default-image

তিনি দলে নেই, তবে দলের সঙ্গেই আছেন। যে দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে ছিলেন এত দিন, সেই সম্পর্ক তো এখনই শেষ হওয়ার নয়! জাতীয় দল আর ঘরোয়া ক্রিকেট মিলিয়ে বিশ্বকাপ দলের সবাইকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলের ১৫ ক্রিকেটারকে নিয়ে আবদুর রাজ্জাকের ধারাবাহিক লেখার শেষটি আজ
শুরু থেকেই আমরা জানতাম সাকিব হতে যাচ্ছে ‘স্পেশাল’ কিছু। সেই ‘স্পেশাল’ কিছু যে হবে এতটা ‘স্পেশাল’, হয়তো ভাবতে পারিনি আমরা কেউই। সাকিবকে নিয়ে আমি কী বলব! আমরা দারুণ ভাগ্যবান যে ওর মতো একজন ক্রিকেটার পেয়েছি। আমাদের দেশের জন্য, আমাদের ক্রিকেটের জন্য ওপরওয়ালার বিশেষ উপহার সাকিব। সত্যি বলতে, সাকিবকে নিয়ে যখনই কিছু বলি, যত কিছুই বলি না কেন, আমার মনে হয় কখনোই পর্যাপ্ত হয় না। সাকিব এতটা উচ্চতায়, যা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতটা বিশাল, যাকে আটকাতে পারি না কোনো গণ্ডিতেই।
শুরুর দিকের সাকিবকে আমার খুব মনে পড়ে। এমনিতে প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কথা বলত না, একটু চুপচাপই থাকত। আমরা তিন বন্ধু, আমি-মাশরাফি-রাসেলের সঙ্গেই বেশি মিশত। অনূর্ধ্ব-১৯ থেকেই তো ওর নাম শুনে আসছি। পরে খুব কাছ থেকে দেখে বুঝলাম, সাকিব আসলেই অন্য পর্যায়ের একজন। সবচেয়ে বেশি যেটা চোখে পড়েছে, ছোট থেকেই ও স্মার্ট। অনেক অনেক স্মার্ট। স্মার্ট মানে এখানে আমি ক্রিকেটের কথা বলছি, ক্রিকেট ভাবনায় স্মার্ট। নিজেকে, নিজের ক্রিকেটকে খুব ভালো জানত ও যখন বুঝত তখন থেকেই। আমরা অনেকেই অনেক সময় না বুঝে অনেক কিছু করি। পরে বুঝতে পারি ওটা ছিল বেকার পরিশ্রম। সাকিব কখনোই খুব বেশি পরিশ্রমী বা গায়ে খাটা ক্রিকেটার নয়। কিন্তু নিজের যতটুকু দরকার, ততটুকু করত এবং করে পুরো শতভাগ দিয়ে। ওর অনুশীলন হলো ‘সলিড’ অনুশীলন, কমবেশি নেই। ওর ভেতরে এসব হয়তো সহজাতভাবেই ছিল, মানসিকভাবে দারুণ স্মার্ট। সাকিব এত বড় হবে, অতটা হয়তো ভাবতে পারিনি। কিন্তু এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে হিসাব মেলালে মনে হয়, এখানেই তো ওর আসার কথা!

default-image


সাকিব যখন প্রথমবার এক নম্বর অলরাউন্ডার হলো, সেটিই ছিল আমাদের বড় পাওয়া। শুধু ক্রিকেট কেন, গৌরবটা গোটা দেশেরই। একটি জায়গায় বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা! আমাদের সেই সাকিব এখন তিন সংস্করণেই বিশ্বসেরা। অর্জন সাকিবের, গৌরব সারা দেশের। র্যাঙ্কিংয়ের বাইরেও কথা আছে। র্যাঙ্কিং হয়তো স্বীকৃতি, কিন্তু এটাও ভাবুন, ওর মতো অলরাউন্ডার বিশ্ব ক্রিকেটে এখন আর কে আছে? আধুনিক ক্রিকেটে অলরাউন্ডারদের সংজ্ঞাই বদলে গেছে। একটু ব্যাটিং-বোলিং পারলেই অলরাউন্ডার। কিন্তু ব্যাটিং-বোলিং দুটি দিয়েই জাতীয় দলে খেলার মতো ক্রিকেটার এখন কজন আছে? আমি তো সাকিব ছাড়া আর কাউকে দেখি না। ব্যাটিং-বোলিংয়ের কারণে ওর ফিল্ডিং অনেকেই আলাদা করে খেয়াল করেন না। অথচ ফিল্ডিংয়েও সাকিব সেরাদের একজন। ক্যাচ কখনোই ছাড়ে না, সরাসরি থ্রোতে স্টাম্পে সবচেয়ে বেশি বল লাগায়, ওর আশপাশ দিয়েও কখনো বল পার হয় না। শুধু বাংলাদেশ নয়, যেকোনো দলেই খেলতে পারে সাকিব। এই প্রসঙ্গে বলি, সাকিব বাংলাদেশের বলেই আসলে যতটা প্রাপ্য, ততটা কৃতিত্ব ওকে দেওয়া হয় না। অত বড় করে দেখা হয় না। যদি ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-ভারতের হতো, সাকিব আরও বেশি আলোয় থাকত।
সেদিক থেকেই এই বিশ্বকাপ সাকিবের জন্য অনেক বড় সুযোগ। এমনিতে তার প্রমাণ করার কিছু নেই। তবে চ্যালেঞ্জ জেতার আছে অনেক। বিশ্বকাপের মতো আসরে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভালো করার চ্যালেঞ্জ। এই ভালোর সংজ্ঞা সাকিবের জন্য অন্য রকম। স্রেফ ৫০-৬০ করা বা একটি-দুটি উইকেট নয়। বড় দলগুলোর বিপক্ষে দারুণ কিছু করা। দলের জয়ে বড় অবদান রাখা, কিংবা একাই ম্যাচ জেতানো। ব্যাটিং-বোলিং দুটিই সাকিবকে করতে হয় গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। সেই সময়টায় দারুণ কিছু করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া। প্রাপ্য যেটুকু দিতে এখনো কার্পণ্য আছে ক্রিকেট বিশ্বের, পারফরম্যান্স দিয়েই সেটুকু আদায় করে ও যেন দেখিয়ে দেয় সবাইকে।

এ প্রসঙ্গে আামি আরেকটু সামনে তাকাতে চাই। বিশ্বকাপের পরে আমাদের চারটি বড় দলের সঙ্গে সিরিজ আছে। আশা করি ওই সিরিজগুলোতেও সাকিব ওদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আদায় করে নেবে যোগ্য স্বীকৃতি। তবে এটাও মানতে হবে যে বিশ্বকাপের গুরুত্ব আলাদা। শচীন টেন্ডুলকারের এত এত কীর্তির মধ্যে বিশ্বকাপে ভালো পারফরম্যান্সের কথাই সবার আগে আসে। আমি চাই সাকিবও তেমন কিছু করুক, যেন ওর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কখনো সংশয় না থাকে। কিংবা স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। আমি জানি, টেন্ডুলকার-ব্র্যাডম্যানের নাম দেখে অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার জন্য ব্র্যাডম্যান বা ভারতের জন্য টেন্ডুলকার যেমন ছিলেন, আমাদের জন্য সাকিব তার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়, বরং অনেক সময় বেশি। ব্র্যাডম্যানের পরিসংখ্যানই যেমন চূড়ায় তুলে রেখেছে তাঁকে, সাকিবও ক্যারিয়ারে এমন কিছু করুক, যেন আজ থেকে অনেক অনেক দিন পরও ওই সংখ্যাগুলোই আলাদা করে রাখে ওকে। যেন যুক্তি-তর্কের ঊর্ধ্বে তুলে নিতে পারে নিজেকে। সেই সামর্থ্য অবশ্যই সাকিবের আছে।
আগেই বলেছি, বিশ্ব ক্রিকেটে সাকিবের মতো কেউ নেই। ওর লড়াইটা এখন নিজের সঙ্গেই। অনেক সময় অন্যদের ছাড়িয়ে যাওয়ার চেয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তবে সাকিবকে চিনি বলেই জানি, ও পারবে।
নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার শুরু হোক বিশ্বকাপ দিয়েই!

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন