ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিস্নাত মাঠটা যেন আরও বেশি সবুজ, আরও বেশি সুন্দর। মাঝখানটা ত্রিপলে ঢাকা। বেশ কয়েক দিন ধরেই গ্যাবার উইকেট অবগুণ্ঠনের আড়ালে। কাল দুপুরে সেদিকে তৃষাতুর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। সেই কবে থেকে দিন গুনে আসছেন, শেষ পর্যন্ত এই উইকেটে বোলিং করার স্বপ্ন কি পূরণ হবে না?
‘স্বপ্ন’ যদি বলেন, সেটি তাসকিন আহমেদের চোখে আরও বেশি ঝলমল করছে। ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলতে এসে পাশের একটা মাঠে অনুশীলন করছিলেন। আর বারবার তাকিয়ে দেখছিলেন গ্যাবাকে। সেদিন থেকেই তাঁর মনে এই মাঠে খেলার স্বপ্ন আঁকিবুঁকি কাটতে শুরু করেছে।
বিশ্বকাপ খেলতে দেশ ছাড়ার আগে বাংলাদেশেরই একটা পত্রিকাকে নিজের স্বপ্নের দৃশ্যটার বর্ণনাও দিয়ে এসেছেন। তাঁর হাত থেকে বেরোনো ১৫০ কিলোমিটার গতির বলে বাতাসে তিন-চার চক্কর খাচ্ছে স্টাম্প। কল্পচোখে আরেকটা দৃশ্যও দেখতে পান তাসকিন। তাঁর ১৫০ কিলোমিটার গতির বাউন্সারে আতঙ্কিত ব্যাটসম্যান কোনোমতে তা ঠেকাতে গিয়ে ক্যাচ দিচ্ছেন উইকেটের পেছনে।
শুধু তাসকিন কেন, যেকোনো ফাস্ট বোলারেরই মনে এই দুটি ছবি আঁকা থাকে। তা সেই ছবি আঁকার জন্য ব্রিসবেনের গ্যাবার চেয়ে আদর্শ ক্যানভাস আর কোথায় পাবেন তাসকিন? হ্যাঁ, পার্থের ওয়াকাও এ জন্য আদর্শ। কিন্তু সেখানে তো বাংলাদেশের খেলাই নেই। ব্রিসবেনের এই ‘ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিন’ তাই তাসকিনের খুব মন খারাপ করে দিচ্ছে। স্পিড গানে ‘১৫০’ অঙ্কটা কি তাহলে আর তোলা হবে না?
আগামী এপ্রিলে বয়স হবে ২০। তাসকিনের চোখেমুখে তাই তারুণ্যের ঝলমলে আলো। মনে কোনো কিছুই অসম্ভব মনে না করার দুর্বিনীত সাহস। তাঁর শরীরী ভাষাতেও সেটি ফুটে বেরোয়। রুবেল হোসেন বিপরীত। বলের গতিতে তাসকিনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু কথাবার্তায় ফাস্ট বোলারসুলভ ঝাঁজ দূরে থাক; এমন মৃদুভাষী যে অনেক সময় পাশে বসেও তাঁর কথা শুনতে কান পাততে হয়। এই বিশ্বকাপে নিজের প্রথম বলেই উইকেট পেয়েছেন। ক্যানবেরায় নতুন বলে মাশরাফির সঙ্গে তাঁর যোগ্য সংগতই আফগানিস্তান ইনিংসের তিন ওভারের মধ্যেই ম্যাচের গা থেকে অনিশ্চয়তা মুছে দিয়েছে।
মাঠে বড় পর্দায় মাঝেমধ্যে বলের গতি ভেসে ওঠে। রুবেল সেদিকে তাকাননি। গত পরশু সোফিটেল হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কে যেন বলল, একটা বল নাকি ১৪৪.৩ কিলোমিটারের ছিল!’ মানুকা ওভালের উইকেটেই তা করে থাকলে গ্যাবায় বোলিং করতে তো উন্মুখ হয়ে থাকার কথা। রুবেলও উন্মুখ হয়ে আছেন। তবে সেটির প্রকাশটা যথারীতি নির্লিপ্ত, ‘একটু এক্সাইটেড তো বটেই। তবে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরাও ভালো। আর ওরা এখানে খেলে অভ্যস্ত। শুধু জোরে বল করলেই তাই হবে না, জায়গায় রাখতে হবে।’
সেই ‘জায়গায় রাখা’ অনেক দিন ধরেই মাশরাফির বোলিংয়ের ট্রেডমার্ক। অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে যেমন, তেমনি আফগানিস্তানের বিপক্ষেও দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। ৫৪টি বলের ৪৩টিই ‘ডট’। অথচ ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে যখন প্রশ্ন করা হলো ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় যাচ্ছে কি না, মাশরাফি আঁতকে উঠে বললেন, ‘নজর দিয়েন না। ভালো সময়কে আমি খুব ভয় পাই।’
কথাটা কেন বললেন, সেটি বোধ হয় বাংলাদেশের কারোরই বুঝতে সমস্যা হবে না। যতবার নিজের সেরা বোলিং করতে শুরু করেছেন, তখনই যে আততায়ী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে চোট। দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচারের পর অস্ত্রোপচার। তার পরও বারবার যেভাবে ফিরে এসেছেন, এর তুলনা ক্রিকেট ইতিহাসেই আর নেই। মাঠের মাশরাফি তাই অন্যদের জন্যও অফুরান অনুপ্রেরণার উৎস। মাশরাফির আন্তর্জাতিক অভিষেকের সময় চার-পাঁচ বছরের শিশু তাসকিনই যেমন বলছেন, ‘মাঠে মাশরাফি ভাইকে দেখে কী যে অনুপ্রাণিত হই! ফিল্ডিং করতে করতে যখন দেখি বোলিংয়ে নিজেকে কেমন উজাড় করে দিচ্ছেন, খুব ভালো লাগে।’
মাশরাফিও কিন্তু অনুপ্রেরণা খুঁজেছেন তরুণ দুই সতীর্থের কাছ থেকে, ‘ওরা দুজনই জোরে বল করতে পারে। আমাকে তো ওদের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করতেই হবে।’ আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনেই খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটা প্রশ্নোত্তরপর্ব হলো।
অস্ট্রেলিয়ান এক সাংবাদিক রুবেল-তাসকিনের সঙ্গে মাশরাফিকে গুলিয়ে ফেলে প্রশ্নের শুরু করলেন এভাবে, ‘আজ তো আপনি ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করেছেন...’।
মাশরাফি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি?’
ওই সাংবাদিক অঙ্কটাতে একটু সংশোধনী দিলেন, ‘১৪২-১৪১...’।
মাশরাফি একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘এটা অনেক দিন আগের কথা।’
ওই হাসিতে লুকিয়ে থাকা বিষণ্নতাটা শুধু তাঁদেরই ছুঁয়ে গেল, যাঁরা ক্যারিয়ারের শুরুতে মাশরাফির বোলিং দেখেছেন। বাংলাদেশের কোনো বোলারের বলে তুমুল গতি আন্তর্জাতিক ব্যাটসম্যানদের ব্যাকফুটে ঠেলে দিচ্ছে, এই দৃশ্যটা মাশরাফির সৌজন্যেই তো প্রথম দেখা। চোট আর অস্ত্রোপচারজর্জরিত শরীর সেই গতি কেড়ে নিয়েছে। তার পরও মাশরাফি এখনো মাশরাফিই—বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের প্রাণভোমরা।
এমনিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে পেসাররা চিরকালই সৎ ছেলে হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ক্রিকেট বিশ্বে ‘বাঁহাতি স্পিনারদের দেশ’ পরিচিতিটা একমাত্র বাংলাদেশেরই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচেও তিন পেসার না দুই বাঁহাতি স্পিনার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তিন পেসারেরই দুর্দান্ত বোলিংয়ে আপাতত এই সংশয় উধাও।
কিন্তু মাশরাফি-তাসকিন-রুবেলদের গ্যাবায় বোলিং করার আজন্মলালিত সাধ পূরণ হবে কি না, তা নিয়েই যে এখন ঘোর সংশয়!

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন