default-image
>বিশ্বকাপে তামিম খারাপ করছেন, বলা যাবে না। প্রতিটি ম্যাচেই ইনিংসের শুরুটা করছেন। কিন্তু আউট হয়ে আসছেন বাজেভাবে। এ নিয়ে তাঁর মধ্যে রাজ্যের আক্ষেপ। তবে সমস্যাটা বুঝছেন বাংলাদেশের ওপেনার। এ আত্মোপলব্ধিই তাঁকে দেখাতে পারে ফিরে আসার পথ।

‘পরের দুই ম্যাচে বিশ্রাম নিয়ে নেব।’
লিফটে উঠেই মুখে শুকনো হাসি ছড়িয়ে বললেন তামিম ইকবাল। কথার কথা। ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়ন তবু বিস্মিত, ‘কেন! পরের ম্যাচে তো সেঞ্চুরিও করতে পারো। তুমি না খেললে কীভাবে হবে!’ তামিমের শুকনো হাসি আরও বিস্তৃত হয়, ‘রান তো করছি ২৮-৩০। এটা যেকেউ করতে পারবে।’

পরশু রাতে সাউদাম্পটনের হোটেল লবিতে সেলফিশিকারিদের পাল্লায় পড়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে তামিমকে। একের পর এক আবদার-অনুরোধ। ‘ভাই, এ আমার বোন’, ‘ও আমার ভাগনে।’ কিন্তু ছবি তোলার জন্য যাঁরা একে-ওকে ধরে এনে তামিমের পাশে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিলেন, তাঁরা যে কার কী, সেটিই বোঝা যাচ্ছিল না। অথচ তামিম মাত্রই মাঠ থেকে ফিরেছেন। তখনো কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে। শরীর ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। এরপরই লিফটে উঠে ওই কথা। 

‘ক্লান্ত’ ও ‘বিধ্বস্ত’—ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে তামিম যেন এ দুটি শব্দেরই প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি ম্যাচেই ভালো শুরু পাচ্ছেন। এক ম্যাচে করলেন ফিফটি, আরেকটিতে ফিফটির কাছাকাছি গিয়ে আউট। সব ম্যাচেই আউট হওয়ার আগ পর্যন্ত যে ব্যাটিংটা করছেন, সেটি নিয়ে তামিম অখুশি নন। কিন্তু মানতে পারছেন না হঠাৎ আউট হয়ে যাওয়াটা। হোটেলে, মাঠে, রেস্টুরেন্ট, যেখানেই দেখা হচ্ছে, চেহারায় রাজ্যের হতাশা। যেন গভীর এক গর্তে পড়ে এখন আর তা থেকে উঠতে পারছেন না। কথা বলতে গেলেই ঘুরেফিরে ওই প্রসঙ্গে চলে যান। ভাগ্যকে দোষ দিতে থাকেন। গত কয়েক দিনে তামিমের কাছে যতবারই জানতে চাওয়া হয়েছে, ‘কেমন আছেন’, উত্তর একটিই, ‘কেমন থাকব, ভাই? কষ্ট করে যখন উইকেটে সেট হচ্ছি, একটু মেরেটেরে ভালো খেলা শুরু করব, তখনই আউট হয়ে যাচ্ছি।’

খারাপ সময় যে তামিমের জীবনে আগে আসেনি, তা নয়। শুধু বিশ্বকাপের কথা যদি বলেন, সেটি তো আরও দুঃস্মৃতি! এ যেন অদৃশ্যেরই ঠিক করা যে বিশ্বকাপ তামিমের জন্য নয়। ওয়ানডেতে যাঁর প্রায় ৭ হাজার রান, ১১টি সেঞ্চুরি আর ৪৭টি ফিফটি, এ নিয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলেও এখনো তাঁর কোনো সেঞ্চুরি নেই। ফিফটি সব মিলিয়ে চারটি।

ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত শুরুর পরও ২০০৭ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপটা শেষ করেছেন মাত্র ১৯.১১ গড় নিয়ে। ২০১১ ও ২০১৫ সালের পরের দুই বিশ্বকাপে তামিম ৬টি করে ম্যাচ খেলে করেন ১৫৭ ও ১৫৪ রান। কোনোটিতেই গড় ৩০-এর বেশি নয়। আগের তিন বিশ্বকাপের সঙ্গে তুলনা করলে তাঁর জন্য বরং এবারের বিশ্বকাপটাই ভালো যাচ্ছে। বড় ইনিংস হয়তো খেলতে পারেননি, তবু রানের গড় এই ছয় ম্যাচে ৩৪.১৬। এক বিশ্বকাপে তাঁর মোট রানটাও (২০৫) এবারই প্রথম দুই শ অতিক্রম করল।

কিন্তু তামিম এভাবে চিন্তা করবেন কেন? আর চিন্তা করলে তিনি তামিম ইকবালই-বা কেন! একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের জয় মানেই তামিমের ব্যাট থেকে রানের স্ফুলিঙ্গ ছোটা। তামিম ঝোড়ো শুরু না দিলে বাংলাদেশের রান বেশি দূর এগোত না। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলে তামিমের ভূমিকা বদলেছে। বদলেছে ব্যাটিংয়ের ধরন। তাঁর কাছে দলের এখন এটাই চাওয়া, তিনি অন্তত ৩০ ওভার পর্যন্ত উইকেটে থাকবেন। ইনিংসের মেরুদণ্ড হবেন। শুরুতেই ঝড় তুলতে হলে সে কাজ সঙ্গী ওপেনারের।

ইংল্যান্ড ক্রিকেট বিশ্বকাপে দলে নিজের ভূমিকাটি ঠিকভাবে পালন করতে পারছেন না বলেই তামিমের যত আক্ষেপ। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ তাদের সেরা খেলাটা খেলছে এবার। সাকিব আল হাসান একটার পর একটা সেঞ্চুরি আর ফিফটি করে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের দৌড়ে সবার আগে। পরশু তো বোলার সাকিবও আপন আলোয় উদ্ভাসিত হলেন আরও একটি ‘প্রথম’-এর গৌরবমালা পরে। বিশ্বকাপে এর আগে বাংলাদেশের কোনো বোলার এক ম্যাচে ৫ উইকেট পাননি। মুশফিকুর রহিম অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছেন, পরশু করলেন ৮৩। তরুণ মোসাদ্দেক হোসেন, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনরাও তাঁদের কাছে দলের দাবি মিটিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত। পারছেন না শুধু তামিম। নিজেকে নিজেই বারবার জিজ্ঞেস করছেন, ‘আমি কী করছি!’

বাংলাদেশ দলের সেমিফাইনাল-যাত্রার স্বপ্নে এখনো নিজের প্রত্যাশা মেটানো ভূমিকা রাখতে না পেরে তামিমের হতাশা, ‘দলে সবাই কিছু না কিছু করছে। শুধু আমি ছাড়া। হয়তো যতক্ষণ খেলছি, ভালো খেলছি। কিন্তু আমার তো আরও কিছু করা দরকার।’


তামিম কি জানেন, এটাই তাঁর শক্তি? আজ যদি খারাপ সময়টা তাঁর না হয়ে দলের অন্য কারও হতো এবং তিনিও একই আক্ষেপে পুড়তেন, সবার আগে তামিমই ছুটে যেতেন সেই সতীর্থের কাছে। তাঁকে বলতেন, ‘আরে ধুর! খারাপ সময় তো যায়ই। আর সময় খারাপ তো না! তুই তো ভালো শুরু করছিস। বুঝতেও পারছিস সমস্যাটা কোথায়। নিজের সমস্যা নিজে বুঝলে আর কিছু লাগে নাকি!’

তামিমের বেলায়ও এ কথাটাই সত্যি। আত্মোপলব্ধিই তাঁকে দেখাতে পারে ফিরে আসার পথ। সেটি বার্মিংহাম থেকেই নয় কেন!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0