ধরুন কয়েকজন ক্রিকেটার এক জায়গায় বসে আড্ডা মারছেন। আলাপে আলাপে হঠাৎ উঠে এল ম্যাচ মিস করার প্রসঙ্গ। ক্যারিয়ারে তাঁরা কবে, কীভাবে, কোন ম্যাচে খেলতে পারেননি। চোটের কারণটাই বেশি আসবে। আসবে, কন্ডিশন কিংবা কোচের সিদ্ধান্তের কথা। কিন্তু সেই দলেরই কেউ যদি বলে ওঠেন, নিজের গাড়ির তলায় পড়ে ম্যাচ মিস করেছিলেন কিংবা মাখন মাখানোর ছুরি দিয়ে হাত কেটে ফেলেছিলেন বলে খেলতে পারেননি, তাহলে চোখ কপালে ওঠারই কথা। হাসির রোল পড়ে যেতে পারে, যদি কেউ বলেন বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকতে হয়েছিল বলে খেলতে পারেননি বা এমন কোনো উদ্ভট কারণ।

ক্রিকেট বা যেকোনো খেলাতেই ম্যাচ মিস করা খেলোয়াড়দের জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ক্যারিয়ারে কোনো না কোনো সময় বোধগম্য কিছু কারণে খেলোয়াড়েরা কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচে একাদশে ছিলেন না—এমন ঘটনা গুণে শেষ করা যাবে না। বরং এটাই স্বাভাবিক। খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাঁরা টানা খেলে যেতে পারেন ক্যারিয়ারজুড়ে।

default-image
বিজ্ঞাপন

ক্রিকেট ইতিহাসে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তিতুল্য ফাস্ট বোলার সিডনি বার্নস আলাদা একটা জায়গা পাবেন। তিনি অদ্ভুত এক কারণে ১৯২০-২১ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরে যেতে চাননি। যদিও যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন বার্নস ক্যারিয়ার-সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৪৭ বছর বয়সে দেশের হয়ে খেলার কথা অনেকেই ভাবতে পারেন না। কিন্তু বার্নস তাঁর সামর্থ্য ও ফিটনেস দিয়ে ইংলিশ নির্বাচকদের বিবেচনায় ছিলেন বেশ ভালোভাবে। কিন্তু এমন সময় তিনি বলে বসলেন অস্ট্রেলিয়াতে তিনি যদি তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে তিনি সেখানে যাবেন না।

বার্নস চেয়েছিলেন, এমসিসি (সে সময় ইংলিশ ক্রিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক ছিল তারাই) যেন তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের অস্ট্রেলিয়া যাওয়া ও থাকা-খাওয়ার খরচটা বহন করে। এ নিয়ে তিনি রীতিমতো যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন এমসিসির সঙ্গে । কিন্তু বার্নসের এ ‘আবদার’ মেনে নিতে চায়নি এমসিসি। ফলে রাগে-দুঃখে ক্রিকেট থেকেই বিদায় নিয়ে ফেলেন ইংল্যান্ডের হয়ে মাত্র ২৭ টেস্টে ১৮৯ উইকেট নেওয়া এই ফাস্ট বোলার। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, ল্যাঙ্কাশায়ার ও ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে ১৩৩টি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৭১৯ উইকেটই বলে দেয় ৪৭ বছর বয়সেও কেন টেস্ট খেলার সুযোগটা বহাল ছিল তাঁর। বড় অদ্ভুত কারণেই যতি পড়ে তাঁর ক্যারিয়ারে।

default-image
বিজ্ঞাপন

বার্নস যদি অদ্ভুত কারণে ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন তাহলে টেড ডেক্সটারকে নিয়ে কি বলবেন? তিনি অদ্ভুতই কেবল নয়, রীতিমতো উদ্ভট এক কারণে একবার টেস্ট মিস করেছিলেন। ইংল্যান্ডের হয়ে ৬২ টেস্টে ৪৭.৮৯ গড়ে ৪৫০২ রান করা এই ডান হাতি ব্যাটসম্যান নিজের গাড়ির তলায় পড়েছিলেন!

ঘটনাটা তাহলে খুলেই বলা যাক। ১৯৬৫-৬৬ অ্যাশেজ সিরিজে তিনি ইংল্যান্ড দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি টেস্ট ম্যাচের দিন সকালে তিনি নিজের জাগুয়ার গাড়িটি চালিয়ে মাঠে যাচ্ছিলেন। লন্ডনের একটি ফ্লাইওভারের ওপর ওঠার পর গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে যা হয় আর কি! তিনি নিজেই গাড়িটি ঠেলে কাছের কোনো গ্যারাজে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিড়ম্বনার তখন শুরু মাত্র। এক হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছেন আর গাড়িটি ঠেলছেন। হঠাৎ করেই হাত ফসকে গাড়ি উঠে গেল তাঁর ডান পায়ের ওপর। গুরুতর আহত ডেক্সটর সে টেস্টটি তো মিস করেছিলেনই, তাঁর ক্যারিয়ারও শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর আর কখনোই ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার সুযোগ পাননি তিনি।

default-image
বিজ্ঞাপন

এবার বোনের বিয়ের প্রসঙ্গে আসা যাক। ঘটনাটি ভারতের সাবেক ব্যাটসম্যান ও হালে সরকারি দল বিজেপির সাংসদ গৌতম গম্ভীরের। ২০০৯ সালে ফর্মের তুঙ্গে ছিলেন তিনি। সত্যিকার অর্থে সে সময়টা ছিল ক্যারিয়ারের ‘পার্পল প্যাচ’। টানা চার টেস্টে চার সেঞ্চুরি করে হইচই ফেলে দিয়েছেন। ভারতীয় ক্রিকেট বিশ্লেষক থেকে শুরু করে তাবৎ গণমাধ্যম তখন তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ঠিক এ সময়ই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এক সিরিজের তৃতীয় টেস্টটি তিনি না খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, বোনের বিয়ে। তাঁকে থাকতেই হবে পরিবারের সঙ্গে। বোনের বিয়েতে যদি ভাই না থাকে তাহলে কীভাবে হয়। নিতান্তই পারিবারিক উৎসবের কারণে দেশের হয়ে না খেলার এ সিদ্ধান্ত ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট মেনে নিলেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় গম্ভীরকে। বেশ কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটার তো গম্ভীরের এ সিদ্ধান্তকে অপেশাদার ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক অধিনায়ক জিমি অ্যাডামস তাঁর ঘটনাকে নিতান্তই দুর্ভাগ্য হিসেবে বর্ণনা করতে পারেন। উড়োজাহাজে উঠেছেন। যাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। কিন্তু মাঝ আকাশে এমন এক ঘটনা ঘটল, যার কারণে অ্যাডামসকে গোটা সিরিজ থেকেই নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিতে হলো। ১৯৯৮-৯৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাওয়ার সময় উড়োজাহাজেই মাখন মাখানোর ছুরি দিয়ে হাত কেটে ফেলেন অ্যাডামস। তাঁর এই চোট এতটাই ছিল যে হাতে চার-চারটা সেলাই দিতে হয়।

default-image
বিজ্ঞাপন

অ্যাডামসের কথা শুনে ইংল্যান্ডের আরেক সাবেক পেসার ক্রিস লুইস তাঁকে বলতেই পারেন, ‘ওহে, তোমাদের ক্যারিবীয় দ্বীপে গিয়ে আমার তো অবস্থা কেরোসিন হয়ে গিয়েছিল।’ আক্ষরিক অর্থেই সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বিপদের মধ্যে ছিলেন লুইস। ইংল্যান্ডের ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে এসে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে হাঁসফাঁস করছিলেন তিনি। সেখানকার তীব্র রোদ ও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে ১৯৯৪ সালের সেই সফরের আগেই মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছিলেন তিনি। এমনকি হয়ে গিয়েছিলেন ক্লিন শেভড। কিন্তু লুইস ভুল করে বসেন এক দুপুরে। অ্যান্টিগায় তীব্র রোদের মধ্যে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে সান স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। ফলে অ্যান্টিগার বিপক্ষে একটি ট্যুর ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি তিনি।

পাঠক এখন বিচার করে দেখতে পারেন, ম্যাচ মিস করার কোন কারণটি সবচেয়ে বেশি অদ্ভুত!

মন্তব্য পড়ুন 0