বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত বছর করোনাভাইরাসের ঠিক শুরুতে যে প্রিমিয়ার লিগটা স্থগিত হয়ে আর হলোই না, সে সময়ের কথা। আবদুর রাজ্জাক এবং তাসকিন আহমেদ ছিলেন মোহামেডানে। একই ক্লাবে থাকায় কয়েকটা দিন তাসকিনকে কাছ থেকে দেখেছেন রাজ্জাক। নির্বাচক হয়ে এসে এবার দেখছেন জিম্বাবুয়ে সফরেও। কিন্তু সেই তাসকিন আর এই তাসকিনে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখছেন জাতীয় দলের সাবেক বাঁহাতি স্পিনার!

কণ্ঠে বিস্ময় নিয়ে রাজ্জাক সেদিন বলছিলেন, ‘করোনাভাইরাসের আগের লিগেও তাকে দেখেছি। অনুশীলন, চলাফেরা, কথাবার্তা—শুরু থেকে যেমন দেখেছি, তখনো তেমনই ছিল। খুব যে ভালো খেলছিল, তা–ও নয়। কিন্তু এখন যেন অন্য তাসকিনকেই দেখছি। ওর কিছুই আগের সঙ্গে মেলে না!’

default-image

তাসকিনের নিজেকে বদলে ফেলার রহস্যটা তো আগেই বলা হলো—পরিশ্রম এবং ইতিবাচক চিন্তার যুগলবন্দী। এমন নয় যে তার জীবন খুব উচ্ছৃঙ্খল ছিল কখনো। আবার এটাও ঠিক, এখন যে রকম শৃঙ্খলার শক্ত শিকলে নিজেকে বেঁধে ফেলেছেন, এ রকমও ছিলেন না তাসকিন। দলীয় অনুশীলনের বাইরে খুব বেশি কিছু করেছেন বলে কারও চোখে পড়েনি কখনো। পরিশ্রমে তাঁর বরং একটু অনীহাই ছিল।

করোনাভাইরাস মানবজাতির জন্য অভিশাপ হলেও তাসকিনের বদলে যাওয়া সেটারও একটা উপজাত। গত বছর মহামারির শুরুতে যখন খেলাধুলা সব বন্ধ হয়ে গেল, তাসকিন সংকল্প করলেন, এটাই সময় নিজেকে পরিশ্রমের আগুনে পোড়ানোর। লোহা যেমন আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, তেমন হবেন তিনি। তাতে যদি প্রকৃতির অবিচারের একটা জবাব দেওয়া যায়। মনে মনে একটা তালিকা করে নিলেন—ভালো ক্রিকেটার হয়ে উঠতে হলে কী কী করতে হবে?

অন্তত বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারকে আমি দেখিনি যে নিজেকে এতটা বদলে ফেলতে পেরেছে। ও যে কাজগুলো করেছে, দিনের পর দিন নিজেকে এমন সংযমের মধ্যে রেখে পুরোনো সব অভ্যাস বদলে ফেলা কিন্তু সহজ কাজ নয়।
আবদুর রাজ্জাক, নির্বাচক, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল

সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে কেন তাসকিনের চিন্তায় এই বদল, তা আরেকটু বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক। তাসকিনের মনের মধ্যে অনেক দিন ধরেই একটা জ্বালা। ক্রিকেটার তো তিনি হলেন, কিন্তু প্রকৃতি যে তাঁকে কিছুই দিল না! চোট-আঘাতের সঙ্গে লড়াই করে যেটুকুই এগিয়েছেন, সেটা অল্প-স্বল্প পরিশ্রম করেই। তাসকিন যখন তাকান আফগানিস্তানের রশিদ খানের দিকে, এমনকি সতীর্থ মোস্তাফিজের দিকেও, নিজেকে মনে হয় প্রকৃতির কাছ থেকে বঞ্চিত এক ক্রিকেটার। রশিদ-মোস্তাফিজদের নামের সঙ্গে যে রকম ইংরেজি ‘ন্যাচারাল ট্যালেন্ট’ কথাটা জুড়ে দেওয়া যায়, তাসকিনের সঙ্গে তো তা যায় না! কিন্তু তাঁর ইচ্ছা, ভালো ক্রিকেটার হবেন। একজন ভালো পেসার এবং একজন ভালো টেল এন্ডার হয়ে এমন কিছু করবেন, যাতে ‘তাসকিন আহমেদ’ নামটা খোদাই হয়ে থেকে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে।

default-image

ক্রিকেটার হিসেবে প্রকৃতি তাঁর মধ্যে যে ঘাটতি রেখে দিয়েছে, সেটা তিনি পুষিয়ে নিতে চাইলেন পরিশ্রম দিয়ে, মানসিকতা বদলে। আর তখনই করলেন সেই তালিকাটা। আর এই পরিকল্পনায় সফল হতে তাঁকে সাহায্য করেছেন দুজন মানুষ। ফিটনেস ট্রেনার দেবাশীষ ঘোষ ও মনোরোগবিদ সাবিত রায়হান।

তাসকিন দেখলেন, শারীরিক ফিটনেসটাই বাড়াতে হবে সবার আগে, যেন মাঠে সামর্থ্যের সবটুকু নিংড়ে দিতে পারেন। পরিস্থিতির দাবি মেটাতে বাড়তি চাপ নিতে পারে শরীর। কিন্তু ফিটনেস খুব ভালো থাকলেও মন যদি বলে, ‘ধুর, এসব করে কী হবে’, তাহলে তো আর লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। তাই মনের কিছু রোগও সারাতে হলো। ঝেড়ে ফেলতে হলো নেতিবাচক চিন্তা। মন আর শরীরের শক্তিকে আনতে লাগলেন এক বিন্দুতে। যা মন চাইবে তা শরীর করে দেখাবে। আবার শরীর যতটুকু করতে পারবে, মন থেকেও তা পুরোপুরি করার তাড়না আসবে।

নেতিবাচক চিন্তা মনের জোরটাকে অনেক সময় শুষে নেয়। সে রকম চিন্তা এলে সেটা তাড়ানোর কৌশলও শিখে নিয়েছেন তাসকিন। মনের মধ্যে সেসব পুষে না রেখে এমন এমন মানুষের সঙ্গে তা ভাগ করে নিতে লাগলেন, যাঁরা তাঁকে সাহস দেন। যাঁদের কথায় অনুপ্রেরণা খুঁজে পান তাসকিন। আর মনের আয়নায় ভাসিয়ে তুলতে থাকেন সুখস্মৃতির অ্যালবাম।

default-image

শরীর আর মন নিয়ে কাজগুলো করতে গিয়ে তাসকিনের জীবনযাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বদলে গেছে। যে চাইবে ওজন কমিয়ে ঝরঝরে হয়ে যেতে, যত পছন্দেরই হোক তার খাদ্যতালিকা থেকে তখন বিরিয়ানি-ফাস্ট ফুড গুরুত্ব হারাবেই। যদি আগের দিন সন্ধ্যায় কেউ ঠিক করে নেন, ‘কাল সকাল সাতটায় আমি জিমে ঢুকব’, তাহলে মুঠোফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার রাত জাগার সুযোগ নেই। আর মনের মধ্যে ওই যে ভালো ক্রিকেটার হয়ে ওঠার তাড়না, প্রকৃতির বঞ্চনাকে পরাজিত করার ক্ষুধা—নেতিবাচক চিন্তার স্রোত ঠেকিয়ে দিতে লাগল সেগুলোই। খারাপ ভাবলে খারাপই হয়, ভালো ভাবলে ভালো—জীবন থেকে নেওয়া এই শিক্ষা তাসকিনের কল্পনায় এখন শুধু একটা দৃশ্যই ভাসিয়ে তোলে—মাঠে তিনি উড়ছেন দুহাতের ডানায় ভর করে। সাম্প্রতিক সময়ে তো সে দৃশ্য বাস্তব হয়েও ধরা দিচ্ছে বারবারই।

আরও অনেকের মতো রাজ্জাকের কাছেও তাই তাসকিন বিস্ময়েরই অন্য নাম, ‘অন্তত বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারকে আমি দেখিনি যে নিজেকে এতটা বদলে ফেলতে পেরেছে। ও যে কাজগুলো করেছে, দিনের পর দিন নিজেকে এমন সংযমের মধ্যে রেখে পুরোনো সব অভ্যাস বদলে ফেলা কিন্তু সহজ কাজ নয়।’

তাসকিনকে তা পারতেই হতো। প্রকৃতির অবিচারের জবাব দিতে ইচ্ছাশক্তির চেয়ে বড় অস্ত্র যে আর কিছুই নেই!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন