পাকিস্তানের জয়ের উল্লাস।
পাকিস্তানের জয়ের উল্লাস। ছবি: এএফপি

পরীক্ষাটা কঠিন ছিল। ৩৭০ রানের লক্ষ্য সহজ নয়। যতই বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৯৫ রান তাড়া করে জিতুক না কেন, উপমহাদেশে চতুর্থ ইনিংসে ৩৭০ রান বরাবরই কঠিন চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যাটিং লাইনআপের জন্য তো বটেই।

গতকাল চট্টগ্রামে কাইল মেয়ার্সের অবিশ্বাস্য এক ইনিংসের পরপরই রাওয়ালপিন্ডিতে দুর্দান্ত এক প্রতিরোধের গল্প লিখেছিলেন এইডেন মার্করাম ও রাসি ফন ডার ডুসেন। রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টপ অর্ডারের দৃঢ়তায় গতকালই লক্ষ্য থেকে ১২৭ রান ছেঁটে ফেলতে পেরেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। আজ শেষ দিনে তাই ২৪৩ রান করলেই চলত সফরকারীদের। ৯০ ওভারে ৯ উইকেট হাতে নিয়ে ২৪৩ রান কঠিন কোনো লক্ষ্য নয়। কিন্তু পারেনি, ৯৫ রানে হেরেছে দক্ষিণ আফ্রিকা।

দক্ষিণ আফ্রিকার মূল দুশ্চিন্তা ছিল একটি বিষয়ই, সেটা হলো লেট মিডল অর্ডার ও লেট অর্ডারের ব্যাটিং। পুরো সিরিজে শেষ দিককার ব্যাটিংই দুই দলের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। আজও শেষের ব্যাটিংটাই আবার পার্থক্য গড়ে দিল। ব্যাটিং-ধসে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্ভাবনার এক জয় রূপ নিল ৯৫ রানের হারে। দুই ম্যাচ সিরিজে পাকিস্তানের কাছে ধবলধোলাই হলো দক্ষিণ আফ্রিকা।

বিজ্ঞাপন

২৭৪ রানে অলআউট হয়েছে প্রোটিয়ারা। সিরিজে এই প্রথম আড়াই শ পেরোতে পারল—দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ মার্ক বাউচার যদি ইতিবাচক কিছু খুঁজে নিতে চান, তবে এই দিকটাই পাবেন। সে সঙ্গে প্রায় তিন বছর পর ওপেনার মার্করামের সেঞ্চুরিটা চাইলে সেখানে যোগ করে নিতে পারেন।

default-image

আর দুশ্চিন্তার দিক কোনটি? তা আলাদা করে ভাবতে হচ্ছে না। সিরিজের প্রথম ইনিংসেই যেটা টের পাওয়া গিয়েছিল, শেষ ইনিংসেও তা-ই সঙ্গী হলো। মিডল অর্ডারের নিচ থেকে লাইনআপের লেজ পর্যন্ত ব্যাট হাতে অদক্ষতা।

একসময় অলরাউন্ডারে ভর্তি এক দল দক্ষিণ আফ্রিকার দশেও দারুণ সক্ষম ব্যাটসম্যান পাওয়া যেত। এ সিরিজে দেখা গেল উল্টো। টপ অর্ডার যে খুব ভালো করেছে তা নয়, কিন্তু মিডল অর্ডারের নিচের দিক আর টেল এন্ডাররা প্রতিদিনই দলকে ডুবিয়েছেন।

করাচিতে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে শেষ ৫ উইকেট ৪১ রানে হারিয়ে বসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সে ধসকেও খুব সাধারণ মনে হয়েছে সেই টেস্টে দ্বিতীয় ইনিংসের ধসের তুলনায়। ৭০ রানে শেষ ৯ উইকেট হারিয়েছিল দলটি, যার শেষ ৪ উইকেট পড়েছে ৯ রানে।

সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে দুই ইনিংসেও চিত্রনাট্য বদলায়নি। মূল ওপেনার ডিন এলগার প্রথমেই ফিরে গেছেন। এরপর টেম্বা বাভুমার সঙ্গে অন্য কেউ দলের ইনিংস মেরামত করার কাজে হাত দিয়েছেন। কিন্তু যখনই মনে হয়েছে বড় একটা সংগ্রহ হতে পারে, তখনই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে ব্যাটিং লাইনআপ।

প্রথম ইনিংসে শেষ ৫ উইকেটে সফরকারীরা হারিয়েছিল ৩৭ রানে। প্রথম টেস্টের মতোই দ্বিতীয় ইনিংসে সে ধসকেও মামুলি বানিয়ে দিয়েছেন কুইন্টন ডি ককরা। এবারে তাঁদের শেষ ৭ উইকেটের পতন ৩৩ রানের মধ্যে! এমন ধস নিয়মিত হয়ে উঠলে ম্যাচ জেতার আশা করাটা কঠিন বটে।

default-image

দিনের শুরুতেই আজ ধাক্কা খেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। স্কোরে কোনো নড়চড় হওয়ার আগেই ফন ডার ডুসেনকে বোল্ড করেছেন হাসান আলী। ফাফ ডু প্লেসিকেও দিনের পঞ্চম ওভারেই ফিরিয়েছেন হাসান। ১৩৫ রানে ৩ উইকেট হারানো প্রোটিয়াদের জবাব দেওয়ার শুরু এরপরই। মধ্যাহ্নবিরতি পর্যন্ত পাকিস্তানকে আর কোনো সুযোগ দেননি এইডেন মার্করাম ও টেম্বা বাভুমা। মধ্যাহ্নবিরতির আগেই সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন মার্করাম। ২০১৮ সালের মার্চে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরির পর বড় একটা সেঞ্চুরি-খরার মধ্য দিয়েই যেতে হলো তাঁকে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বিরতি থেকে ফেরার পরই আবার দক্ষিণ আফ্রিকার ত্রাস হয়ে আবির্ভাব হাসান আলীর। বহুদিন পর টেস্টে ফেরা ভালোই উপভোগ করেছেন পাকিস্তানের এই পেসার। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেয়েছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসেও তা-ই। ক্যারিয়ারে প্রথমবার ম্যাচে দশ উইকেটপ্রাপ্তির পথে শাহিন শাহ আফ্রিদিকে নিয়ে প্রোটিয়াদের স্বপ্নটা গুঁড়িয়ে দিলেন দশ ওভারের মধ্যে।

মাত্রই নতুন বল নিয়েছিল পাকিস্তান। নতুন বলে দ্বিতীয় ওভার করতে আসা হাসানের বলটায় অযথা খোঁচা দিলেন মার্করাম। ১০৮ রানে থাকা এক ব্যাটসম্যান অযথা এভাবে আত্মসমর্পণ করার পর যা হয়, তা-ই হলো। হাসানের দ্বিতীয় বলটাও আরেকটি উইকেট তুলে নিল। এ ম্যাচ দিয়েই টেস্ট অধিনায়কত্বে সমাপ্তি টানতে যাওয়া কুইন্টন ডি কক গোল্ডেন ডাক নিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরলেন। ৩ উইকেটে ২৪১ রান থেকে মুহূর্তেই দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে গেল ৫ উইকেটে ২৪১ রান।

default-image

পাকিস্তান তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়েছিল। এরপর মোহাম্মদ রিজওয়ানের সঙ্গে নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের লড়াই ২২২ রান এনে দিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা তার নিচের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে এর অর্ধেকটা পেলেও ম্যাচটা জমে উঠত। কিন্তু পুরো সিরিজের মুখস্থ চিত্রনাট্য থেকে বেরোতে পারল না প্রোটিয়ারা।

প্রথম ইনিংসে এমনই এক ধস অন্য প্রান্ত থেকে দেখেছিলেন বাভুমা। নিজে এক প্রান্তে অপরাজিত ছিলেন, আর তাঁকে রেখে সবাই ড্রেসিংরুমমুখী হয়েছিলেন। ন্যাড়া কয়বার আর বেলতলায় যাবেন? তাই এবার নিজেই আগে ড্রেসিংরুমে চলে গেলেন বাভুমা। শাহিন আফ্রিদির বলে তাঁর আলতো এক খোঁচা উইকেটরক্ষকের হাতে ধরা পড়ল। ৬১ রানে ফিরলেন সফরকারীদের শেষ ভরসা।

এরপর শুধু দুই প্রান্তে দুই পেসারের উইকেট উৎসব চলল। শুধু উইলিয়ান মুল্ডার একটু টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তাঁকে বোল্ড করে ম্যাচের সমাপ্তি টেনেছেন ইয়াসির শাহ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

পাকিস্তান: ২৭২ ও ২৯৮

দক্ষিণ আফ্রিকা: ২০১ ও ২৭৪ (মার্করাম ১০৮, বাভুমা ৬১, ডুসেন ৪৮, মুল্ডার ২০; হাসান ৬০/৫, শাহীন ৫১/৪, ইয়াসির ৫৬/১)

ফলঃ পাকিস্তান ৯৫ রানে জয়ী।

সিরিজঃ ২-০ ব্যবধানে জয়ী পাকিস্তান।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ: হাসান আলী

সিরিজ সেরা: মোহাম্মদ রিজওয়ান

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন