বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কখনোই নির্দিষ্ট মান ছুঁতে পারেনি। একসময় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগই ছিল দেশের একমাত্র ঘরোয়া টুর্নামেন্ট। এরপর টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার এক বছর আগে চালু হয় দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেট। পরে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ হয়ে যায় ওয়ানডে সংস্করণের একমাত্র ঘরোয়া আসর। বিপিএল চালু হয় টি-টোয়েন্টির জন্য। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থাও চালু হয় বিসিএলের মাধ্যমে। আপাতদৃষ্টিতে একাধিক ঘরোয়া আসর। কিন্তু ‘ভালো উইকেটে’র আলোচনা সব সময়ই এসব ঘরোয়া আসরকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

কাল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নাকাল হওয়ার পর পেসার তাসকিন আহমেদ আবারও ‘ভালো উইকেটে’র আলোচনা সামনে নিয়ে এলেন, ‘এখানকার উইকেট (টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের) মিরপুরের চেয়ে ভিন্ন। অনেক স্পোর্টিং। ভবিষ্যতে আরও ভালো উইকেটে খেলা হলে আমাদের বোলিং-ব্যাটিং দুটিতেই আরও উন্নতি হবে। ভবিষ্যতে ভালো উইকেটে খেললে ফল যা-ই হোক, বড় ইভেন্টগুলোয় সুবিধা হবে।’

default-image

‘ভবিষ্যতে ভালো উইকেটে’ খেলতে চেয়েছেন তাসকিন। তার মানে, এত দিন ভালো উইকেট তাঁরা পাননি। তাসকিনের এ মন্তব্যে অলক্ষ্যে আক্ষেপ বাড়াবে তাঁর আগের কয়েকটি প্রজন্মের ক্রিকেটারদের। ‘ভালো উইকেট’ যে তাঁরাও বলতে গেলে পাননি। একটা প্রজন্ম কালো মাটির উইকেটে গোড়ালিসমান বাউন্সে ব্যাটিং করে গেছে। আরেকটা প্রজন্মের বোলাররা মরা উইকেটে ক্লান্তিকর সব ম্যাচ খেলেছে; এই প্রজন্ম এমন উইকেট পেয়েছে, যেখানে ব্যাটসম্যানরা হাত খুলে ব্যাটিং করতে পারেন না। বোলাররা উইকেটের পর উইকেট পেয়ে আন্তর্জাতিক উইকেটে গিয়ে অসহায়। এ–ই তো বাংলাদেশের ক্রিকেট।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা এত নেতিবাচক ব্যাটিং কেন করেন—এ প্রশ্ন সবার। যে ক্রিকেটে সাহসই সবকিছু, যে ক্রিকেটে ইতিবাচক না হলে, উদ্ভাবনী না হলে ফল আসে না, সে সংস্করণের ক্রিকেটেই কেমন যেন কুঁকড়ে থাকেন তাঁরা। সেই পুরোনো যুগের ‘ধরে খেলা’র ক্রিকেটে সব মনোযোগ তাঁদের। এর একটাই কারণ, সারা মৌসুমে দেশের মাটিতে যে ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তাঁরা, সেখানে এমন উইকেটে খেলা হয়, যেখানে ইতিবাচক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ‘ধরে খেলা’ই দেশের মাটিতে ঘরোয়া ক্রিকেটের একমাত্র ভবিতব্য।

default-image

টি-টোয়েন্টি সংস্করণে বাংলাদেশের ভালো না করার কারণ হিসেবে ‘ভালো উইকেটে’ না খেলার সঙ্গে আসবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও মানহীন ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রসঙ্গও। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে সেটি ভালো উইকেটে অনুষ্ঠিত না হওয়ার ‘নিবিড় যোগ’ আছে। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকার কারণ হচ্ছে এখানে ব্যাটসম্যানরা রানের ফোয়ারা ছোটানোর সুযোগ পান না। রান বেশি না হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হবে না, আর ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা প্রতিদ্বন্দ্বিতামুখী হতে পারবেন না—এটা বোঝার জন্য বড় বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঘরোয়া ক্রিকেটের মান উন্নয়ন, ভালো উইকেটে এর আয়োজন তো আর তাসকিন আহমেদ করবেন না। এটা করতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকেই। কিন্তু তারা এত দিন এ বিষয়টাতে কেন মনোযোগ দিলেন না!

default-image

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বর্তমান বোর্ডে এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা একসময় দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলেছেন, খেলেছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁদের প্রায় সবাই ঘরোয়া ক্রিকেটের মান উন্নয়ন আর উইকেটের মান নিয়ে কথা বলেছেন। নিজেরা পুড়েছেন ভালো উইকেটে খেলতে না পারার আক্ষেপে। কিন্তু নিজেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তাঁরা যে কেন নিজেদের দাবিগুলোই বেমালুম ভুলে গেলেন—প্রশ্ন ওঠে এটি নিয়েই।

সংবাদ সম্মেলনে বলা তাসকিনের কথাগুলো এখন যদি তাঁরা অনুধাবন করেন, তাহলেই মঙ্গল। নয়তো এর চেয়েও বাজে অবস্থার মধ্যে পড়তে পারে আমাদের ক্রিকেট। সে অবস্থা নিশ্চয়ই কাম্য নয় নীতিনির্ধারকদের।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন