default-image

কিন্তু ৩ বলে কোনো রান না করে, বিশ্বকাপ ফাইনালের দিক বদলে দেওয়া দৃশ্যের অংশ হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে ম্যাককালাম হেসেছিলেন। কারণ, ক্রিকেটের মূল যে ব্যাপারটা, ম্যাককালাম সেটিই ভুলে গিয়েছিলেন। একটা মৌলিক ব্যাপার মনে ছিল না তাঁর, ক্রিকেট ব্যাটিংয়ের যেটি ১০১-বল দেখা। সেই বিশ্বকাপে ব্যাটিং আগ্রাসনে নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া ম্যাককালাম বল দেখতে ভুলে গিয়েছিলেন।

****

আইপিএল যখন শুরু, ওডিন স্মিথের বয়স তখন ১২।

সিরিয়াসলি ক্রিকেট খেলা শুরুর পর থেকে এ লিগে খেলার স্বপ্নটা দেখে এসেছেন, এমন বললে অবাক হওয়ার কিছু নেই। স্মিথ স্বপ্ন দেখতেই পারেন। ২০২২ সালে এসে যখন আইপিএলে অভিষেক হয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলরাউন্ডারের, বোলিং করতে এসে যা হলো, তেমন স্বপ্ন বোধ হয় দেখেননি। ৪ ওভার, ৫২ রান, উইকেটের কলামে কিছু নেই।

তবে দিনটা সেখানেই শেষ নয়। বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে পাঞ্জাবের প্রয়োজন ছিল ১৮ বলে দ্বিগুণ রান, স্মিথ ব্যাটিং করছিলেন ৩ বলে ২ রানে। ‘নাভি’বা নয়া মুম্বাইয়ের ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে মোহাম্মদ সিরাজের ৫ বলে ২৫ রান নিয়ে পাঞ্জাবের জয়ের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি রাখলেন স্মিথ। ৮ বলে ২৫ রানের অপরাজিত ইনিংসে হয়ে গেলেন ম্যাচসেরা।

default-image

‘আমরা পারব, এমন বিশ্বাস রাখার দরকার ছিল শুধু। আমরা পেরেছি’, ম্যাচ শেষে বলেছিলেন স্মিথ।

আরেকজন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলরাউন্ডারের আগমনী বার্তা শুনল আইপিএল। তবে সেখানেই শেষ নয়, ১১ দিন পর স্মিথ দেখবেন আইপিএলের আরেক রূপ।

****

১৯ বলে ৮ রান থেকে ৩১ বলে ৫৩—পাঞ্জাবের বিপক্ষে ২০২০ আইপিএলে শারজার ওই ইনিংসটা রাহুল তেওয়াতিয়ার স্বপ্নকে হার মানানোর মতো। তবু সেদিন ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তিনে নেমে ৪২ বলে ৮৫ রান করা সাঞ্জু স্যামসন, তেওয়াতিয়া ঢুকে গিয়েছিলেন আইপিএল লোকগাথায়।

রাজস্থান এবার তেওয়াতিয়াকে ছেড়ে দিয়েছে, নতুন দল গুজরাটের হয়ে প্রথম ম্যাচেই ১০ বলে ৬ থেকে তেওয়াতিয়া গেছেন ২৪ বলে অপরাজিত ৪০ রানে। তেওয়াতিয়া তবু ম্যাচসেরা নন, তুলনামূলক লো-স্কোরিং ম্যাচে ২৫ রানে ৩ উইকেট নেওয়া মোহাম্মদ শামি।

৮ এপ্রিল, পুরোনো মুম্বাইয়ের পুরোনো ব্র্যাবোর্নে যখন তেওয়াতিয়া নামলেন, ৫ বলের মধ্যে চারটিতেই অন্তত বাউন্ডারি প্রয়োজন গুজরাটের। তেওয়াতিয়া তাঁর প্রায় নিরীহ লেগ স্পিনেই এর চেয়ে বেশি রান দিয়েছেন ১ ওভার বোলিং করে।

শেষ ওভারে নিজেই সিঙ্গেল চুরি করতে গিয়ে রানআউট হয়ে প্রকাশ্যে ডেভিড মিলারের ওপর ‘রহস্যজনক’ রাগ ঝেড়ে ফিরেছেন তেওয়াতিয়ার অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া। একটা সিঙ্গেল নিয়ে তেওয়াতিয়া নন–স্ট্রাইকে গেলেন। একটা চারের পর মিলার যখন বোলার স্মিথের কাছেই শুধু নিতে পারলেন পরের বলটা, কার্যত তেওয়াতিয়ার তেমন কিছু করার ছিল না আর এ ম্যাচ জেতাতে। নন-স্ট্রাইক প্রান্ত থেকেই ম্যাচের শেষটা দেখতে হবে, হয়তো ভেবেছিলেন এমনই।

default-image

কিন্তু স্মিথ অতি-রোমাঞ্চিত হয়ে পড়লেন। ক্রিজের বাইরে থাকা তেওয়াতিয়াকে রানআউটের সুযোগ নিতে যাওয়ার কোনো দরকার ছিল না তাঁর, তবু থ্রো-টা তিনি করলেন। হয়তো সরাসরি থ্রো-এ তেওয়াতিয়াকে রানআউট করে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, এ রাতটা তাঁরই হবে শুধু। উল্টো ওভার থ্রো থেকে সিঙ্গেল পেলেন মিলার, স্ট্রাইকে তেওয়াতিয়া।

‘ভাবার মতো কিছু ছিল না আসলে। গিয়ে শুধু ছয় মারতে হবে, আমি আর ডেভিড (মিলার) এটাই আলাপ করেছি’, শেষ ২ বলে যখন ২ ছয় প্রয়োজন, তেওয়াতিয়ার ভাবনায় অন্য কিছু আসার সুযোগও ছিল না।

পঞ্চম বলে ডিপ মিডউইকেটে মারা তেওয়াতিয়ার ছয়টা ক্যাচ হতে পারত, হতে পারত বাউন্ডারি ছাড়া যেকোনো কিছু। ফিল্ডার বলটা ধরেছিলেন, নিয়ন্ত্রণ না নিতে পেরে বাউন্ডারির ভেতরে রাখার চেষ্টাও করেছিলেন। পারেননি।

কমেন্ট্রিতে সুনীল গাভাস্কার সুপার ওভারের কথা মনে করাচ্ছিলেন এরপর। সাইমন ডৌল শুধরে দিলেন, ১ বলে ৬ রানের সমীকরণের সমাধানে সুপার ওভার আসে না। তেওয়াতিয়া জানতেন, স্মিথ বলটা কোথায় করবেন, ‘জানতাম, অফ স্টাম্পের বাইরে ওই লাইনেই বল করবে সে, কারণ প্রথম বলটা আমাকে ওখানেই করেছিল। আমি পরিকল্পনা করেই রেখেছিলাম, কী শট খেলব।’

default-image

তেওয়াতিয়া সে শটটা খেলার সঙ্গে সঙ্গেই জানতেন, ছয় ছাড়া আর কিছু নেই এর ভাগ্যে। হয়তো স্মিথও জানতেন সেটি।

৩ বলে ১৩ রানের ইনিংসে তেওয়াতিয়ার ম্যাচসেরা হওয়ার কথা নয়, হননিও।

*****

আপনি ব্রেন্ডন ম্যাককালাম হতে পারেন, ওডিন স্মিথ বা রাহুল তেওয়াতিয়া হতে পারেন। অথবা স্রেফ পাড়ার ক্রিকেট খেলা কেউ। আপনার মাথার মধ্যে বিশ্বকাপ ঘুরতে পারে, আইপিএলের ম্যাচ ঘুরতে পারে, অথবা স্রেফ পাশের পাড়ার সঙ্গে আরেকটি ম্যাচ। আপনি এমন স্বপ্নটা দেখেছেন—প্রায় অসম্ভব এক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে দল, ম্যাচটা জিতিয়ে দিলেন আপনি। সে চিত্রনাট্য আপনি লেখেন, ছবির পর ছবি আপনারই সাজানো।

তবে পরপর ২ বলে ২ ছয়ে তেওয়াতিয়ার স্বপ্ন যেমন বাস্তবে রূপ নিতে পারে, ৩ বলে ১৩ রান আটকাতে না পারা স্মিথকেও ক্রিকেট বুঝিয়ে দিতে পারে—যা চান, সেটি প্রায় পেয়েও হারাতে সময় লাগে না।

২০১৫ সালে এমসিজির ফাইনালে ম্যাককালাম যেমন বুঝেছিলেন, ‘হ্যাঁ, বাজে শট ছিল। তবে পরিকল্পনাটা বাজে ছিল না মোটেও। যদি বলটা ঠিকঠাক দেখে টাইমিং করতে পারতাম, ম্যাচের সুরটা ভিন্ন হতে পারত। সেটি হয়নি। এক জীবন ধরে অমন একটা মুহূর্তের স্বপ্ন দেখে আসার পর আমি গুবলেট পাকিয়ে ফেললাম। আমি তাই হেসেছিলাম। না হলে হয়তো এখনো কাঁদতে হতো আমাকে।’

পাঞ্জাবের বিপক্ষে গুজরাটের ম্যাচ শেষে তেওয়াতিয়া হাসছিলেন। ওডিন স্মিথও কি ড্রেসিংরুমে ফিরে হেসেছেন? ম্যাককালাম যেমন হেসেছিলেন।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন