বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে প্রথম সফরে করাচি টেস্টে পাটের তৈরি ম্যাটের উইকেটে খেলার যে অনভ্যস্ততা দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেরিয়েছিল তাঁদের, ঢাকায় এসে সেই ম্যাটের উইকেটেই আবার খেলতে হয়েছিল। পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (পিসিসিবি) মাটির উইকেটের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত রাখা হয়নি। একই সঙ্গে ক্রিকেটারদের অসুস্থতাও বড় সমস্যা করেছিল ঢাকা টেস্টে। নিল হার্ভেসহ বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার আক্রান্ত হয়েছিলেন ডায়রিয়ায়।

রিচি বেনো দূরদর্শী ক্রিকেটার ছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড টার্ফ উইকেটের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি যে তারা রাখতে না-ও পারে, বেনো আন্দাজ করেছিলেন। সে কারণেই ঢাকা আসার কিছুদিন আগে ব্রিসবেনে কুইন্সল্যান্ডের শতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি প্রদর্শনী ম্যাচে টার্ফ উইকেটের পাশাপাশি পাট দিয়ে তৈরি ম্যাটিং উইকেটে পাকিস্তানগামী টেস্ট স্কোয়াডের ক্রিকেটারদের অনুশীলনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন।

default-image

ম্যাটিং উইকেট অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারদের কাছে নতুন কিছু ছিল না। অস্ট্রেলিয়াতেও এ ধরনের উইকেটে খেলার চল ছিল। কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কখনোই ম্যাট ব্যবহার করা হতো না। ব্রিসবেনে যেখানে প্রদর্শনী ম্যাচ হয়েছিল, সেখানে নেট অনুশীলনে সিমেন্টের তৈরি উইকেটে ম্যাট বিছিয়ে অনুশীলন করতেই পারতেন বেনোরা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার দূরদর্শী ও মেধাবী অধিনায়ক বেনো কংক্রিটের অনুশীলন উইকেটে ম্যাট না বিছিয়ে মাঠেই ঘাসের ওপর বিছানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের সেই অনুশীলন ঢাকা স্টেডিয়ামের ম্যাটিং উইকেটে খুব কাজে এসেছিল।

১৯৫৬ সালে করাচি টেস্টে ফজল মাহমুদ আর খান মোহাম্মদের বোলিং তোপে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়া। করাচির মাঠে বিছানো ম্যাটে বাউন্স ছিল অসমান। কারণ, সেটি ঘাসের ওপর বসানো হয়েছিল। একই সঙ্গে ম্যাটের নিচে ইটের খোয়া বা অন্য উপদান থেকে যাওয়াতে ব্যাটসম্যানদের বেশ সমস্যা হয়েছিল। ১৯৫৯ সালের সফরে তাই পিসিসিবির কাছ থেকে টার্ফ উইকেটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ম্যাটিং উইকেটের প্রস্তুতি ছিল অস্ট্রেলিয়ার।

default-image

ঢাকায় নেমে স্টেডিয়ামের উইকেট পরিদর্শনে এসে বড় ধাক্কা খেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া দল। কোথায় টার্ফ উইকেট! এ যে সবুজ ঘাসের মাঠের মাঝখান এক টুকরো ধূসর খালি জায়গা। অনেকটা পাড়ার মাঠে যেভাবে মাঠের নির্দিষ্ট একটা জায়গা ন্যাড়া করে টেপ টেনিস দিয়ে খেলা হয়, ঠিক তেমন। পিসিসিবি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা আমতা আমতা করে জানান, শেষ মুহূর্তে নানা সমস্যায় টার্ফ উইকেটের পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে। প্রথমত, ঢাকা স্টেডিয়ামের রোলার নষ্ট হয়ে গিয়েছে, দ্বিতীয়ত, বোর্ড অফিসের টেলেক্স মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিবর্তিত পরিকল্পনার কথা জানানো যায়নি। আজকের দিনে এ ধরনের অজুহাত হাস্যকর হলেও ১৯৫৯ সালের প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিক ছিল না। তাই অস্ট্রেলিয়া ‘পরিবর্তিত পরিবর্তনে’ খেলতে নামতে আপত্তি জানায়নি।

ঢাকায় অস্ট্রেলিয়া ম্যাটিং উইকেটের ব্যাপারে আরও একটা ফন্দি এঁটেছিল। দলটির ক্রিকেটার লিন্ডসে ক্লাইন মাঠকর্মীর কাজও খুব ভালো বুঝতেন। ঢাকা টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দলের দ্বাদশ ব্যক্তি লিন্ডসে ক্লাইন টেস্ট ম্যাচের প্রতিটি দিনই দল মাঠে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে স্টেডিয়ামে পৌঁছে ম্যাটের উইকেট বিছানো তদারকি করতেন। তিনি নিশ্চিত করতেন, ম্যাট ঠিকমতো বসানো হয়েছে, তার নিচে ইটের খোয়াজাতীয় কিছু ব্যাটসম্যানের সমস্যা তৈরি করতে পারবে না।

ঢাকা টেস্টে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যান নিল হার্ভে। ৯৬ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেছিলেন অসুস্থতা নিয়েও। ব্যাটিংয়ের সময় ছয়-সাতবার প্রাকৃতিক কার্যাদি সারতে বিরতিও নিয়েছিলেন। গোটা সিরিজেই অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারদের কেউ না কেউ পেটের পীড়ায় ভুগেছেন। দলের হোটেলে বলাই ছিল অস্ট্রেলিয়া দল পাউরুটি টোস্ট, সেদ্ধ ডিম, কলা ও চা–কফি ছাড়া কিছু খাবে না। অস্ট্রেলিয়া দল গোটা সফরেই ঢাকা, করাচি ও লাহোরের পানি নিয়ে শঙ্কিত ছিল। এমনকি খাবারের সঙ্গে দেওয়া সালাদ ও বরফের ব্যাপারেও তারা ছিল খুঁতখুঁতে।

ঢাকা টেস্টে প্রথমে ব্যাট করে ২০০ রানের বেশি করতে পারেনি পাকিস্তান। হানিফ মোহাম্মদ করেন ৬৬, ডানকান শার্পে করেন ৫৬। সাঈদ আহমেদের ৩৭ দলের সংগ্রহ কিছুটা ভদ্রোচিত করেছিল। অস্ট্রেলীয় পেসার অ্যালান ডেভিডসন ৪ উইকেট নেন ৪২ রানে। অধিনায়ক রিচি বেনোও ৪ উইকেট নেন ৬৯ রানে।

পাকিস্তানের ২০০ রানের জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৫ রানের লিড পায় অস্ট্রেলিয়া। তারা থামে ২২৫ রান করে। নিল হার্ভে আউট হন ৯৬ রানে। এ ছাড়া ওয়ালি গ্রাউট করেন ৬৬। ফজল মাহমুদ ৭১ রানে নেন ৫ উইকেট। ২ উইকেট নেন ইসরার আলী। নাসিমুল গনি নেন ৩ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ১৩৪ রানে। এবারও রিচি বেনো ৪ উইকেট নেন। তবে দলের সেরা বোলার ছিলেন কিন ম্যাকে। তিনি নেন ৬ উইকেট। সহজ লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে কলিন ম্যাকডোনাল্ডের ৪৪, নিল হার্ভের ৩০ আর নর্ম ও’নিলের ২৬ রানে ৮ উইকেট হাতে রেখেই ম্যাচ জিতে যায় অস্ট্রেলিয়া।

টেস্টে পাকিস্তানের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম জয় এসেছিল ঢাকায়। রিচি বেনো কী জানতেন ১২ বছরের মাথায় সেই শহরই আর পাকিস্তানের থাকবে না!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন