এই বয়সেও ফিল্ডিংয়ে ক্ষিপ্রতার প্রমাণ রেখে দারুণ ক্যাচ ধরেছেন খালেদ মাহমুদ।
এই বয়সেও ফিল্ডিংয়ে ক্ষিপ্রতার প্রমাণ রেখে দারুণ ক্যাচ ধরেছেন খালেদ মাহমুদ। ছবি: শামসুল হক

পাড়ার ক্রিকেটে দৃশ্যটা অহরহ দেখা যায়। বিশেষ করে টেপ টেনিসের ক্রিকেটে। পেসে কাজ না হলে স্পিন কিংবা তার উল্টোটা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও এমন নজির কম নেই।

মার্ক ওয়াহ থেকে অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসরা মিডিয়াম পেসার থেকে স্পিনার হয়েছেন। পাকিস্তানের পেসার সোহেল তানভীরকে স্পিন করতে দেখা গেছে ভারতের বিপক্ষে টেস্টে। আবার ভারতেরই সাবেক পেসার মনোজ প্রভাকর পেসার থেকে অফ স্পিনার হতে বাধ্য হয়েছিলেন ১৯৯৬ বিশ্বকাপে সনাৎ জয়াসুরিয়ার ঝড় সহ্য করতে না পেরে। কিন্তু খালেদ মাহমুদ সুজনের বেলায় বিষয়টি বোঝা গেল না। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে মিডিয়াম পেসে পাকিস্তানকে কাঁপিয়ে দেওয়া বোলার কিনা আজ স্পিনার!

একটু থামুন। ভ্রুকুটি ও কল্পনার রথে লাগাম টানুন। খালেদ মাহমুদ ৪৯ বছর বয়সে পেশাদার কিংবা প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরেননি। তিনি মাঠের মানুষ, মাঠেই তো থাকবেন, আর এই ব্যস্ততার মধ্যে খানিক ফুরসতে মিলনমেলার মাঠে নেমেছেন জার্সি-জুতা পরে।

দেশের সাবেকদের নিয়ে কক্সবাজারে চলছে লেজেন্ডস চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। খালেদ মাহমুদ এই বিনোদনমূলক ১০ ওভার ১০ বলের ক্রিকেটেই ফিরিয়ে আনলেন সাইমন্ডস-প্রভাকরদের স্মৃতি। আর হ্যাঁ, আরও একটি বিষয়। তবে সেটি স্মৃতি নয়, দেশের ক্রিকেটের চলমান বাস্তবতা। ব্যাটসম্যান যখন বাঁহাতি, তখন স্পিন করো ডানহাতি এবং অবশ্যই অফ স্পিন।

বিজ্ঞাপন
default-image

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজ হারের টেস্টেও তা দেখা গেছে। কাইল মেয়ার্সের বিপক্ষে টানা বল করে গেছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। অন্য পাশের ব্যাটসম্যান বাঁহাতি হলে নতুন বলেও বাংলাদেশ দলে এমন ‘কৌশলে’র দেখা মেলে অহরহ। বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়কও আজ বোলিংয়ে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান পেয়ে হয়ে যান অফ স্পিনার।

জা’দুবে স্টার্সের হুমায়ুন কবিরও স্পিনার খালেদ মাহমুদকে পেয়ে যেন তৈরি হয়ে ছিলেন। মিড উইকেট দিয়ে হাঁকাবেন। কিন্তু খালেদ মাহমুদও এককাঠি সরেস। ইয়র্কারে বোল্ড আউট করে এক্সপো রেইডার্স অধিনায়ক যেন মনে করিয়ে দেন চাচা চৌধুরী কমিকসের সেই আপ্তবাক্য—‘চাচা চৌধুরীর (ক্রিকেট) মস্তিষ্ক কম্পিউটারের চেয়েও প্রখর।’

শুধু স্পিন নয়, দু-এক পা এগিয়ে পেস বল করার চেষ্টাও করেছেন খালেদ মাহমুদ। তাতেও এসেছে উইকেট। সেই আগের মতোই বল সিমে পড়ে একটু এদিক-সেদিক হয়েছে।

এমনকি ফিল্ডিংয়েও বাতাসে অনেকক্ষণ ভেসে থাকা একটি ক্যাচ একেবারে নিচে গিয়ে তাঁর লুফে নেওয়ার দৃশ্যটি ছিল মনোলোভা। ভারী শরীরটাকে এমনভাবে বলের নিচে নিয়ে ক্যাচটা ধরলেন যেন খালেদ মাহমুদের করতল বলটির সাত জন্মের ঠিকানা। ২ ওভারে ৮ রানে ২ উইকেটের মধ্যে একটি পেসে, আরেকটি স্পিনে নিয়ে কৌশলে কার্যোদ্ধারে সমতাও রাখলেন এক্সপো অধিনায়ক।

ওপেনার খালেদ মাহমুদকে কি কখনো দেখা গেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে? পরিসংখ্যান আঁতিপাঁতি করে খুঁজে বেরোল প্রায় ভুলে যাওয়া এক তথ্য। সেই ’৯৯ বিশ্বকাপেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওপেনিংয়ে মেহরাব হোসেনের সঙ্গে ছিলেন খালেদ মাহমুদ।

কিন্তু তার আগে ব্যাটিংয়ে দেখা গেছে প্রায় অচেনা এক খালেদ মাহমুদকে। ওপেনার! ঘরোয়া ক্রিকেটে এই খালেদ মাহমুদ হয়তো ভীষণ অচেনা কেউ নন। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের হাঁটি হাঁটি পার সেই যুগে ঘরোয়া ক্রিকেট মনে রেখেছেন কজন?

খালেদ মাহমুদ মানেই তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছয়ে কিংবা সাতে নেমে স্রোতের প্রতিকূলে লড়াই, তখন তাঁকে বলা হতো ‘ফাইটার সুজন’। আর খালেদ মাহমুদ মানে ’৯৯ বিশ্বকাপে নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় জয়ে তাঁর ৩ উইকেট। কিন্তু ওপেনার খালেদ মাহমুদকে কি কখনো দেখা গেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে?

পরিসংখ্যান আঁতিপাঁতি করে খুঁজে বেরোল প্রায় ভুলে যাওয়া এক তথ্য। সেই ’৯৯ বিশ্বকাপেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওপেনিংয়ে মেহরাব হোসেনের সঙ্গে ছিলেন খালেদ মাহমুদ। গ্লেন ম্যাকগ্রা ও ডেমিয়েন ফ্লেমিংয়ের সামনে ১৯ বল টিকে করতে পেরেছিলেন ৬ রান।

তাহলে ক্ষণিকের হলেও ম্যাকগ্রা-ফ্লেমিংকে সামলানোতে ‘অভিজ্ঞ’ সে ব্যাটসম্যান যখন গাজী আলমগীর কিংবা সজল চৌধুরীদের বিপক্ষে ওপেন করেন, তাহলে কি কারও বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়ার কথা? বিলক্ষণ না! ওপেন করে রীতিমতো ১৪৪ স্ট্রাইকরেট খালেদ মাহমুদের (৯ বলে ১৩)।

বিজ্ঞাপন
default-image

এক্সপোর ৫৫ রানে জয়ের পর খালেদ মাহমুদকে জিজ্ঞাসা করা হলো এ সাফল্যের কী রহস্য? উত্তরে দেশের ক্রিকেটের স্বনামধন্য এ সাবেক ও সংগঠক কিছুটা স্মৃতিকাতর, ‘পেছনে ফেরার জন্যই তো এই টুর্নামেন্ট। সবার সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করেছি, আগের স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে। মাঠে নামলে শরীর সায় না দিলেও মন তো লড়াকু থাকেই।’

লড়াকু সেই মন থেকেই কি বাঁহাতির বিপক্ষে অফ স্পিনার হয়ে যাওয়া? উত্তর দেওয়ার আগে হাসির দমক ছুটিয়ে খালেদ মাহমুদ মনে করিয়ে দিলেন ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর অফ স্পিনার হিসেবে সাফল্যের কথা, ‘আমি তো অফ স্পিনার ছিলাম না, যদিও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অফ স্পিনে আমার ৫ উইকেট আছে, রাজশাহীর বিপক্ষে। আর হ্যাঁ, বাঁহাতি থাকলে অফ স্পিন করতে পছন্দ করি, খেলা কঠিন হবে এটা ভেবে। আর এমনিতে মিডিয়াম পেস।’

খালেদ মাহমুদ নিজেও তাঁর একই অঙ্গে দুই নয়, তিন রূপের (ওপেনারও) শোভায় যে স্মৃতিকাতর হলেন, সেটি বোঝা গেল কিছুক্ষণ পরই। সতীর্থ মেহরাব হোসেনকে (অপি) জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্পিন করে রাজশাহীর বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়েছিলাম কবে রে?’ মেহরাব ঠিক করে বলতে পারলেন না। শুধু বিড়বিড় করে বললেন, ‘রংপুরে খেলেছিলাম মনে হয়!’

কিংবদন্তিদের মিলনমেলায় এই মনে করা এবং মনে করিয়ে দেওয়াই তো সাবেকদের যক্ষের ধন।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন