ব্যাটিংয়ে হনুমা বিহারি। সিডনি টেস্টে তাঁর ব্যাটিং অনেকদিন মনে থাকবে ভারতীয় সমর্থকদের
ব্যাটিংয়ে হনুমা বিহারি। সিডনি টেস্টে তাঁর ব্যাটিং অনেকদিন মনে থাকবে ভারতীয় সমর্থকদেরছবি: এএফপি

এই সিডনিতেই এক যুগ আগের এক টেস্ট। ১৮ রানে ব্যাট করছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। টানা ৪০ বল ঠেকালেন ব্যাটের ‘দেয়াল’-এ।

পরের বলে ১ রান নিতেই উঠে দাঁড়িয়ে দ্রাবিড়কে অভিবাদন জানান সিডনির দর্শকেরা। আজ সেই সিডনিতেই হনুমা বিহারি এমন এক ইনিংস খেললেন, যা মনে করিয়ে দেয় স্রোতের বিপরীতে দ্রাবিড়ের সেই ধ্যানমগ্ন ঋষিসুলভ ব্যাটিংকে।

ক্রিকেটে সরস মন্তব্য আছে, ‘টেস্টে স্ট্রাইকরেট বোলারদের জন্য।’ ব্যাটসম্যানদের কাজ উইকেটে দাঁড়িয়ে থাকা। পায়ে চোট নিয়ে এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ঠিক এ কাজটা করে গেছেন বিহারি।

বেশির ভাগ সিঙ্গেলস নেননি। সিডনি টেস্টে শেষ দিনে জয় না হোক, অন্তত ড্র করতে উইকেট কামড়ে পড়ে থাকার বিকল্প কিছু ছিল না।

বিজ্ঞাপন

বিহারির ১৬১ বলে ২৩ রানের অপরাজিত ইনিংস যেন লক্ষ্য আদায়ে খোলসবদ্ধ প্রতিজ্ঞার জলজ্যান্ত প্রমাণ। সিডনিতে ভারতের ড্র করা টেস্টের সেরা ‘বিজ্ঞাপন’ হয়ে থাকবে হনুমা বিহারির এই ‘কচ্ছপ–কামড়’ ইনিংস—রোমান্টিক সমর্থকেরা ভেবে নিতে পারেন আজ দ্রাবিড়ের ৪৮তম জন্মদিনে বিহারির এই ইনিংসটাই তো সেরা ‘কেক’!

দলের স্বার্থে চিরকালই নিজের সর্বস্ব নিংড়ে দিয়েছেন দ্রাবিড়। বিহারিও আজ সিডনিতে হেঁটেছেন একই পথে। পায়ে চোট থাকায় দৌড়ে রান নিতে পারেননি। ম্যাচের মাঝে বেশ কয়েকবার সেবাশুশ্রূষা নিতে হয়েছে। তা নিয়ে আপত্তিও তুলেছেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক টিম পেইন।

default-image

কিন্তু দেশ যখন বিপদে, তখন প্রতিপক্ষের এসব কথার কাঁটাকে গলার মালা হিসেবে নিয়ে নিজের কাজটা করে গেছেন বিহারি। হার্শা ভোগলের ভাষায়, ‘বাজে একটা সফরের মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট, দৌড়ানো সম্ভব না...সবকিছুই ভুল হচ্ছে...এ অবস্থায় ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ঢালসূচক ইনিংস। সর্বোচ্চ মানের রক্ষণ। গর্ব করার মতো ইনিংস।’

‘ক্ল্যাসিক’ টেস্ট ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে ‘ক্ল্যাসিক’ ব্যাটিং বলতে যা বোঝায়, সেটাই করেছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও হনুমা বিহারি। চা–বিরতিতে যাওয়ার আগে ভারতের স্কোর ছিল ৫ উইকেটে ২৮০।

তখনো জয়ের জন্য ১২৭ রান লাগত ভারতের। এখান থেকে সামান্য ভুলও হারের জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠত। অশ্বিন-বিহারি মিলে তৃতীয় সেশনে আর জয়ের পেছনে না দৌড়ে অপেক্ষায় ছিলেন ড্রয়ের। তৃতীয় সেশনে আর কোনো উইকেট পড়তে দেননি দুজন।

একপর্যায়ে ড্র মেনে নেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক পেইন। যে টেস্টে ঋষভ পন্ত-চেতেশ্বর পূজারার ‘আগুন-বরফ’ ব্যাটিংয়ে একপর্যায়ে ভারত জয়ের সুবাস পেয়েছে, পরে সেই টেস্টেই হারের চোখরাঙানি ছিল—কিন্তু বিহারি-অশ্বিন জুটিতে ভারতের এই ড্র মনস্তাত্ত্বিকভাবে তো জয়ের সমান।

চতুর্থ উইকেটে ২৬১ বলে ১৪৮ রান যোগ করেছিলেন পন্ত-পূজারা। কিন্তু ষষ্ঠ উইকেটে বিহারি-অশ্বিন মিলে ২৫৯ বলে যোগ করেন অবিচ্ছিন্ন ৬২। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে এই দুরকম ব্যাটিংয়ের মধ্যে বিহারির ইনিংসটা ভক্তদের মনের মণিকোঠায় নিশ্চিতভাবেই আলাদা জায়গা পাবে। বিহারি যে বলতে গেলে প্রায় এক পায়ে ব্যাট করেছেন!

বিজ্ঞাপন

দেশের বাইরে ভারতের হয়ে চতুর্থ ইনিংসে ষষ্ঠ কিংবা তার পরের উইকেট জুটিতে অশ্বিন-বিহারির চেয়ে বেশি বল খেলার নজির আছে মাত্র একটি।

টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে ভারত খেলেছে ১৩১ ওভার, এর মধ্যে ৪৩.১ ওভারই ব্যাটিং করেছে বিহারি-অশ্বিন জুটি।

গত ৪০ বছরের মধ্যে ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে কখনো এত ওভার ব্যাট করতে পারেনি ভারত। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এশিয়ান দলগুলোর ড্র টেস্টের মধ্যে এই টেস্টেই ভারত চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চসংখ্যক ওভার খেলার রেকর্ড গড়ল।

ম্যাচ বাঁচাতে এই যে এত রেকর্ড—তার চুম্বক অংশও বিহারির খোলসবদ্ধ প্রতিজ্ঞার ব্যাটিং। যেখানে ১৮তম বলে রানের খাতা খোলার পর বিহারি ৭ রানে পৌঁছেছেন ১১২ বলে! সেখান থেকে ১৬১ বলে অপরাজিত এই ২৩ রানে ৪ বাউন্ডারি থেকে এসেছে ১৬। দৌড়ে মাত্র ৭ রান।

১২৮ বলে ৩৯ রানে অপরাজিত ছিলেন অশ্বিন। তাঁদের জুটিতে অশ্বিনের চেয়েও ২টি বল (১৩০) বেশি খেলে ২০ রান যোগ করেন বিহারি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাবেক সংবাদকর্মী টুইটারে বিহারিকে নিয়ে একটি তথ্য দিয়েছেন, ‘১২ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর বিহারি চার-পাঁচ দিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাঁর মা আবিষ্কার করেন স্কুলের হয়ে এক ম্যাচ জেতাতে ৮২ রানের ইনিংস খেলছিলেন বিহারি। এই একাগ্রতাই তাঁর মাকে বিশ্বাস করিয়েছিল, ছেলে একদিন টেস্ট খেলবে। আজও সেই একই একাগ্রতা দেখা গেল।’

ড্রয়ের পর দুই দল মাঠ ছাড়ার সময় দেখা গেল দৃশ্যটি। খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছাড়ছিলেন বিহারি। অশ্বিন তো বসতে পারছিলেন না। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড ও মিচেল স্টার্কদের বাউন্সার সইতে হয়েছে তাঁর পাঁজরকে।

টিভিতে নিশ্চয়ই এই দৃশ্য দেখেছেন দ্রাবিড়। ‘জেন্টেলম্যানস গেম’-এর অন্যতম সেরা ‘বিজ্ঞাপন’ কি তখন উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়েছেন দুই বীরকে?

সে খবর জানা না গেলেও এ কথাটা বলে দেওয়া যায় নিশ্চিন্তে—বিহারির ইনিংসে গর্বে দ্রাবিড়ের বুকের ছাতি চওড়া হওয়ার কথা!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন