানে লড়াই করার মতো স্কোর বলে বিবেচিত, সেটিই কি না দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রানের পার্থক্য!
এই বিচারে তো গত পরশুর শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ ম্যাচকেও যথেষ্টই ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ বলতে হয়! বাংলাদেশ তো ‘মাত্র’ ৯২ রানে হেরেছে। তবে তা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে হতাশা যে প্রায় ক্ষোভে পরিণত, সেটির কারণ বাংলাদেশের যাচ্ছেতাই ফিল্ডিং। তিলকরত্নে দিলশান এর চেয়ে ভালো বোলিংকেও অনেকবারই ধ্বংস করেছেন। কুমার সাঙ্গাকারা তো সমকালীন ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে মহাকালের আয়নাতেও ‘গ্রেট’দের সারিতে স্থান পাওয়ার দাবিদার। এঁরা দুজন শেষ ১০ ওভারে ১১৫ রান তুলতেই পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিজেদের কাজগুলো তো ঠিকঠাক করতে হবে। স্কুল ক্রিকেটের মানেও সহজ দুটি ক্যাচ ছাড়া, সঙ্গে ছন্নছাড়া ফিল্ডিং বাংলাদেশ দলের অনুশীলন ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, এ নিয়েও কারও কারও মনে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
সেই প্রশ্নটা শোভনভাবে কেউ করতেই পারেন। কিন্তু কাল মেলবোর্নের এক মসজিদে জুমার নামাজের পর অধিনায়ক মাশরাফির ওপর রীতিমতো চড়াও হলেন এই প্রশ্নে পীড়িত এক প্রবাসী। অশোভন ভাষায় মাশরাফিকে আক্রমণের একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে বলেও খবর ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার মাহবুবুর রহমান অবশ্য জানালেন, ব্যাপারটা কথা-কাটাকাটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং মাশরাফির কোনো দোষ নেই। ফোনে যোগাযোগ করলে মাশরাফি ঘটনার যে বর্ণনা দিলেন, সেটি তাঁর ভাষায়ই তুলে দেওয়া যাক, ‘নামাজ শেষে মাঝবয়সী এক লোক আমাকে ডাকলে আমি তাঁকে সালাম দিই। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ম্যাচের আগের দিন আমাদের প্র্যাকটিস ছিল কি না। আমি অপশনাল প্র্যাকটিস ছিল বলার পর উনি আমাকে এমন আপত্তিকর ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন যে, আমি হতভম্ব হয়ে যাই। আমি শুধু বলেছি, “আপনি ভদ্রভাষায় কথা বলুন”।’
নিজের দুর্দান্ত এক প্রথম স্পেল বৃথা যাওয়ার দুঃখ আর দলের বড় পরাজয়ে মাশরাফি এমনিতেই খুব বিষণ্ন হয়ে ছিলেন। এ ঘটনার পর সদা প্রাণচঞ্চল বাংলাদেশ অধিনায়ক আরও চুপ মেরে গেছেন। আজ সকালে আকাশপথে সাগর পাড়ি দিয়ে নিউজিল্যান্ডের নেলসনে যাত্রার সময়ও সেই বিষণ্নতা সঙ্গী হবে তাঁর। বাংলাদেশ দলেরও। একটি জয়ই হয়তো পারে সেটি মুছে দিতে। পরের ম্যাচটা অবশ্য জয়ের হাতছানিই দিচ্ছে। ৫ মার্চ প্রতিপক্ষের নাম স্কটল্যান্ড। এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ একটি ম্যাচ জিতলেও এটিই জিতবে—ফিকশ্চারে প্রথম চোখ বোলানোর দিন থেকে আপনিও কি এমনই ধরে নেননি?

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন