বিজ্ঞাপন
default-image

তাতেও যখন ধারাবাহিক হতে পারছিলেন না, বিশেষ করে ব্যাট হাতে খুঁজে পাচ্ছিলেন না পুরোনো ছন্দ; হারারেতে ওয়ানডে সিরিজের আগে সাকিব হয়তো ভাবলেন, এত অনুশীলন করে কী হবে! তার চেয়ে বরং একটু আগের নিয়মে ফিরে যাওয়া যাক।

হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে কাল ম্যাচ শেষে সাকিবও কি সে রকমই কিছু বলেননি? অপরাজিত ৯৬ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ জিতিয়ে এসে তিনি কী বলেছেন, সেটা আবার একটু মনে করে দেখুন তো। সাকিব বলছিলেন, ‘আমার মনে হয় মানসিক ব্যাপারটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি অনেক কিছু ভাবছিলাম, যেটা এই ম্যাচের আগে পরিবর্তন করেছি। মনোযোগ ধরে রাখার জন্য এই ম্যাচের আগে কিছু বিষয় আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।’

সেই বিষয়গুলোর একটি নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে জয়ী হওয়া। সাকিবও সেটিই বলছিলেন কাল, ‘এত দিন খেলার পর আসলে টেকনিক্যাল সমস্যা খুব বেশি একটা হয় না। মানসিক সমস্যাটাই বেশি হয়। মানসিক যুদ্ধে যদি আমি নিজের সঙ্গে নিজে জিততে পারি, তাহলে আমার মনে হয় নিয়মিতই রান করা সম্ভব।’

২০১৯ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেও মনের এই জোরই এগিয়ে দিয়েছিল সাকিবকে। ব্যাট হাতে দুই সেঞ্চুরিসহ ৬০৬ রান, বল হাতে নিয়েছিলেন ১১ উইকেট। বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের পরিকল্পনার পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারার একটা কথাও তাঁকে ভীষণ উজ্জীবিত করেছিল সেবার।

বিশ্বকাপের আগে এমসিসির এক সভায় দেখা হলে সাঙ্গাকারা সাকিবকে বলেছিলেন, ‘যত তুমি সতেজ থাকবে, নির্ভার থাকবে, তত ভালো হবে। পাগলের মতো অনুশীলন করার দরকার নেই। যদি ভালো খেলো, তবে সময়টা উপভোগ করো। ঘুরো, ফিরো। শুধু খেলার সময়টায় পূর্ণ মনোযোগ দেবে।’ বিশ্বকাপের পর প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিবই জানিয়েছিলেন সাঙ্গাকারার সঙ্গে তাঁর ওই কথোপকথনের কথা।

কাল সাকিবের ব্যাটিংটা যদি ভালোভাবে খেয়াল করে থাকেন, সেখানেও নিশ্চয়ই অন্য সাকিবকেই দেখেছেন। কোনো পাগলাটে শট নেই, যেটা সাকিবের ৩০-৪০ রানের ইনিংসেও এক-দুটি দেখা যায়। অনেকটাই নিজের স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাটিং করলেন এদিন।

ব্যাটিংয়ে চাপ কমাতে অনেক সময় জোর করে হলেও এক-দুটি বাউন্ডারি মারার চেষ্টা করে থাকেন সাকিব। মাঠে এটা তাঁকে কিছুটা নির্ভার করে বলেই ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তাঁর দাবি। কিন্তু কাল সাকিব নিজের ওই খেলা সিন্দুকে ভরে সেটাই খেলেছেন, যেটা তখন দলের দরকার ছিল। বাউন্ডারি মারার তাড়া নেই। প্রতিটি বলেই আগে নিশ্চিত করেছেন যেন আউট না হয়ে যান, তারপর অন্য কিছু। নিজের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে এটাও একটা জয় সাকিবের।

ব্যক্তিগত রানটা ৮০-৮৫ হয়ে যাওয়ার পরও সাকিব ধুমধাড়াক্কা কিছু শট খেলে সেঞ্চুরির চেষ্টায় যাননি। নিজের এবং দলের ইনিংসটাকে এগিয়ে নিয়েছেন ধীরস্থির ব্যাটিং করে। হাতে মাত্র ৩ উইকেট। সাকিব আউট হয়ে যাওয়া মানে দলেরই লেজ গুটিয়ে চলে আসা।

default-image

কিন্তু তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন জয় নামের দূরের বাতিঘরটা এবং বুঝতে পারছিলেন সঙ্গী মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে নিয়ে সেই বাতিঘর পর্যন্ত যেতে হলে এগোতে হবে সতর্ক পায়ে। সেভাবে এগিয়েই ম্যাচের শেষ ওভারের প্রথম বলে ব্লেসিং মুজারাবানিকে মেরে দিলেন উইনিং বাউন্ডারি। বাংলাদেশ পৌঁছে গেল অভীষ্ট লক্ষ্যে।

ওয়ানডে সিরিজের আগে অধিনায়ক তামিম ইকবালের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সাকিবের ফর্ম নিয়ে তিনি চিন্তিত কি না। তামিম এক বাক্যে বলে দিয়েছিলেন, একদমই না। সাকিবের ছন্দে ফেরাটা তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। তামিমের বিশ্বাস ছিল, একটা দারুণ শটই হয়তো সাকিবকে নিয়ে আসবে তাঁর সেরা অবস্থায়।

কাল সেই শট কখন খেললেন সাকিব? পানি পানের বিরতির আগে ১৬তম ওভারে লুক জঙ্গুয়েকে প্যাডেল সুইপে ফাইন লেগ দিয়ে মারা বাউন্ডারিতে? নাকি পরের ওভারে রিচার্ড এনগারাভাকে ফ্লিকে মারা চারে? হতে পারে এর কোনোটাতেই নয়, এমনকি কোনো বাউন্ডারিতেই নয়।

সাকিব হয়তো নিজেকে ফিরে পেয়েছেন বাউন্ডারি মারার বলেও বাউন্ডারি না মেরেই। কোনো একটা রক্ষণাত্মক শটে, যেটা মাঠে তাঁকে এই উপলব্ধি দিয়েছে যে বড় কিছুর জন্য চাইলেই তো তিনি ছোট লোভ সামলাতে পারেন!

নিজের সঙ্গে লড়াইটা তো এভাবেই জিততে হয়। মনকে যদি বোঝানো যায়, ‘মন, তুমি যা চাও তা-ই ঠিক নয়। ঠিক কাজটা করা যায় তোমার দিকে না তাকিয়েও’, তবেই না বুঝতে হবে মন শুনছে আপনার কথা!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন